বৃহস্পতিবার   ২৩ জুলাই ২০২৬   শ্রাবণ ৭ ১৪৩৩   ০৭ সফর ১৪৪৮

নিউইয়র্কে লাফিয়ে বাড়ছে ডিপোর্টেশন

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০২:৪৪ এএম, ২৩ জুলাই ২০২৬ বৃহস্পতিবার

নিউইয়র্কে ইমিগ্রেশন আদালতের চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আদালতের নির্ধারিত তারিখ হঠাৎ এগিয়ে আনা, একদিনে শতাধিক মামলার শুনানি এবং সামান্য অনুপস্থিতির কারণেই হাজার হাজার মানুষ ডপোর্টেশন আদেশ পাচ্ছেন। ইমিগ্রেশন অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন ‘মেগা মাস্টার’ পদ্ধতি অভিবাসীদের ন্যায্য আইনি সুযোগকে সংকুচিত করে দিচ্ছে।

অলাভজনক গবেষণা সংস্থা bklg.org -এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে শুধু নিউইয়র্ক সিটিতেই ৪ হাজার ৪৪৭ জন অভিবাসী আদালতে অনুপস্থিত থাকার কারণে ডিপোর্টেশন আদেশ পেয়েছেন। মে মাসে এই সংখ্যা ছিল ২ হাজার ১৮৯। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে এই ধরনের বহিষ্কারাদেশ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।

সারাদেশেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ৫৩ হাজার ৮০৮টি ‘ইন অ্যাবসেনশিয়া’ বা অনুপস্থিতিতে ডিপোর্টেশন জারি হয়েছে, যা আগের মাসের তুলনায় ৫৫ শতাংশ বেশি। গবেষকদের মতে, ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে এ ধরনের পরিসংখ্যান সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা।

মেগা মাস্টার নামের নতুন এই ব্যবস্থায় একজন ইমিগ্রেশন বিচারকের সামনে একদিনে ৯০ থেকে ১২০টিরও বেশি মামলা তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। আগে যে শুনানির তারিখ কয়েক মাস বা এক বছর পরে নির্ধারিত থাকত, তা হঠাৎ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এগিয়ে আনা হচ্ছে।

গত শুক্রবার নিউইয়র্কের ২৬ ফেডারেল প্লাজা ইমিগ্রেশন আদালতে এমনই একটি দৃশ্য দেখা যায়। একজন বিচারকের সামনে ছিল ৯০টি মামলার শুনানি। সকাল শেষ হওয়ার আগেই কয়েক ডজন ব্যক্তি আদালতে উপস্থিত হতে পারেননি। বিচারক একে একে তাদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারের আদেশ দেন।

অনেক অভিবাসীর অভিযোগ, তারা ডাকযোগে কোনো নোটিশই পাননি। অনলাইন পোর্টাল বা মোবাইল অ্যাপ দেখে শেষ মুহূর্তে জানতে পেরেছেন যে আদালতের তারিখ বদলে গেছে। নিউইয়র্ক লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স গ্রুপের অভিবাসন আইনজীবী বেঞ্জামিন রেমি বলেন, অনেক মানুষ সকালে অনলাইন পোর্টাল খুলে দেখছেন সেদিনই তাদের আদালতে হাজির হতে হবে। ফলে তারা কাজ ফেলে, সন্তানদের রেখে, কিংবা শত শত মাইল দূর থেকে তড়িঘড়ি আদালতের উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন।

গবেষণা বলছে, আগে শুনানির নোটিশ গড়ে ১৮০ দিন আগে দেওয়া হতো। মে মাসে তা নেমে আসে ৯৮ দিনে, আর জুন মাসে কমে দাঁড়ায় মাত্র ৪২ দিনে। অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই পদ্ধতি অভিবাসীদের ন্যায্য বিচার পাওয়ার সুযোগকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

সাউথ ব্রুকলিন স্যাংচুয়ারি কর্মসূচি পরিচালক আমেলিয়া নয়মায়ার বলেন, প্রশাসন এমনভাবে আদালতের তারিখ পরিবর্তন করছে যাতে অনেক মানুষ সময়মতো হাজিরই হতে না পারেন। তার সংস্থার অন্তত ৩১ জন ক্লায়েন্টের শুনানির তারিখ কয়েক মাস এগিয়ে আনা হয়েছে, অথচ তাদের অধিকাংশই ডাকযোগে কোনো আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাননি।

অন্যদিকে এক্সিকিউটিভ অফিস ফর ইমিগ্রেশন রিভিউ (EOIR) সরাসরি এ বিষয়ে মন্তব্য না করলেও আগের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। সংস্থাটির মতে, দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে দ্রুত মামলার নিষ্পত্তি করলে বৈধ দাবিদারদেরও উপকার হবে এবং বিচার ব্যবস্থার জটও কমবে।

শুক্রবারের শুনানিতে উপস্থিত অনেকেই নিউইয়র্কের বাসিন্দা ছিলেন না। কেউ এসেছেন টেনেসি থেকে, কেউ জর্জিয়া, নর্থ ডাকোটা, ইলিনয় কিংবা টেক্সাস থেকে। অনেকেই শেষ মুহূর্তে বিমান টিকিট কেটে আদালতে পৌঁছেছেন। ৩৫ বছর বয়সী এরিকা ভালেরো, যিনি সম্প্রতি নিউইয়র্ক থেকে শিকাগোতে চলে গেছেন, জানান মাত্র এক সপ্তাহ আগে তিনি নতুন শুনানির তারিখ জানতে পারেন। নিজের ও মেয়ের জন্য শেষ মুহূর্তে বিমান টিকিট কিনতে তার এক হাজার ডলারের বেশি খরচ হয়েছে। শুনানির আগের রাত মা-মেয়ে বিমানবন্দরেই কাটিয়েছেন।

ভেনেজুয়েলার হুয়ান গুয়ারেগুয়া জানান, তার শুনানি মূলত ২০২৮ সালে হওয়ার কথা ছিল। পরে অনলাইন পোর্টাল ও একটি চিঠির মাধ্যমে জানতে পারেন তারিখ অনেক এগিয়ে আনা হয়েছে। তিনি স্ত্রী ও শিশুসন্তানকে নিয়ে টেক্সাস থেকে নিউইয়র্কে উড়ে আসেন। তার ভাষায়, "আমি শুধু চাই আমার আশ্রয় আবেদনের ন্যায্য মূল্যায়ন হোক। আমার অধিকারকে সম্মান করা হোক।"

শুক্রবার সকালের শুনানির শেষে আদালতের আইনি সহকারী একে একে ৫৬ জনের নাম পড়ে শোনান, যারা আদালতে উপস্থিত হননি। নাম পড়া শেষ করে তিনি বিচারকের দিকে তাকিয়ে বলেন, "অনেক বেশি সংখ্যা। দুঃখিত, বিচারক।" বিচারক থানোস কানেলাকোস শান্তভাবে উত্তর দেন, "এটা তোমার দোষ নয়। তুমি তো এসেছ।" এরপর তিনি তালিকা ধরে একে একে অনুপস্থিত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বহিষ্কারের আদেশ দেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন এই আদালত ব্যবস্থাকে কেউ দেখছেন বিচার ব্যবস্থার গতি বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে, আবার কেউ বলছেন এটি অভিবাসীদের জন্য ন্যায্য আইনি লড়াইয়ের সুযোগ আরও সংকুচিত করছে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—নিউইয়র্কের অভিবাসন আদালতে এখন সময়ের একদিনের ব্যবধানও একজন মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারে।