শনিবার   ১৫ আগস্ট ২০২৬   শ্রাবণ ৩০ ১৪৩৩   ০১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

মন্তব্য প্রতিবেদন

কর্নেল অলির প্রার্থীতা ও কাজি মন্টুর কলাম

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০২:০৬ এএম, ১৫ আগস্ট ২০২৬ শনিবার


 
জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে জোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেছে। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। তাই এই পদে পদে এমন একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, সজ্জন ও গ্রহণযোগ্য মানুষ থাকা প্রয়োজন, যার রাজনৈতিক পটভূমি প্রশ্নাতীত এবং যার ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতা সর্বমহলে শ্রদ্ধা ও সম্মানের অধিকারী।
সংগৃহিত কিছু তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাক, রাজনৈতিক মতাদর্শে যিনি গিরগিটির মতো ঘন ঘন রং বদলান এমন একজন ব্যক্তি জনাব অলি আহমেদ এই পদের জন্য কতটা যোগ্য, নাকি জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি ‘ভণ্ড দলে’র ক্রীড়নক ও একজন রাজনৈতিক জোকার হিসেবে রাষ্ট্রীয়পর্যায়ের এত উঁচু পদের নির্বাচনে নিশ্চিত পরাজয় জেনেও একজন প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছেন।
কর্নেল (অব.) অলি আহমদ জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক প্রায় সংগঠন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি। অলি আহমেদের দল এলডিপির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও টেলিভিশন টকশোর পরিচিত মুখ রেদওয়ান আহমদের নেতৃত্বে দলের একটি বিরাট অংশ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বিএনপিতে যোগ দেয়। পরবর্তীতে রেদওয়ান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, কিন্তু অলি আহমদ নিজে নির্বাচনে পরাজিত হন।
কর্নেল (অব.) অলি আহমদ একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা, বিএনপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা, সাবেক মন্ত্রী সংসদ সদস্য । ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি যোগাযোগমন্ত্রী হন এবং ১৯৯৬ সালের মার্চে বিএনপি সরকারের শেষ পর্যায়ে স্বল্প সময়ের জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেন। বিএনপি সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে অলি আহমেদকে কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়নি।
২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে দলত্যাগকারী সাবেক বিএনপি নেতা ও রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং বিএনপির তৎকালীন স্থায়ী কমিটির সদস্য কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) গঠিত হয়। মাত্র আট মাসের মধ্যে, ২০০৭ সালের জুনে, এলডিপি প্রকাশ্য বিভক্তির মুখে পড়ে। বদরুদ্দোজা চৌধুরী অলি আহমদকে দল থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা দেন; অন্যদিকে অলি আহমদও নিজস্ব কমিটি ঘোষণা করে তাঁর নেতৃত্বাধীন অংশকেই মূল এলডিপি হিসেবে দাবি করেন। শেষ পর্যন্ত বদরুদ্দোজা চৌধুরী তাঁর অনুসারীদের নিয়ে পুনরায় বিকল্পধারা বাংলাদেশ গঠন করেন, আর অলি আহমদ এলডিপির নেতৃত্ব ধরে রাখেন।
এই ঘটনাটি কর্নেল (অব.) অলি আহমদের রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং তাঁর রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও দল পরিচালনার ইতিহাস মূল্যায়নের ক্ষেত্রে উপেক্ষা করার মতো বিষয় নয়। রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের কারণে তার ভূমিকা, আচরণ ও কথাবার্তা ছিল সবসময়ই বিতর্কিত। বিএনপির প্রথম মেয়াদে যোগাযোগ মন্ত্রী থাকাকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার জন্য তিনি মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। এ কারণেই, বিএনপির ভেতরে অলি আহমদের রাজনৈতিক অবস্থান ও নেতৃত্বের নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তাঁর হাতে দেওয়া কতটা নিরাপদ ও সমীচীন- এ নিয়ে বেগম জিয়ার সংশয় ছিল বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল।
সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে তিনি প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি । বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর কর্নেল (অব.) অলি আহমেদের ম্যানিপুলেশনে জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম প্রথমে ডিজিএফআই-এর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান। পরে তারই প্রভাবে নাসিম সেনাপ্রধানও হন।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল নূরউদ্দীন জুন ১৯৯০ থেকে আগস্ট ১৯৯৪ পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাঁর চাকরির মেয়াদ বর্ধিত করে তাঁকে সেনাপ্রধান হিসেবে বহাল রাখতে চেয়েছিলেন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুতের কাজও চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। বাগড়া দিলেন যোগাযোগ মন্ত্রী কর্নেল অলি আহমেদ। তিনি এক প্রকার জোর খাটিয়েই লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমকে সেনা প্রধান বানাতে বেগম জিয়াকে বাধ্য করেছিলেন।
অলি আহমদকে ভারতপন্থী এবং ভারতের বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবে দেখা হতো। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগও ছিল তার বিরুদ্ধে। অবশ্য রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভোল পাল্টে ২০২৬ সালে অলি আহমদ ভারত ও র-এর নীতির সমালোচনা করেন । ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ১১-দলীয় জোটের প্রচারণায় তিনি বলেন, ভারত বিরোধিতা তাঁর বক্তব্যের উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু বাংলাদেশের নীতি ভারত বা র-এর নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত নয়।
ভারত সরকারের আমন্ত্রণে ১৯৯৩ সালের ২ থেকে ৯ মে তিনি ভারত সফর করেন। তার ভারত সফরকালে তার স্কুল পড়ুয়া কনিষ্ঠতম কন্যা ইনকিলাব পত্রিকার কর্মচারী উচ্চ মাধ্যমিক পাস তরুণ রাব্বির সাথে অন্তর্ধান হয়। এই কন্যাটি ছিল তার দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান।
ওই সময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের নাক গলানোর বিরুদ্ধে বাংলা পত্রিকা ইনকিলাবের কঠোর সমালোচনামূলক অবস্থান ছিল এবং দেশের জাতীয়তাবাদী পাঠকদের কাছে ইনকিলাব দারুণভাবে সমাদৃত ছিল ।
বাংলা দৈনিক ইনকিলাবের মালিক ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার হিসেবে অভিযুক্ত মওলানা মান্নান। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র বাহাউদ্দীন ছিলেন পত্রিকাটির সম্পাদক। কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পত্রিকাটিকে অপছন্দ করতেন এবং মওলানা মান্নান সম্পর্কে কটূক্তি করতেন। যাহোক, অলি আহমেদের কন্যা নিয়ে পালিয়ে যাওয়া রব্বীকে আশ্রয় ও সুরক্ষা দেন বাহাউদ্দীন ।
মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে অলি আহমদ দ্রুত ভারত সফর শেষ করে দেশে ফিরে আসেন। ঘনিষ্ঠজনদের সহযোগিতায় তিনি রাব্বির আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। এই আলোচনায় জাতীয় পার্টির নেতা, প্রাক্তন মন্ত্রী ও গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রির মালিক চট্টগ্রামের ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ অলি আহমদকে সহযোগিতা করেন । মান-সম্মান রক্ষার্থে এবং পত্র-পত্রিকায় মুখরোচক খবর ঠেকাতে অলি আহমেদ ঘনিষ্টজনদের পরামর্শে দ্রুত আপস মীমাংসায় রাজি হয়ে যান। প্রধান মন্ত্রী বেগম জিয়ার উপস্থিতিতে অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়ন করে বিয়েটি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয় এবং অলি আহমদ তাঁর মেয়েকে রাব্বির হাতে তুলে দেন।
বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হয় ১৯৯৬ সালের ৩০শে মার্চ । তখনকার রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বে তত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। ১৯৯৬ সালের মে মাসে অলি আহমেদের সমর্থনপুষ্ট  সেনাপ্রধান জেনারেল নাসিম ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা করে। এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। সেই সেনা-সংকটের সময় রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের দৃঢ় অবস্থান এবং সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রতিরোধের মুখে জেনারেল নাসিমের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। সেই ঘটনাকে ঘিরে তখন নানা জল্পনা-কল্পনা ছিল।
অলি আহমেদের বিতর্কিত রাজনৈতিক ভূমিকা, ভারতের সঙ্গে গোপন যোগাযোগের অভিযোগ এবং জেনারেল নাসিমসহ সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সাথে সংশ্লিষ্টতা কারণে ২০০১ সালে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় আসলে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাকে মন্ত্রী পদে নিয়োগ দেননি।