শনিবার   ০৮ আগস্ট ২০২৬   শ্রাবণ ২৩ ১৪৩৩   ২৩ সফর ১৪৪৮

নিউইয়র্কে আতংকিত অভিবাসীরা

আজকাল ডেস্ক

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০২:১৭ এএম, ৮ আগস্ট ২০২৬ শনিবার

 

 
 

যে শহর দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষের নিরাপদ আশ্রয় ও স্বপ্নের ঠিকানা হিসেবে পরিচিত ছিল, সেই নিউইয়র্ক এখন বহু অভিবাসীর কাছে পরিণত হয়েছে ভয়, অনিশ্চয়তা ও প্রতিদিন গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কার নগরীতে। যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট-আইসের একের পর এক অভিযান, হঠাৎ ধরপাকড় এবং সশস্ত্র ও মুখোশধারী ফেডারেল এজেন্টদের উপস্থিতিতে অনথিভুক্ত অভিবাসীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে চরম ভীতি।
নিউইয়র্ক সিটির কুইন্স, ব্রুকলিন, ব্রঙ্কস, ম্যানহাটন থেকে লং আইল্যান্ড, সর্বত্র আইসের সম্ভাব্য উপস্থিতি নিয়ে চলছে উদ্বেগ ও সতর্কতা। গ্রেপ্তার এড়াতে অনেক অনথিভুক্ত অভিবাসী ঘর থেকে বের হওয়া সীমিত করেছেন, কর্মস্থলে যাচ্ছেন না, পরিচিত ঠিকানা ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করছেন অথবা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে কমিউনিটি সংগঠন ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।
স্কুলে সন্তান আনা-নেওয়া, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাওয়া, আদালতে হাজিরা দেওয়া, গাড়ি চালানো কিংবা বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত-প্রতিদিনের প্রায় প্রতিটি কাজ নিয়েই তৈরি হয়েছে নতুন শঙ্কা। আইসের অভিযান প্রতিরোধে স্থানীয় বাসিন্দাদের রাস্তায় নেমে আসা, এজেন্টদের সঙ্গে উত্তেজনা এবং ভিডিও ধারণকারী নাগরিকের ওপর কেমিক্যাল স্প্রে ব্যবহারের ঘটনায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
গত ২৭ জুলাই সোমবার থেকে নিউইয়র্ক সিটি ও আশপাশের এলাকায় আইসের নতুন করে তৎপরতা বৃদ্ধির খবর ছড়িয়ে পড়ে। কুইন্সে অভিযান শুরুর খবরের পর ব্রুকলিন, ব্রঙ্কস, ম্যানহাটন, স্ট্যাটেন আইল্যান্ড এবং লং আইল্যান্ডের নাসাউ ও সাফোক কাউন্টিতেও আইসের নজরদারি নিয়ে সতর্কতা জারি করে বিভিন্ন অভিবাসী অধিকার সংগঠন।
তবে গত এক সপ্তাহের অভিযানে নিউইয়র্ক সিটি ও লং আইল্যান্ডে মোট কতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন, আইস বা হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ এখনো তার পূর্ণাঙ্গ ও এলাকাভিত্তিক সরকারি হিসাব প্রকাশ করেনি। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের সংখ্যাগুলো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
এদিকে, নিউইয়র্ক সিটির স্যাংচুয়ারি নীতির কারণে স্থানীয় পুলিশ ও কারা কর্তৃপক্ষ সাধারণ দেওয়ানি অভিবাসন অপরাধের ক্ষেত্রে আইসকে সরাসরি সহযোগিতা করতে পারে না। শুধু আইসের প্রশাসনিক ‘ডিটেইনার’ বা কাউকে ধরে রাখার অনুরোধের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তিকে কারাগারে অতিরিক্ত সময় আটকে রাখার সুযোগও সীমিত।
ফেডারেল কর্মকর্তাদের দাবি, নিউইয়র্ক সিটি ডিপার্টমেন্ট অব কারেকশন গত অর্থবছরে এমন কয়েকশ ব্যক্তিকে মুক্তি দিয়েছে, যাদের বিষয়ে আইস হেফাজতে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিল। আইস এখন মুক্তি পাওয়া এসব ব্যক্তিকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে বলে ফেডারেল সূত্রগুলো জানিয়েছে।
নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেলের নির্দেশনা অনুযায়ী, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো সাধারণত বিচারকের স্বাক্ষরযুক্ত পরোয়ানা ছাড়া শুধুমাত্র ফেডারেল দেওয়ানি ইমিগ্রেশন ডিটেইনারের ভিত্তিতে কাউকে আটক রাখতে পারে না। 
