শনিবার   ০৩ অক্টোবর ২০২৬   আশ্বিন ১৭ ১৪৩৩   ২০ রবিউস সানি ১৪৪৮

ইসরায়েলের ওপর কেন ক্ষেপলো ডেমোক্র্যাটরা

আজকাল রিােপর্ট

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ১২:৩২ এএম, ৩ অক্টোবর ২০২৬ শনিবার


 
ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইন প্রশ্নে বদলে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি। প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি নাটকীয়ভাবে ইসরায়েলের বিষয়ে ক্রমশ কঠোর ও শাস্তিমূলক অবস্থান গ্রহণ করছে। ওয়েস্ট ব্যাংকে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিবেদন তৈরির একটি প্রস্তাব এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে প্রায় সব ডেমোক্র্যাট সিনেটর ভোট দিয়েছেন। পাশাপাশি দলের কেউ কেউ বসতি স্থাপনের কার্যক্রমের জন্য নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে শাস্তির প্রস্তাবও করছেন।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তারা এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে যা ইঙ্গিত দেয় যে, নভেম্বরের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে তারা নতুন বসতি স্থাপন এবং ইহুদি রাষ্ট্রটির বিরুদ্ধে অন্যান্য কর্মকাণ্ডের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথে হাঁটবে। আগামী ৩ নভেম্বর মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অধিকাংশ জরিপেই কংগ্রেসের উভয় চ্যাম্বার সিনেট ও হাউজে ডেমোক্র্যাট পার্টি নির্বাচনী যুদ্ধে এগিয়ে রয়েছেন। রিপাবলিক্যান পার্টির অনেক নেতাও প্রকাশ্যে ওয়েস্ট ব্যাংকে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড ও বসতি গড়ে তোলার বিপক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর শীতল সম্পর্ক চলছে। 

মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর, একজন ছাড়া সিনেটের সব ডেমোক্র্যাট সদস্য একটি প্রস্তাব এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এই প্রস্তাবটি ট্রাম্প প্রশাসনকে ওয়েস্ট ব্যাংকে ইসরায়েলের সহিংসতা-যার মধ্যে ফিলিস্তিনি-আমেরিকান নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত-পর্যালোচনা করে মানবাধিকার প্রতিবেদন তৈরি করতে বাধ্য করা। এটি ছিল এমন এক ধরনের কঠোর পদক্ষেপ বা ভর্ৎসনা, যা একসময় অকল্পনীয় বলে মনে হতো।

প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। তবে এর প্রতি ডেমোক্র্যাটদের প্রায় সর্বসম্মত সমর্থন দলের নতুন মানসিকতার প্রতিফলন ঘটায়। তারা এখন এমন সব পদক্ষেপ গ্রহণে আগ্রহী যা আগে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ঘনিষ্ঠতম মিত্রের সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে অগ্রহণযোগ্য বা নিষিদ্ধ বলে বিবেচিত হতো।

একই সাথে, প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস) ও সিনেটের শীর্ষস্থানীয় ডেমোক্র্যাটরা এমন আইন প্রস্তাব করেছেন যা বসতি স্থাপনের জন্য ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। এর মাধ্যমে ইসরায়েলি কোম্পানি ও ব্যাংকগুলোকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে, বসতি স্থাপনের কাজে জড়িত থাকলে তাদের শাস্তির মুখে পড়তে হবে। প্রতিনিধি পরিষদের প্রায় অর্ধেক ডেমোক্র্যাট সদস্য ইসরায়েলের সহায়তা বন্ধের পক্ষে ভোট দেওয়ার কয়েক মাস পর নেওয়া এই পদক্ষেপগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, দলের মধ্যে কেবল অসন্তোষ প্রকাশের গণ্ডি পেরিয়ে এমন সব ব্যবস্থা গ্রহণের আগ্রহ বাড়ছে যা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের কাঠামো বদলে দিতে পারে। মেরিল্যান্ডের ডেমোক্র্যাট সিনেটর এবং মানবাধিকার বিষয়ক এই প্রস্তাবের উদ্যোক্তা ক্রিস ভ্যান হোলেন বলেন, “আমার অনেক ডেমোক্র্যাট সহকর্মী এই উদ্যোগে শামিল হওয়ায় আমি আনন্দিত হলেও, এটা স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও অনেক কিছু করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের অর্থ যারা গ্রহণ করছেন, তারা যেন আমাদের আইন ও মূল্যবোধ মেনে চলেন-তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।”

