শনিবার   ৩১ অক্টোবর ২০২৬   কার্তিক ১৫ ১৪৩৩   ১৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

মার্কিন নির্বাচন কেন নভেম্বরের প্রথম মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হয়?

আজকাল রিােপর্ট

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০২:২৭ এএম, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ শনিবার


 
যুক্তরাষ্ট্রের সাধারন নির্বাচন প্রতি ৪ বছর পরপর এবং মধ্যবর্তী নির্বাচন সাধারন নির্বাচনের ২ বছর পর অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু প্রতিটি নির্বাচনই অনুষ্ঠিত হয় নভেম্বর মাসের প্রথম মঙ্গলবারে। কেন একটি নির্দিষ্ট দিনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়? কখন থেকে এ নিয়ম চালু হলো। এমন প্রশ্ন অনেকেরই। সাধারন নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট, এক তৃতীয়াংশ সিনেট সদস্য ও ৪৩৫ জন হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভস (হাউজ প্রতিনিধি) নির্বাচিত হন। মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট ব্যালটে থাকেন না। যুক্তরাষ্ট্রে মঙ্গলবার নির্বাচন আয়োজনের আইনটির শিকড় অনেক গভীরে । ঊনবিংশ শতাব্দীতে কৃষিভিত্তিক জীবনধারা, রোববারে গির্জায় প্রার্থনায় অংশগ্রণের রীতি এবং তৎকালীন সমাজের অন্যান্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে এই দিনটি নির্ধারণ করা হয়েছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র মূলত একটি কৃষিপ্রধান সমাজ ছিল। তখন জনসংখ্যা খুব বেশি ছিল না এবং অধিকাংশ আমেরিকানই ছিলেন কৃষক। যারা ভোটকেন্দ্র থেকে অনেক দূরে বসবাস করতেন। এই প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো থেকে নিকটস্থ ভোটকেন্দ্রে পৌঁছাতে এবং ফিরে আসতে অনেক সময় এক দিনেরও বেশি লাগতো । এছাড়া, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা অনেক সমাজে সপ্তাহের নির্দিষ্ট কিছু দিন উপাসনার জন্য নির্ধারিত থাকত। তাই রোববার নির্বাচন আয়োজন করা ছিল অযৌক্তিক। আবার সোমবার নির্বাচনের আয়োজন করাও সম্ভব ছিল না, কারণ সেক্ষেত্রে ভোটার ও কৃষকদের শনিবার ভ্রমণের প্রয়োজন পড়ত।


বুধবারও নির্বাচনের জন্য উপযুক্ত ছিল না, কারণ এই দিনে অধিকাংশ মানুষ বাজারে গিয়ে তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতেন। সব দিক বিবেচনা করলে, মঙ্গলবারই ছিল সবচেয়ে সুবিধাজনক দিন। ভোটাররা সোমবার যাত্রা করে মঙ্গলবার ভোট দিতে পারতেন এবং বুধবারের বাজার বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজের আগেই নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে আসতে পারতেন।

প্রতি চার বছর অন্তর সাধারন নির্বাচন
প্রতি চার বছর অন্তর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় । মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, প্রতি চার বছর অন্তর মার্কিন রাষ্ট্রপতি ও উপ-রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। একই সাথে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫ জন সদস্যের ২ বছর মেয়াদ ও  ছয় বছর মেয়াদের জন্য সিনেটরদের এক তৃতীয়াংশ নির্বাচিত হন। সিনেটের আসন ১০০টি। মেয়াদকাল ৬ বছর। প্রতি ২ বছর পর  সিনেটের ৩৩ থেকে ৩৪টি আসন নির্বাচনের জন্য উন্মুক্ত থাকে। 
একটি বিশেষ মঙ্গলবার
অধিকাংশ দেশে সাধারণত রবিবারে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন হয় একটি বিশেষ মঙ্গলবারে। নভেম্বরের প্রথম সোমবারের পরদিন মঙ্গলবার। ২০২৬ সালে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ৩ নভেম্বর মঙ্গলবার। ২০২৮ সালে এটি অনুষ্ঠিত হবে ৭ নভেম্বর মঙ্গলবার এবং ২০৩২ সালে নির্বাচনের দিনটি হবে ২ নভেম্বর, মঙ্গলবার।

২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা মার্কিন কংগ্রেসের  ৪৭০টি আসনের ৩৫টি আসন (মোট আসন ১০০) এবং মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টিতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে এবারের নির্বাচনে ব্যালটে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী থাকছে না। এটি মধ্যবর্তী নির্বাচন। সাধারন নির্বাচনে এক তৃতীয়াংশ সিনেট, ৪৩৫টি প্রতিনিধি পরিষদ ও প্রেসিডেন্ট ও তাদের রানিংমেট হিসেবে ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যেমন ২০২০৪ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তারা রানিংমেট জেডি ভ্যান্স নির্বাচিত হয়েছেন। আবার ২০২৮ সালে কংগ্রেসের আসনগুলোর সাথেই প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। 
২৮তম কংগ্রেসের আইন
যুক্তরাষ্ট্রের ২৮তম কংগ্রেস ১৮৪৫ সালের ২৩শে জানুয়ারি একটি আইন পাস করে। এটি ‘অ্যান অ্যাক্ট টু এস্টাবলিশ আ ইউনিফর্ম টাইম ফর হোল্ডিং ইলেকশনস ফর ইলেক্টরস অফ প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড ভাইস প্রেসিডেন্ট ইন অল স্টেটস অফ দ্য ইউনিয়ন' (যুক্তরাষ্ট্রের সব অঙ্গরাজ্যে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য নির্বাচক নির্বাচনের একটি অভিন্ন সময় নির্ধারণ সংক্রান্ত আইন)। এই আইনে একটি নির্দিষ্ট মঙ্গলবারকে নির্বাচনের দিন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। এই আইনটি সব অঙ্গরাজ্যের জন্য নির্বাচনের তারিখকে অভিন্ন করে তোলে এবং নভেম্বর মাসের প্রথম সোমবারের পরবর্তী মঙ্গলবারকে নির্বাচনের দিন হিসেবে নির্ধারণ করে। এই আইনটি আজও কার্যকর রয়েছে। 
২৮তম কংগ্রেসের ১৮৪৫ সালের আইনটি পূর্ববর্তী নির্বাচনী ব্যবস্থার একটি বড় ত্রুটি দূর করেছিল। ১৮৪৫ সালের এই ফেডারেল আইনটি পাস হওয়ার আগে, অঙ্গরাজ্যগুলো ডিসেম্বরের প্রথম বুধবারের আগের ৩৪ দিনের মধ্যে যেকোনো দিন নির্বাচন আয়োজন করতে পারত-যেদিন ‘ইলেক্টোরাল কলেজ’-এর নির্বাচকরা (ইলেক্টররা) একত্রিত হতেন। এই ব্যবস্থায়, যেসব অঙ্গরাজ্য ৩৪ দিনের সময়সীমার শুরুর দিকে নির্বাচন সম্পন্ন করত, তারা তাদের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করে দিত। এর ফলে, যেসব অঙ্গরাজ্যে নির্বাচন পরে অনুষ্ঠিত হতো, সেগুলোর ফলাফলের ওপর আগের অঙ্গরাজ্যগুলোর ফলাফলের প্রভাব পড়ত। অর্থাৎ, আগে ভোট দেওয়া অঙ্গরাজ্যগুলো পরের অঙ্গরাজ্যগুলোর নির্বাচনী ফলাফলকে প্রভাবিত করত। নির্বাচনের জন্য একটি নির্দিষ্ট দিন নির্ধারণ করার ফলে, আগে ভোট সম্পন্ন করা অঙ্গরাজ্যগুলোর সেই অনাকাক্সিক্ষত প্রভাব দূর করা সম্ভব হয়েছে।এই বিষয়টির কথা বিবেচনা করে নির্বাচনের দিন হিসেবে মঙ্গলবারকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। ইতিহাস অনুযায়ী, কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতির কারণেই নভেম্বরের কোনো একটি মঙ্গলবারকে নির্বাচনের দিন হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছিল।

কৃষি ও ধর্মের জন্যই নভেম্বরে নির্বাচন?
কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতির কারণেই নির্বাচনের দিন হিসেবে নভেম্বর মাসকে বেছে নেওয়া হয়। বসন্তকাল বা গ্রীষ্মের শুরুতে নির্বাচন আয়োজন করলে তা ফসল রোপণের মৌসুমে বিঘ্ন ঘটাতে পারত। আবার গ্রীষ্মের শেষ দিকে বা শরতের শুরুতে নির্বাচন আয়োজন করলে তা ফসল তোলার সময়ের সঙ্গে মিলে যেত। তাই নভেম্বরের শেষ দিক-যখন ফসল তোলা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তীব্র শীত এখনো শুরু হয়নি-নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হিসেবে বিবেচিত হয়।"

ফেডারেল আইনটি যখন তৈরি হয়, তখন অধিকাংশ আমেরিকানই ছিলেন কৃষক। তাই নভেম্বরের কোনো একটি মঙ্গলবার ফসল রোপণের মৌসুমের সঙ্গে সবচেয়ে ভালোভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। 
জনগনের সরাসরি ভোটে সিনেটর
১৯১৪ সাল থেকে জনগনের সরাসরি ভোটে সিনেটর নির্বাচিত হচ্ছেন। এর আগে সেস্ট আইনপ্রনেতাদেও ভোটে প্রত্যেক স্টেট থেকে ২ জন সিনেটর নির্বাচিত হতেন। ১৯১৩ সালে মার্কিন সংবিধানের ১৭তম সংশোধনীতে নিয়মটি চালু হয়। (তথ্য সহায়তায়-ওভারসিজ, উইকিপিডিয়া ও উওন)।