প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে ভারত চাপে
আজকাল প্রতিবেদন
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০১:২২ এএম, ২৭ জুন ২০২৬ শনিবার
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের কারণে ভারত চাপে পড়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু তারেক রহমান প্রতিবেশি দেশটিতে সফরে না গিয়ে চীনকে বেছে নিয়েছেন। যদিও প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তারেক রহমানের প্রথম গন্তব্য চীন নয়, মালয়েশিয়া। কিন্তু এই অঞ্চলের দুই বড় শক্তির মধ্যে তিনি চীনের ডাকে প্রথম সাড়া দিয়েছেন। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে থেকে ভারত নতুন সরকারের আমলে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা অংশগ্রহণ করেন। তারপর ভারত সফরে যান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এসব ঘটনায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হ”েছ বলে মনে হলেও বাস্তবে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আস্থার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।
এদিকে, প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর ভারত পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর ঘোষণা দিয়েছে। বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দীনের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করার পর পরই সরাসরি ভারতীয় ভিসা সেন্টারে গিয়ে ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী পর্যটন ভিসা চালুর ঘোষণা দেন। রোববার ২৮ জুন থেকে পর্যটন ভিসা চালু হবে। ২০২৪ সালে আগস্টে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে চলে গেলে বাংলাদেশে ভারতের বিভিন্ন ¯’াপনায় হামলা হয়। তার পরিপ্রেক্ষিতে জরুরী মেডিকেল ভিসা ছাড়া সব ধরনের ভিসা বন্ধ করে দেয় ভারত। প্রায় দুই বছর পর ভিসা চালুর ঘোষণা দিলেন দীনেশ ত্রিবেদী। ভারত এবার একটি অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটিয়েছে দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসাবে নিয়োগদানের মাধ্যমে। দীনেশ ত্রিবেদী কোনও পেশাদার কূটনীতিক নন। তিনি একজন রাজনীতিবিদ। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের রেলমন্ত্রী ছিলেন। প্রতিমন্ত্রীও ছিলেন। ভারতের রাজনীতিতে তিনি একটি আলোচিত নাম। এই প্রবীণ রাজনীতিবিদকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার নিয়োগ দিয়ে তার পদকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় উন্নীত করেছে ভারত। ভারত কী কারণে এবার চুক্তিতে একজন জেষ্ঠ্য রাজনীতিবিদকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসাবে পাঠালো তা স্পষ্ট নয়। তবে অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে আ¯’ার সংকটের মূল কারণ রাজনীতি। তাই সমস্যাগুলো কূটনীতিক যতটা সমাধানে সক্ষম হবেন; তার চেয়ে বেশি সক্ষম হবেন রাজনীতিবিদ। বাংলাদেশ হলো ভারতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশি। চার হাজার কিলোমিটারের বেশি অভিন্ন স্থল সীমান্ত রয়েছে দেশটির সঙ্গে। তাছাড়া, ভারতের সেভেন সিস্টার্স খ্যাত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যের এবং চিকেনস ন্যাক খ্যাত শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তায় অনেক বেশি উদ্বেগ রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমে ভারত সফর করলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি সাধিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তখন একটি স্পষ্ট বার্তা পেতো যে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। কিন্তু বেইজিংয়ে প্রথম সফর হওয়ার পর ভারত চাপে পড়েছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের গভীরতা এতটাই বাড়ছে যে, বাংলাদেশ চীন থেকে জে-১০সিই নামের যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বরাবরই অনেক জোরালো। বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর সিংহভাগ সমরাস্ত্র চীন থেকে কেনা হয়। চীন থেকে দু’টি সাবমেরিনও কিনেছে বাংলাদেশ।
সামরিক কেনাকাটার জন্য বাংলাদেশ এ বছর ২৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করবে বলে জানা গেছে। এবার বংলাদেশ জে-১০সিই নামের যুদ্ধবিমান ক্রয়ের জন্য চীনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরুর খবর পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রও বেশ উদ্বিগ্ন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে যুদ্ধবিমান কেনার জন্য দেশটি বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। বাংলাদেশ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সমরাস্ত্রের দাম অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্র এখন তার ন্যাটো মিত্রদের নিয়ে যৌথভাবে চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে বাংলাদেশ অস্ত্র কেনার উৎস বহুমুখী করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তার প্রেক্ষিতে তুরস্ক থেকে ড্রোন ক্রয় করে বাংলাদেশ। সম্প্রতি তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরকালে ঘোষণা করেন যে, বাংলাদেশে যৌথ উদ্যোগে সমরাস্ত্র তৈরীর কারখানা করতে চায় তুরস্ক। এসব বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনও আপত্তি নেই। কারণ তুরস্ক ন্যাটোভুক্ত দেশ। শুধু তুরস্ক নয়, যুক্তরাষ্ট্র এখন ন্যাটোভুক্ত সকল দেশকে বাংলাদেশে সমরাস্ত্র বিক্রির জন্য তাগিদ দিচ্ছে। বাংলাদেশের এই মূহুর্তে যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং মিসাইল প্রতিরক্ষা সিস্টেম ক্রয় করার জন্য চাহিদা রয়েছে। এছাড়াও, আর দ্’ু একটি ভিন্ন ধরনের অস্ত্র কিনবে বাংলাদেশ।
চীনের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা বাংলাদেশের জন্যে ইতিবাচক নাকি নেতিবাচক সেই বিষয়ে আলোচনা চলছে। কারণ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে গিয়ে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো সবাই নাখোশ। এখন চীনে এই সফর কী ‘জিরো সাম গেম’ কিনা সেই প্রশ্ন করা হচ্ছে। জিরো সাম গেম মানে হলো একদিকে খেলা যার ফলাফল শূন্য।
