সৈনিকের বাবার আকুতিঃআমার ছেলেকে ফিরিয়ে আনুন
আজকাল রিপোর্ট
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ১২:৫৮ এএম, ২২ আগস্ট ২০২৬ শনিবার
ইরান যুদ্ধে মার্কিন এক সৈনিকের বাবার আকুতি দাগ কেটেছে আমেরিকানদের। প্রতিটি জরিপে উঠে এসেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনৈতিক ও অযৌক্তিক ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে। যা নিয়ে উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত রিপাবলিক্যান দলের নেতারা। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব পড়তে পারে জনগনের যুদ্ধ নিয়ে নেতিবাচক মনোভাবের কারণে। সরকারি দল রিপাবলিক্যান পার্টি হারাতে পারে কংগ্রেসের কর্তৃত্ব। মেজোরিটি পেতে পারে বিরোধী বেঞ্চে বসে থাকা ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। আর এতে শাসন ব্যবস্থায় এককচ্ছত্র ক্ষমতার বিলুপ্ত ঘটবে প্রেসিডেন্টের। হাতে দড়ি পড়বে ট্রাম্পের লাগামহীন ক্ষমতার। আর হয়তো এ দৃশ্যটি দেখার জন্যই আমেরিকানরা অপেক্ষা করছেন।
ইরানে মোতায়েনকৃত যুদ্ধ জাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এর এক নাবিকের বাবা ট্রাম্পের ইরান কেন্দ্রিক ‘অন্তহীন যুদ্ধ’-এর সমালোচনা করেছেন। আকুতি জানিয়েছেন তার ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে। ২০ বছর বয়সী এক নাবিকের বাবা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান-কেন্দ্রিক যুদ্ধ পরিস্থিতিকে ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ (ভড়ৎবাবৎ ধিৎ) বলে নিন্দা জানিয়েছেন। বিমানবাহী রণতরীটির মোতায়েনের মেয়াদ ২৬৫ দিন ছাড়িয়ে যাওয়ায় তিনি নিজের ছেলেকে ফিরিয়ে এনে তার জায়গায় নিজে দায়িত্ব পালনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
ওহাইও স্টেটের সিনসিনাটির বাসিন্দা জেফারসন কেলি ‘নিউজউইক’-কে বলেছেন, তার ছেলে দেশের সেবা করা ও প্রকৌশলী হওয়ার আশায় অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে নৌবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু লিংকন-কে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর পর কেলি বুঝতে পারেন যে, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে ফেরার পর থেকে তার মনে যে আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছিল, সেটাই বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
কেলি বলেন বলেছেন, “আমার একটা ধারণা ছিল যে এমন কোনো ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ শুরু হতে যাচ্ছে,” “কোনো সমস্যা বা বড় ধরনের সংঘাত কিংবা যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলেই তারা বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়ে দেয়... আর ঠিক সেটাই ঘটেছে।”
নিউজউইক ওই রণতরীতে কর্মরত একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার স্ত্রী অ্যাশলি রজার্স’র সাথেও কথা বলেছে। তিনি জানান, বসন্তকালে রসদ কমে যাওয়া এবং খাবারের মান খারাপ হওয়ার খবর পাওয়ার পর নাবিকদের জন্য পরিবারের সদস্যরা কীভাবে ‘কেয়ার প্যাকেজ’ (প্রয়োজনীয় নিত্যপ্রয়োজনীয় প্যাকেট) পাঠানোর চেষ্টা করছিলেন।
অ্যাশলি রজার্স বলেন, “ওই কেয়ার প্যাকেজটি সেখানে পৌঁছাতে আড়াই মাস সময় লেগেছিল। বিষয়টি বেশ উদ্বেগজনক ছিল। আর এখনকার যোগাযোগের ক্ষেত্রে-এমনকি আমার স্বামীর সাথেও, যিনি সাধারণত কঠোর সামরিক মানসিকতা নিয়ে কাজ করেন এবং কেবল নিজের দায়িত্ব পালনে মনোযোগী থাকেন-তাকে দেখেও মনে হচ্ছে তিনি যেন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তার দলের সদস্যদের সহযোগিতা পাওয়া এবং তাদের দিয়ে কাজ করানোটাও তার জন্য খুব কঠিন হয়ে পড়েছে।”
লিংকন-এর ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে ক্রমবর্ধমান আলোচনার মধ্যেই কেলির এই মন্তব্যগুলো সামনে এসেছে। রণতরীটি মূলত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মোতায়েনের উদ্দেশ্যে ২১ নভেম্বর, ২০১৯-এ স্যান ডিয়েগো ত্যাগ করেছিল। ২৮শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সাথে যৌথ আক্রমণ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র যখন সেখানে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছিল, তখন জানুয়ারি মাসে বিমানবাহী রণতরিটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ‘লিংকন’ এবং এর বিমানবহর ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ও ইরানি বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ কার্যক্রমকে সহায়তা প্রদান করে।