এই আইনি ও রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যেই নিউইয়র্কে আইসের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে সিটি কর্তৃপক্ষ ফেডারেল অভিযান ঠেকাতে না পারলেও সিটি ভবন, স্কুল, হাসপাতাল, আশ্রয়কেন্দ্র এবং স্থানীয় সংস্থার তথ্য আইসের হাতে যাওয়ার পথ সীমিত করার চেষ্টা করছে।
একাধিক সূত্র জানায়, অভিবাসী অধিকারকর্মীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো তথাকথিত ‘কোল্যাটারাল অ্যারেস্ট’। এর অর্থ, আইস কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে খুঁজতে গিয়ে একই বাড়ি, গাড়ি, কর্মস্থল বা আশপাশে থাকা অন্য কোনো অনথিভুক্ত ব্যক্তির সন্ধান পেলে তাকেও গ্রেপ্তার করতে পারে।
এ ধরনের গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় এমন ব্যক্তিরাও ভয়ে রয়েছেন, যাদের নামে আইসের কোনো নির্দিষ্ট গ্রেপ্তারি নির্দেশ আছে কি না, তা তারা জানেন না। কোনো আত্মীয় বা সহকর্মীকে দেখতে যাওয়া, একই গাড়িতে চলাচল করা অথবা কোনো অভিযানের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকাও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করছেন আইনজীবীরা।
নিউইয়র্ক ও নিউজার্সির অভিবাসন গ্রেপ্তার নিয়ে সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত নিউইয়র্ক মহানগরী, লং আইল্যান্ড ও নিউজার্সিতে নথিভুক্ত ৪৩০টি রাস্তার গ্রেপ্তারের ৯৩ শতাংশের লক্ষ্য ছিলেন লাতিনো জনগোষ্ঠীর মানুষ। কয়েকটি মামলায় ভুল পরিচয়, জাতিগত প্রোফাইলিং এবং বলপ্রয়োগের অভিযোগও উঠে এসেছে। 
গত ৩০ জুলাই বৃহস্পতিবার আপার ম্যানহাটনের ইনউড এলাকায় আইসের অভিযান ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে। ইশাম স্ট্রিট ও সিম্যান অ্যাভিনিউয়ের কাছে মুখোশ ও বডি আর্মার পরা ফেডারেল এজেন্টদের উপস্থিতি দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা সেখানে জড়ো হন।
স্থানীয় বাসিন্দা লিন্ডা উলফ মোবাইল ফোনে আইসের কার্যক্রম ধারণ করছিলেন। প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, একজন মুখোশধারী ফেডারেল এজেন্ট রাস্তা পার হয়ে তার দিকে এগিয়ে যান এবং কাছ থেকে তার মুখে কেমিক্যাল স্প্রে করেন। আশপাশে থাকা আরও কয়েকজনও স্প্রের প্রভাবে আক্রান্ত হন।
উলফ বলেছেন, তিনি নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে কেবল ভিডিও করছিলেন এবং কোনো এজেন্টের কাজে শারীরিক বাধা দেননি। ঘটনার পর তিনি আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। 
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতেও এজেন্টকে রাস্তা পার হয়ে ভিডিও ধারণকারী নারীর দিকে গিয়ে স্প্রে করতে দেখা যায়। তবে আইসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে কি না যে ওই নারী এজেন্টদের কাজে বাধা দিয়েছিলেন-সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। 
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী অনুযায়ী, জনসমাগমের স্থানে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম ভিডিও করা সাধারণত নাগরিকদের অধিকার। তবে কোনো গ্রেপ্তার, যানবাহন বা এজেন্টের চলাচলে শারীরিকভাবে বাধা দেওয়া আইনগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ইনউডের ঘটনার পর আপার ম্যানহাটনের অভিবাসী কমিউনিটিতে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বাসিন্দারা এলাকায় কমিউনিটি পর্যবেক্ষক দল গঠন, দ্রুত সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দেওয়া এবং অভিযানের ভিডিও ও গাড়ির নম্বর সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছেন।
এদিকে, লং আইল্যান্ডে আইসের গ্রেপ্তার কার্যক্রমে গাড়ি, কর্মস্থল এবং বাসার আশপাশে নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হয়ে উঠেছে। নিউজডে প্রায় ৪০০টি আইস গ্রেপ্তারের ঘটনা পর্যালোচনা করে অন্তত ৮৪টি ঘটনায় গাড়ি ব্যবহাররত অবস্থায় ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের তথ্য পেয়েছে।
