বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় ফ্যানদের ক্ষোভ
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০১:৪৮ এএম, ১১ জুন ২০২৬ বৃহস্পতিবার
ফুটবলকে বলা হয় বিশ্বজনীন খেলা, যা সব বর্ণ ও দেশের মানুষকে এক সুতোয় গাঁথে। তবে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ আমেরিকায় অনুষ্ঠিত হলেও, বিশ্বের অনেক দেশের ফ্যানরা ভিসা পেতে গিয়ে বিভিন্ন বাধার মুখোমুখি হচ্ছেন। ইরাকের ফুটবল ভক্ত আবদুল্লাহ আদনানের মতো হাজারো সমর্থক টিকিট কেনার সামর্থ্য বা আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা জটিলতার কারণে খেলা দেখতে যেতে পারছেন না।
তাই ক্ষুব্ধ সমর্থকদের স্পষ্ট কথা, ভিসা ও যাতায়াতের এই কঠিন নিয়মাবলি প্রমাণ করে যে, এই বিশ্বকাপ সবার জন্য নয়। এটি মূলত পশ্চিমা বিশ্ব এবং ধনী দেশগুলোর নাগরিকদের জন্যই আয়োজন করা হয়েছে।
একটি বড় বাধা হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দিষ্ট কিছু দেশের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং কঠোর ভিসা নীতি চাপানো। এর মধ্যে এবার বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া চারটি দেশও রয়েছে— হাইতি, ইরান, সেনেগাল এবং আইভরি কোস্ট। এর মানে হলো, এই দেশগুলোর নাগরিকদের এমন কোনো ভিজিটর ভিসা দেওয়া হচ্ছে না, যা মার্কিন কর্তৃপক্ষ ফুটবল সমর্থকদের জন্য নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিবিসি দেখেছে যে, বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়া ৪৮টি দেশের মধ্যে ১১টি দেশের নাগরিকদের মার্কিন ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যানের হার ৪০ শতাংশেরও বেশি। এর মধ্যে সব ধরনের আবেদনকারী অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, কেবল বিশ্বকাপ দেখতে যেতে চাওয়া ফুটবলপ্রেমীরাই নন। এর বিপরীতে, টুর্নামেন্ট দেখতে যাওয়া সমর্থকদের জন্য সুপারিশকৃত 'বিওয়ান বিজনেস' এবং 'বিটু ট্যুরিস্ট' ভিসার আবেদনের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী গড় প্রত্যাখ্যানের হার ছিল ৩৪ শতাংশ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ বছরের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিবিসি এই বিশ্লেষণ করেছে। ফলে গত আট মাসে যেসব ফুটবল সমর্থক আবেদন করেছেন, তারা এই হিসাবের মধ্যে নেই। ওই ১১টি দেশ হলো: ইকুয়েডর, মিসর, হাইতি, আলজেরিয়া, উজবেকিস্তান, কেপ ভার্দে, জর্ডান, ইরান, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (ডিআর কঙ্গো), ঘানা এবং সেনেগাল।
ভিসা প্রক্রিয়ার খরচও বেশ বেশি। যেসব ফুটবল সমর্থকের ভিসার প্রয়োজন, তাদের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে ভিসার পরামর্শ দেয় তার খরচ ১৮৫ ডলার (১৩৭ পাউন্ড) এবং আবেদনকারীদের অবশ্যই সশরীরে উপস্থিত হয়ে একটি ইন্টারভিউ বা সাক্ষাৎকার দিতে হয়। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর (স্টেট ডিপার্টমেন্ট) জানিয়েছে, আবেদনকারীদের অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে, "ভ্রমণ শেষে আপনার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করার স্পষ্ট ইচ্ছা রয়েছে এবং/অথবা ভ্রমণের সমস্ত খরচ বহন করার মতো আর্থিক সামর্থ্য আপনার আছে।"
অন্যতিকে, ৪২টি ধনী দেশ 'ভিসা ওয়েভার প্রোগ্রাম' (ভিসা ছাড় কর্মসূচি) এর সুবিধা পেয়ে থাকে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের 'ইলেকট্রনিক সিস্টেম ফর ট্রাভেল অথরাইজেশন'-এর মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন করা যায়। এর জন্য খরচ হয় মাত্র ৪০ ডলারের (৩০ পাউন্ড) মতো। তবে এই তালিকায় আফ্রিকার কোনো দেশ নেই। এই অসমতা ফ্যানদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়েছে।
ইরাকি ফ্যান আদনান এই সমস্যার একটি উদাহরণ। তিনি ভিসা পাননি কারণ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের পর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলার সেবা বন্ধ আছে। তিনি প্রতিবেশী জর্ডানে ভিসার জন্য গিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানে তাকে জানানো হয় যে তিনি জর্ডানি নাগরিক না হওয়ায় তার আবেদন প্রক্রিয়া করা যাবে না।
ভিসা ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার এই সংকট কেবল সাধারণ সমর্থকদের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া দলগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলছে। যেমন, রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে ইরান ফুটবল দলের মেক্সিকোতে পৌঁছানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক জটিলতা ও বিতর্ক। খেলার মাঠে রাজনীতির এই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশ ফুটবলপ্রেমীদের আরও বেশি হতাশ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অতিরিক্ত কড়াকড়ির নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশটির নিজস্ব অর্থনীতিতেই। সাধারণত বিশ্বকাপ চলাকালীন আয়োজক দেশগুলোর হোটেল, রেস্তোরাঁ ও পর্যটন খাতে উপচে পড়া ভিড় থাকে। তবে এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আন্তর্জাতিক সমর্থকদের একটি বড় অংশ আমেরিকা যাওয়া এড়িয়ে চলায় অনেক হোটেল ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বুকিং আশঙ্কাজনকভাবে কম। ফলে বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের শঙ্কায় পড়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
ভিসা প্রত্যাখ্যানের উচ্চ হারের কারণে এই দেশগুলোর সমর্থকদের জন্য এটি সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে যে— ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা ছাড়া, আদৌ তারা বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে ম্যাচের টিকিট কেনার ঝুঁকি নেবেন কি না। অবশ্য সমর্থকেরা যদি ফিফার কাছ থেকে সরাসরি টিকিট কেনেন, তবে প্রয়োজনবোধে তারা নির্দিষ্ট ফি দিয়ে ফিফার ওয়েবসাইটেই তা আবার পুনর্বিক্রয় করতে পারবেন। এছাড়া ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য তারা 'ফিফা পাস' সিস্টেমও ব্যবহার করতে পারেন।
তবে, ম্যাসাচুসেটসের বোস্টনের কাছে অবস্থিত একটি ইমিগ্রেশন ল ফার্মের প্রধান সেলিন আতাল্লাহ বলেন, "'ফিফা পাস' একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, ফিফা হয়তো একটি টিকিট বিক্রি করতে পারে, কিন্তু কাকে ভিসা দেওয়া হবে সেই সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন সরকার; আর কে শেষ পর্যন্ত দেশে প্রবেশ করতে পারবে তা নির্ধারণ করে কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন।"
