মঙ্গলবার   ১৬ জুন ২০২৬   আষাঢ় ১ ১৪৩৩   ৩০ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৭

যুদ্ধ বন্ধ হলে ট্রাম্পের ইরান চুক্তির আসল পরীক্ষা হবে

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০২:৩৫ এএম, ১৬ জুন ২০২৬ মঙ্গলবার

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ৮০তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে আয়োজিত মিক্সড মার্শাল আর্টস লড়াইয়ে একচ্ছত্র বিজয়ের প্রদর্শনী দেখা গিয়েছিল। হোয়াইট হাউসের সেই ঝোড়ো আবহাওয়ার মাঝেই ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা চূড়ান্ত হয়েছে।

সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প তাঁর স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক রাজনীতির সঙ্গে এই সমঝোতার যতই তুলনা টানুন না কেন, বাস্তবে তা খাটছে না। কারণ, মার্কিন পরাশক্তি এবং তার চেয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষ ইরানের মধ্যকার মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘ অচলাবস্থা মার্শালের চূড়ান্ত আঘাতের মতো এত সহজ বা স্পষ্ট নয়।

এই সমঝোতা অনুযায়ী আপাতত ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধ বন্ধ থাকবে। হরমুজ প্রণালিতে ইরান তাদের অবরোধ তুলে নেবে এবং মার্কিন নৌবাহিনীও অবরোধ প্রত্যাহার করবে। সুইজারল্যান্ডে একটি আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আগামী শুক্রবার থেকে এই চুক্তি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ফক্স নিউজকে জানিয়েছেন, এই চুক্তিতে একটি বড় নিশ্চয়তা রয়েছে– ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না।

এই খবর বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকটের অবসান ঘটাতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে এই যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দায় ইতোমধ্যেই পিষ্ট সাধারণ মানুষ। যে যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে কাঁপিয়ে দিয়েছে, ১৩ জন মার্কিন সেনার প্রাণ কেড়েছে, অসংখ্য ইরানি নাগরিকের মৃত্যু ঘটিয়েছে এবং লেবাননকে আবারও অন্যের যুদ্ধে বলি বানিয়েছে। সুতরাং, এগুলো বন্ধের যে কোনো উদ্যোগই স্বাগত জানানোর মতো।

কিন্তু চুক্তির বিস্তারিত তথ্যের অভাব এবং বর্তমান শর্তগুলো ট্রাম্পকে তিনটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আর এগুলো মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। প্রথমত, পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ে মূল সংকটের সমাধান না করেই শুধু হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া কি আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া নয়? দ্বিতীয়ত, বারাক ওবামা আমলের যে পারমাণবিক চুক্তি ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে বাতিল করেছিলেন, তিনি কি তার চেয়ে উন্নত কোনো চুক্তি করতে পেরেছেন? সর্বশেষ অধিকাংশ মার্কিনি যে যুদ্ধ চায়নি, সেই যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কি আদৌ কোনো যৌক্তিক ফল এনে দিতে পেরেছে? 

ভবিষ্যৎ ও অনিশ্চয়তা
দীর্ঘমেয়াদে বড় প্রশ্ন হলো– ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের এই নিয়ন্ত্রণকে ভবিষ্যতে কীভাবে ব্যবহার করবে। এ ছাড়া ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার পরও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোট দেশটির শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করতে পারেনি। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী এই শক্তির সঙ্গে ভবিষ্যতে আবারও যুদ্ধ বেধে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিশ্লেষক করিম সাজাদপুর সিএনএনকে বলেন, ‘এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি। এর মাধ্যমে আমরা আবারও একটি শীতল যুদ্ধের যুগে প্রবেশ করছি। তবে মূল সংকটের কোনো সমাধান হয়নি।’ 

অর্থনৈতিক স্বস্তি ও ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
যদি পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা তেলের ট্যাঙ্কারগুলো চলাচল শুরু করে, তবে জ্বালানির বাজারে স্বস্তি ফিরবে। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম কমলে তা ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে বড় সুবিধা এনে দেবে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে যখন রিপাবলিকানরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন, তখন এই চুক্তি ট্রাম্পের জন্য একটি বড় হাতিয়ার হতে পারে।

তবে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী নীতি ও অর্থনৈতিক দুরবস্থাকেই রাজনৈতিকভাবে সামনে আনছে। হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি অ্যাডাম স্মিথ সিএনএনকে বলেন, ‘যুদ্ধ বন্ধ হওয়া ইতিবাচক। কিন্তু এই যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্র কিছুই অর্জন করতে পারেনি। আমরা ঠিক আগের জায়গাতেই ফিরে এসেছি।’

ইতিহাস ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তা নির্ভর করছে আগামী সপ্তাহের আলোচনার ওপর। ইরান সত্যিই তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে কিনা– সেটাই হবে ট্রাম্পের এই চুক্তির আসল পরীক্ষা। আপাতত এই চুক্তি ট্রাম্পের যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ তৈরি করলেও, একে ‘একচ্ছত্র বিজয়’ বলার সময় এখনও আসেনি।