এসব ঘটনার মধ্যে ট্রাফিক স্টপ, পার্কিং লট, বাসা বা কর্মস্থলের বাইরে এবং গাড়ি থেকে ওঠানামার সময় আটক করার ঘটনা রয়েছে। লাইসেন্স প্লেট রিডার ও অন্যান্য তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যক্তিদের গাড়ির অবস্থান শনাক্ত করা হচ্ছে বলেও অনুসন্ধানটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। 
অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এর ফলে অনথিভুক্ত ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের সঙ্গে একই গাড়িতে থাকা বৈধ অভিবাসী ও মার্কিন নাগরিক পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
কেউ কেউ এখন গাড়িতে ইমিগ্রেশন আইনজীবীর ফোন নম্বর, পরিবারের জরুরি যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় নথির কপি রাখছেন। আবার অনেকেই কর্মস্থল বা সন্তানদের স্কুলে যাওয়ার নিয়মিত পথ পরিবর্তন করছেন।
দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে টিএসএর যাত্রী-তথ্য আইসের সঙ্গে ভাগাভাগি এবং ভিসার মেয়াদ অতিক্রমকারী ব্যক্তিদের শনাক্ত করার খবর প্রকাশের পর নিউইয়র্কের জেএফকে ও লাগার্ডিয়া বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত নিয়েও অভিবাসীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।
তবে গত এক সপ্তাহে জেএফকে বা লাগোয়ার্ডিয়া বিমানবন্দরে ঠিক কতজন অভিবাসীকে আইস গ্রেপ্তার করেছে, তার নির্ভরযোগ্য পৃথক সংখ্যা প্রকাশিত হয়নি। তাই বিমানবন্দর দুটিতে ‘ব্যাপক ধরপাকড়’ চলছে-এমন দাবি সরকারি তথ্য ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
অভিবাসন আইনজীবীরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে ভ্রমণের বৈধ পরিচয়পত্র থাকা মানেই একজন ব্যক্তি ইমিগ্রেশন গ্রেপ্তার থেকে সুরক্ষিত নন। কারও বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বহিষ্কার আদেশ, ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া অথবা চলমান আইনি সমস্যা থাকলে বিমানবন্দরে পরিচয় যাচাইয়ের সময় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
নিউইয়র্কে নতুন তৎপরতার এক সপ্তাহ আগে, ২০ জুলাই সোমবার লোয়ার ম্যানহাটনের ২৬ ফেডারেল প্লাজার বাইরে অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনা ঘটে। ভবনটিতে আইস, এফবিআই এবং ফেডারেল ইমিগ্রেশন আদালতসহ একাধিক সরকারি দপ্তর রয়েছে।
কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ৪৩ বছর বয়সী সাবেক সেনাসদস্য অ্যান্ড্রু আরাবাকা ভবনের সামনে দাহ্য পদার্থ দিয়ে আগুন ধরান, আতশবাজি বিস্ফোরণ ঘটান এবং একটি পেলেট বা এয়ারসফট অস্ত্র থেকে গুলি ছোড়েন। ঘটনায় সরকারি কর্মচারী ও ইমিগ্রেশন শুনানিতে আসা একজনসহ তিনজন আহত হন। 
তার কাছে কুঠার, ছুরি, হাতুড়ি, চাপাতি এবং আইসবিরোধী বার্তাসংবলিত সামগ্রী পাওয়া যায় বলে এফবিআই জানিয়েছে। মেয়র জোহরান মামদানি ঘটনাটিকে গভীরভাবে উদ্বেগজনক বলে নিন্দা জানান।
তবে ওই হামলাই ২৭ জুলাই সোমবার থেকে নিউইয়র্কে আইসের অভিযান বৃদ্ধির একমাত্র বা সরাসরি কারণ-এমন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ফেডারেল সরকার দেয়নি। নিউইয়র্কের স্যাংচুয়ারি নীতির বিরুদ্ধে ফেডারেল প্রশাসনের বিরোধ এবং অভিযান বাড়ানোর হুমকি এরও আগে থেকে চলছিল।
নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি আইসের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আইসের অভিযান অভিবাসী কমিউনিটিতে ভয় ও সন্দেহের সংস্কৃতি তৈরি করছে এবং সিটির বাসিন্দাদের স্থানীয় পুলিশ, হাসপাতাল, স্কুল ও সরকারি সেবা থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
