রাজনীতিতে কিংমেকার মামদানি!
আজকাল রিপোর্ট
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০১:০৮ এএম, ২৭ জুন ২০২৬ শনিবার
নিউইয়র্কের রাজনীতিতে কিং মেকার হয়ে উঠছেন জোহরান মামদানি। ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে ইনকামব্যান্ট কংগ্রেসম্যান প্রার্থীদের পরাজিত করে নিজের পছন্দের প্রার্থীদের জয়ের মালা পড়িয়েছেন। পার্টির দীর্ঘদিনের চেনা সমীকরণ ও ক্ষমতা কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে এক নতুন ‘পাওয়ার ব্রোকার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবারের ২৩ জুন ডেমোক্র্যাটিক প্রাাইমারি নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরের প্রতিষ্ঠিত ধারাকে একরকম কোণঠাসা করে ফেলেছেন প্রগতিশীল ও সমাজতান্ত্রিক ঘরানার এই রাজনৈতিক নেতা।
মাত্র এক বছর আগে ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমোকে হারিয়ে নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত হয়ে রাজনৈতিক বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন মামদানি। আর এবার তার সরাসরি সমর্থনে ও নির্বাচনী প্রচারণায় তিনজন বামপন্থী কংগ্রেসে জায়গা করে নেওয়ার পথ নিশ্চিত করেছেন।
মঙ্গলবার রাতটা নিউইয়র্কের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছে। কংগ্রেস থেকে স্টেট অ্যাসেম্বলি, স্টেট সিনেট থেকে কম্পট্রোলার - প্রতিটি স্তরে একই গল্প। যেখানে মামদানির ছায়া পড়েছে, সেখানে পুরনো মুখগুলো হেরে গেছে। যেখানে পড়েনি, সেখানেও পরিবর্তনের হাওয়া বয়েছে।
নিউইয়র্কের ৭ম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে ক্লেয়ার ভালদেজ জয় পেয়েছেন ৫৬ শতাংশ ভোটে, ব্রুকলিন বরো প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও রেইনোসোকে হারিয়ে। রিটায়ারিং কংগ্রেসওম্যান নিদিয়া ভেলাজকেজ রেইনোসোকে উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। মামদানির পছন্দ ভালদেজ সেই সিদ্ধান্ত উল্টে দিয়েছেন। ক্লেয়ার ভালদেজকে সর্মথন দেন মামদানি।
১০ম ডিস্ট্রিক্টে ব্র্যাড ল্যান্ডার দুই মেয়াদের কংগ্রেসম্যান ড্যান গোল্ডম্যানকে পরাজিত করেছেন। দুজনই ইহুদি, কিন্তু গাজা নিয়ে অবস্থান ভিন্ন। ল্যান্ডার গাজাকে "গণহত্যা" বলেছেন, গোল্ডম্যান বলেননি। ভোটাররা ল্যান্ডারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। জয়ের মঞ্চে ল্যান্ডার ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি ওঈঊ বিলুপ্ত করবেন এবং ইসরাইলের যুদ্ধকে "জেনোসাইড" বলে স্বীকৃতি দেবেন। ব্র্যাড ল্যান্ডারকে এন্ডডোর্স করেন সিটির মেয়র।
১৩তম ডিস্ট্রিক্টে কমিউনিটি অর্গানাইজার দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার কংগ্রেশনাল হিস্পানিক ককাসের চেয়ার পাঁচ মেয়াদের কংগ্রেসম্যান আদ্রিয়ানো এসপায়ায়াতকে হারিয়েছেন - ফলাফল ছিল প্রায় সমান, উভয়ের ভোট ছিল ৪৫.৮৯ শতাংশের কাছাকাছি, চূড়ান্ত ব্যবধান ডাক ভোটে নির্ধারিত হবে। আভিলা শেভালিয়ার এর আগে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ সংগঠিত করেছিলেন। তাঁর পুরনো বিতর্কিত সামাজিক মাধ্যম পোস্ট নিয়ে আক্রমণ করেও এসপায়ায়াত আটকাতে পারেননি। শেভালিয়ার মেয়র মামদানির অনুসারী।
কেনেডি পরিবারের নাতি জ্যাক শ্লসবার্গ ১২তম ডিস্ট্রিক্টে স্বপ্নের পথে হোঁচট খেয়েছেন। রিটায়ারিং কংগ্রেসম্যান জেরি নাডলারের আসনে ভিড়ে ভরা প্রাইমারিতে কেনেডি পদবিও কাজ করেনি। জিতেছেন সরকারি কর্মকর্তা মাইকা ল্যাশার, যিনি নাডলার ও গভর্নর হকুলের সমর্থন পেয়েছিলেন।