তিনি আরও বলেন, “এই প্রস্তাবটি এমন এক বাস্তবতার ওপর আলোকপাত করার সুযোগ করে দিয়েছে, যা সেই মূল নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।”

সিনেটে ৫১ বনাম ৪৭ ভোটে প্রস্তাবটি আটকে দেওয়া হয়। তবে নিউ ইয়র্কের সিনেটর ও সংখ্যালঘু দলের নেতা চাক শুমার ইসরায়েলের কট্টর সমর্থক। তিনি সহ ডেমোক্র্যাট দলের প্রায় সবাই এই প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছিলেন। একমাত্র ডেমোক্র্যাট হিসেবে বিপক্ষে ভোট দেন পেনসিলভানিয়ার সিনেটর জন ফেটারম্যান, যিনি ইসরায়েলের একজন অটল সমর্থক। তিনি টেক্সাসে অনুষ্ঠিত রিপাবলিক্যান পার্টির মধ্যবর্তী সম্মেলনে গিয়েও দলের নানা অবস্থানের বিরুদ্ধে ভাষণ দিয়েছেন। অন্যদিকে রিপাবলিকান পার্টির সিনেটর র‌্যান্ড পল ডেমোক্র্যাটদের সাথে মিলে এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন।
এই পদক্ষেপটি পাস হলে স্টেট ডিপার্টমেন্টকে একটি উন্মুক্ত (অ-গোপনীয়) প্রতিবেদন তৈরি করতে হতো, যেখানে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হতো। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকত-"সহিংস ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বা ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত" নয়জন মার্কিন নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তের কোনো প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা।


এ বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারণার সময় ইসরায়েল ও গাজা ইস্যু নিয়ে ডেমোক্র্যাট দলের মধ্যকার বিভাজন বারবার সামনে এসেছে। তবে এক্ষেত্রে ভোটগ্রহণের সময় এমন একটি বিষয়ে দলের মধ্যে প্রায় ঐকমত্য দেখা গেল, যা মাত্র দুই বছর আগেও খুব কম সমর্থন পেয়েছিল।

২০২৪ সালে, ভারমন্টের স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স যখন গাজায় মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে কি না-সে বিষয়ে পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদন চেয়ে একটি প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তখন মাত্র ১১ জন ডেমোক্র্যাট প্রস্তাবটি এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। এবার একই ধরনের প্রস্তাবে ৪৬ জন ডেমোক্র্যাট সিনেটর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও প্যালেস্টাইন প্রশ্নে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান নতুন বার্তাই দিচ্ছে। ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটর জিতলে পাল্টে যাবে মধ্যপ্রাচ্য প্রশ্নে ওয়াশিংটনের দৃষ্টিভঙ্গি। এমন ধারণাই পোষণ করছেন আমেরিকান রাজনীতিবিদরা। 
ইসরায়েলের প্রতি ডেমোক্র্যাটিক ভোটারদের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এই বিষয়টি সামনে আসে। দলের কোনো কোনো সিনেটরের কাছে এটি ছিল সামরিক সহায়তা বন্ধ করার মতো চরম পদক্ষেপ না নিয়েও নেতানিয়াহু সরকারের কর্মকাণ্ডের প্রতি নিজেদের বিরোধিতা প্রকাশের একটি উপায়। তবুও, এটি অতীতের তুলনায় একটি স্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। কারণ অতীতে ইসরায়েলকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এমন যেকোনো পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অধিকাংশ ডেমোক্র্যাট প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ভোট দিতেন।
(সূত্র-নিউইয়র্ক টাইমস)