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বর্তমানে এক রেকর্ড-গড়া মোতায়েন অভিযানের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে জাহাজটি কোনো বন্দরে নোঙর করতে পারেনি, যার ফলে এর নাবিক ও কর্মীদের মনোবল ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর থেকে কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর জন্য নিজ ঘাঁটি বা বন্দর থেকে দূরে থাকার দীর্ঘতম সময়ের রেকর্ডটি এই জাহাজটি ভেঙে ফেলতে পারে।
এর আগের রেকর্ডটি মাত্র কয়েক মাস আগেই গড়েছিল ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড; জাহাজটি টানা ৩২৬ দিনের মোতায়েন অভিযান সম্পন্ন করেছিল, যার মধ্যে ইরান ও ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে পরিচালিত কার্যক্রমও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
লিংকন-এ কর্মরত একজন নাবিক জাহাজের কর্মীদের মনোবল অত্যন্ত তলানিতে বলে উল্লেখ করেছেন এবং জানিয়েছেন যে, সহকর্মীদের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তাভাবনার কথা তিনি বারবার শুনেছেন। ওই নাবিক আরও জানান, জাহাজে নিত্যপ্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়েও নিয়মিত সমস্যা দেখা দিচ্ছে-প্রায়শই টয়লেট ও পানির ফোয়ারা বন্ধ থাকছে এবং গরম পানির ব্যবস্থাও অনেক সময় পাওয়া যাচ্ছে না।
ওই নাবিক সিএনএন-কে বলেছেন, "প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে যখন আমরা ক্যাপ্টেনের কথা শুনি, তখন দেশে ফেরার খবরের জন্য আমরা অধীর আগ্রহ ও উদ্বেগের সাথে অপেক্ষা করতে থাকি।"
লিংকন-এ কর্মরত অন্যান্য নাবিক, যারা সিএনএন-এর সাথে কথা বলেছেন, তারা বর্তমান পরিস্থিতিকে তাদের আগের মোতায়েন অভিযানের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে বর্ণনা করেছেন। এর প্রধান কারণ হলো যুদ্ধের মতো পরিস্থিতির কারণে রণতরীটি কোনো বন্ধুত্বপূর্ণ বন্দরে থামতে পারেনি; অথচ বন্দরে যাত্রাবিরতির সময় জাহাজগুলো নতুন রসদ সংগ্রহ করতে পারে এবং নাবিকরা বিশ্রাম ও স্বস্তির সুযোগ পান।
নাবিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা সিএনএন-কে জানিয়েছেন যে, জাহাজটিতে মাঝেমধ্যে খাবারের ঘাটতি, পরিচ্ছন্নতা বা স্বাস্থ্যবিধি রক্ষার সামগ্রীর স্বল্পতা এবং পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ত্রুটির মতো সমস্যা দেখা দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নাবিক সিএনএনকে বলেছেনন, "আগে জাহাজের দোকানে গিয়ে ইচ্ছেমতো কেনাকাটা করা যেত এবং পরিচ্ছন্নতা বা স্বাস্থ্যবিধি রক্ষার সব পণ্য সবসময় পাওয়া যেত।" কিন্তু এখন কেনাকাটার ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে এবং "স্বাস্থ্যবিধি রক্ষার প্রয়োজনীয় পণ্যগুলো প্রায় পাওয়াই যাচ্ছে না।"
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিএনএন-এর সঙ্গে কথা বলা ‘লিংকন’-এর এক নাবিকের বাবা বলেন, তিনি বোঝেন যে তাঁর সন্তানের মতো নাবিকরা দায়িত্ব পালনের জন্যই নৌবাহিনীতে যোগ দেয় এবং যুদ্ধাবস্থায় সেই দায়িত্ব পালন করা স্বভাবতই কঠিন। তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন আগেভাগে বিকল্প ব্যবস্থা বা ‘রিলিফ’ পাঠানো হলো না এবং দীর্ঘ সময় ধরে মোতায়েন থাকার ফলে সৃষ্ট মানসিক চাপের কিছু অংশ কি এড়ানো যেত না?
সিএনএন-কে দেওয়া এক বিবৃতিতে নৌবাহিনী বলেছে, “জাহাজে আত্মহত্যার চিন্তা বা প্রচেষ্টার কোনো বৃদ্ধি আমরা লক্ষ্য করিনি। আমরা প্রতিটি সদস্যের সুস্থতাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখি এবং কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা মূল্যায়ন ও সমাধানের জন্য আমাদের কাছে ধর্মীয়, চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক পেশাজীবীরা রয়েছেন।”
একজন মার্কিন কর্মকর্তা আরও বলেন, মোতায়েনের সময়সীমা এবং আত্মঘাতী চিন্তার মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে বলে নৌবাহিনী মনে করে না; তাছাড়া জাহাজ থেকে সমুদ্রে পড়ে যাওয়ার ঘটনা এই নৌবহরের ক্ষেত্রে কোনো বিচ্ছিন্ন বা নতুন ঘটনা নয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ‘লিংকন’-এর এক নৌসেনার স্ত্রী শুক্রবার সিএনএন-এর জেক ট্যাপারকে বলেন, প্রেসিডেন্ট “কথা বলার আগে ভাবেন না।” তিনি প্রেসিডেন্ট এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ-উভয়কেই “কিছুটা সহানুভূতি” দেখানোর আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “আপনার সেনাবাহিনী, আপনার জাহাজ এবং আপনার যুদ্ধের ক্ষেত্রে যা ঘটছে, তার দায়ভার গ্রহণ করুন। আপনার যুদ্ধ। বিষয়টি অত্যন্ত ক্ষোভের।”