নির্বাচনের রাতে ব্রুকলিনের উইলিয়ামসবার্গে বিজয়ী প্রার্থীদের ওয়াচ পার্টিতে উল্লাস প্রকাশ করে মেয়র জোহরান মামদানি বলেন, গত জুনের ঐতিহাসিক জয় কোনো আকস্মিক ঘটনা বা বিচ্ছিন্ন বিষয় ছিল না। সেটি কোনো সমাপ্তি ছিল না, বরং সেটি ছিল এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এই অভাবনীয় নির্বাচনী ফল ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে গভীর কম্পন তৈরি করেছে। বিশেষ করে ব্রুকলিনভিত্তিক হাউসের ডেমোক্রেটিক নেতা হাকিম জেফরির তার নিজের বলয়ের দুজন প্রভাবশালী সদস্যকে হারিয়েছেন এবং দলের ভেতর ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা একদল প্রগতিশীল আন্দোলনকারীর মুখোমুখি হয়েছেন। ফলে দশকের পর দশক ধরে যারা নিজেদের মূল ধারার শক্তিশালী পক্ষ ভাবতেন, তারা এখন মামদানির এই একচেটিয়া আধিপত্যে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।
তবে দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মামদানির সম্পর্কের এই টানাপোড়েন কোনো সহজ বিষয় নয়। প্রবীণ কংগ্রেস সদস্য আদ্রিয়ানো এসপাইলাত গত বছর কুমোর বিরুদ্ধে মামদানির জয়ের পর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, অথচ এবার মামদানি তার নিজের এক সাবেক নির্বাচনী স্বেচ্ছাসেবী দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়েরকে এসপাইলাতের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে জয়ী করে এনেছেন।
এই জয়ে ক্ষুব্ধ অনেক সিটি কাউন্সিল সদস্য এবং ডেমোক্রেটিক নেতা আড়ালে বলছেন, মামদানি কেবল নিজের শর্তেই জোটে বিশ্বাসী। এমনকি নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিটিয়া জেমস, যিনি নিজেও একসময় মামদানির বড় সমর্থক ছিলেন, তিনিও তীব্র হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, মামদানি নিউইয়র্কের বহু বছরের ঐতিহ্যবাহী শ্রেণী ও বর্ণের রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক ভিন্নতা বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি মন্তব্য করেন, ডেমোক্রেটিক পার্টির ওপর সবারই কিছুটা ক্ষোভ থাকতে পারে, তবে তার মানে এই নয় যে পুরো ব্যবস্থাটাকে এভাবে ভেঙে চুরমার করে দিতে হবে, যা সাধারণত ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুসারীরা করে থাকে।
রাজনীতির পাশাপাশি মামদানির পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক বিভিন্ন কড়া অবস্থান, বিশেষ করে ইসরাইল-বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি এবং অতি সম্প্রতি একটি প্রচারণায় মার্কিন-ইসরাইল লবিং গ্রুপ ‘আইপ্যাক’-কে ‘দানব’ হিসেবে অভিহিত করায় ইহুদি ভোটার ও নেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
কংগ্রেস সদস্য ড্যান গোল্ডম্যান অভিযোগ করেছেন, মেয়র মামদানি নিউইয়র্ক শহর পরিচালনার চেয়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বেশি আগ্রহী এবং তিনি ইহুদিদের জন্য একটি বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করছেন।তার বিপরীতে জিতেছেন মামদানীর সর্মথনে ব্রাড ল্যান্ডার। বিদায়ী কংগ্রেস সদস্য নিদিয়া ভেলাজকুয়েজও মামদানির রাজনৈতিক কৌশলকে একটি বড় ভুল আখ্যা দিয়ে বলেন, যে শহর ফেডারেল ও রাষ্ট্রীয় ফান্ডের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে সবার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে চলার পরিবর্তে মামদানি নিজের বলয় সংকুচিত করছেন।