ফেব্রুয়ারিতে মেয়র মামদানি নির্বাহী আদেশ নম্বর ১৩ জারি করে সিটির স্যাংচুয়ারি সুরক্ষা পুনর্ব্যক্ত করেন। আদেশে সিটি সংস্থার ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা, ফেডারেল ইমিগ্রেশন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের নীতিমালা পর্যালোচনা এবং অভিবাসন অভিযানে সিটির সম্পদ ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ জোরদার করা হয়। 
মেয়রের দপ্তর জানিয়েছে, বিচারকের স্বাক্ষরযুক্ত বৈধ পরোয়ানা ছাড়া আইসকে সিটির স্কুল, হাসপাতাল, আশ্রয়কেন্দ্র ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রিত স্থানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে ‘নো ইয়োর রাইটস’ বা নিজের অধিকার জানুন কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন ভাষায় ৩০ হাজারের বেশি নির্দেশিকা বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 
মেয়র মামদানি বলেছেন, নিউইয়র্কের স্যাংচুয়ারি আইন কোনো রাজনৈতিক পছন্দ নয়; এটি সিটি কর্মীদের মানতে বাধ্যতামূলক আইন। এনওয়াইপিডি বা অন্য সিটি কর্মীরা সাধারণ দেওয়ানি বহিষ্কার কার্যক্রমে আইসকে সহায়তা করতে পারবেন না। তবে স্যাংচুয়ারি আইন আইসকে নিউইয়র্কে প্রবেশ বা নিজের এজেন্ট দিয়ে গ্রেপ্তার করা থেকে নিষিদ্ধ করে না। আইনটি মূলত সিটি পুলিশ, কারাগার ও সরকারি সংস্থা কখন এবং কতটুকু ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করতে পারবে, তার সীমা নির্ধারণ করে।
এদিকে, অভিবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে হাসপাতাল ও স্কুলে যাওয়ার ভয়ও বেড়েছে। নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেলের নির্দেশনা অনুযায়ী, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সাধারণভাবে রোগীর ইমিগ্রেশন বা নাগরিকত্বের তথ্য সংগ্রহ বা আইসকে জানানোর বাধ্যবাধকতা নেই। অভিবাসন অবস্থার কারণে জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রত্যাখ্যানও করা যায় না। 
এ ছাড়া কোনো হাসপাতালের রোগীর কক্ষ, পরীক্ষা কক্ষ, কর্মীদের অফিস বা জনসাধারণের জন্য বন্ধ ব্যক্তিগত স্থানে প্রবেশ করতে আইসের সাধারণত বিচারকের স্বাক্ষরযুক্ত পরোয়ানা প্রয়োজন।
আগে হাসপাতালের ভেতর ও বাইরে আইসের উপস্থিতি ঘিরে প্রতিবাদ, পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি এবং পেপার স্প্রে ব্যবহারের ঘটনায় নিউইয়র্কের অভিবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো ঘটনার ভিডিওকে নতুন অভিযান হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে বলেও সতর্ক করেছেন অধিকারকর্মীরা।
অভিবাসী অধ্যুষিত কুইন্স, ব্রুকলিন, ব্রঙ্কস ও লং আইল্যান্ডে আইসের উপস্থিতির খবরে রেস্তোরাঁ, নির্মাণ, ডেলিভারি, পরিচ্ছন্নতা, ট্যাক্সি এবং দৈনিক শ্রমনির্ভর ব্যবসায় কর্মীদের অনুপস্থিতি বাড়ছে বলে ব্যবসায়ী ও কমিউনিটি নেতারা জানিয়েছেন।
অনেকে নগদ অর্থ তুলতে ব্যাংকে যাচ্ছেন না, চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করছেন এবং পরিবারের সদস্যদের স্কুল বা কর্মস্থলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন। বিশেষ করে যেসব পরিবারের একজন সদস্য অনথিভুক্ত, সেখানে পুরো পরিবারের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে প্রতিদিন অসংখ্য ‘আইস দেখা গেছে’ বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে। এসবের কিছু সত্য হলেও অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ, বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী কিংবা পুরোনো ভিডিওকে আইস অভিযান হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
অধিকার সংগঠনগুলো কোনো খবর শেয়ার করার আগে সঠিক স্থান, সময়, এজেন্টদের পোশাক বা সংস্থার নাম, গাড়ির নম্বর এবং সত্যিই কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না-তা যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছে।
নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেলের নির্দেশনা অনুযায়ী, আইস কর্মকর্তারা বিচারকের স্বাক্ষরযুক্ত পরোয়ানা অথবা বাসিন্দার স্বেচ্ছা অনুমতি ছাড়া সাধারণত কোনো বাড়িতে প্রবেশ করতে পারেন না। 
আইসের ফর্ম আই-২০০ বা আই-২০৫ প্রশাসনিক পরোয়ানা। এসব নথিতে সাধারণত আইস কর্মকর্তা স্বাক্ষর করেন, বিচারক নন। শুধু প্রশাসনিক পরোয়ানা দেখিয়ে আইস কোনো বাড়ি কিংবা কর্মস্থলের ব্যক্তিগত অংশে প্রবেশের আইনি অধিকার পায় না। 
দরজা না খুলে এজেন্টকে পরোয়ানাটি জানালা দিয়ে দেখাতে বা দরজার নিচ দিয়ে দিতে বলা যেতে পারে। নথিতে সঠিক নাম, ঠিকানা, বিচারকের স্বাক্ষর এবং প্রবেশ বা তল্লাশির স্পষ্ট অনুমতি রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা জরুরি।
কোনো কর্মস্থলের জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থানে আইস প্রবেশ করতে পারে। তবে কর্মীদের বিশ্রামকক্ষ, রান্নাঘরের পেছনের অংশ, গুদাম, ব্যক্তিগত অফিস এবং শুধু কর্মীদের জন্য নির্ধারিত এলাকায় বিচারিক পরোয়ানা বা মালিকের অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করতে পারে না।
কেউ আইসের মুখোমুখি হলে নীরব থাকার অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। তিনি বলতে পারেন, “আমি নীরব থাকার অধিকার প্রয়োগ করছি এবং আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলতে চাই।”
মিথ্যা নাম, ভুয়া নথি অথবা মার্কিন নাগরিকত্বের মিথ্যা দাবি করা উচিত নয়। আইনজীবীর পরামর্শ ছাড়া ‘স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ’ বা অন্য কোনো কাগজে স্বাক্ষর না করার পরামর্শ দিয়েছেন অভিবাসন আইনজীবীরা।
জনসমাগমের স্থানে নিরাপদ দূরত্বে থেকে আইসের অভিযান ভিডিও করা যায়। ভিডিওতে সম্ভব হলে স্থান, সময়, এজেন্টদের ব্যাজ বা পোশাক, গাড়ির নম্বর এবং গ্রেপ্তারের পরিস্থিতি ধারণ করা যেতে পারে।
তবে এজেন্টদের ধাক্কা দেওয়া, গাড়ির সামনে দাঁড়ানো, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিকে টেনে নেওয়া অথবা শারীরিকভাবে অভিযান ঠেকানোর চেষ্টা করলে ফেডারেল অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির নাম, জন্মতারিখ, জন্মের দেশ এবং ‘এ-নম্বর’ জানা থাকলে পরিবারের পক্ষে তাকে খুঁজে পাওয়া সহজ হয়। প্রতিটি অভিবাসী পরিবারের উচিত আগেই একজন আইনজীবী, পরিবারের দায়িত্বশীল সদস্য এবং সন্তানের জরুরি অভিভাবক নির্ধারণ করে রাখা।
নিউইয়র্ক সিটির বিনা মূল্যের ও গোপনীয় ইমিগ্রেশন আইনি সহায়তা পেতে ৮০০-৩৫৪-০৩৬৫ নম্বরে ফোন করা যাবে।
৩১১ নম্বরে ফোন করে “ইমিগ্রেশন লিগ্যাল” বললেও সিটির অনুমোদিত আইনি সেবার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। বিভিন্ন ভাষায় সহায়তা পাওয়া যায়।
নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেলের ইমিগ্রেশন অধিকারসংক্রান্ত সহায়তা নম্বর ৮০০-৪২৮-৯০৭১। 
কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হলে দ্রুত অভিবাসন আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করা জরুরি। কারণ বহিষ্কার মামলার আদালত এবং ফৌজদারি আদালত আলাদা, আর আইসের হেফাজতে থাকা ব্যক্তিকে দ্রুত অন্য অঙ্গরাজ্যে স্থানান্তর করা হতে পারে।
নিউইয়র্কের স্যাংচুয়ারি আইন, ফেডারেল সরকারের অভিবাসন নীতি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিবাদ-এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে সামনে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সিটি প্রশাসন আইসের সঙ্গে স্থানীয় সহযোগিতা সীমিত রাখার ঘোষণা দিলেও ফেডারেল এজেন্টরা নিজস্ব ক্ষমতায় রাস্তায়, বাসা ও কর্মস্থলের বাইরে, গাড়ি অনুসরণ করে এবং বিভিন্ন সরকারি তথ্য ব্যবহার করে গ্রেপ্তার অভিযান চালাতে পারে।
ফলে নিউইয়র্কের হাজারো অনথিভুক্ত অভিবাসীর সামনে এখন কঠিন বাস্তবতা, স্বাভাবিক জীবনযাপন করবেন, নাকি সম্ভাব্য গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে থাকবেন।