শনিবার   ৩০ মে ২০২৬   জ্যৈষ্ঠ ১৬ ১৪৩৩   ১৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৭

৩৫তম বর্ণাঢ্য বইমেলার সমাপ্তি

আজকাল রিপোর্ট

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ১১:৩১ এএম, ৩০ মে ২০২৬ শনিবার


 

‘৩৫তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা ২০২৬’ উৎসবমুখর, প্রাণবন্ত ও বর্ণাঢ্য পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। গত ২২ মে থেকে ২৫ মে পর্যন্ত নিউ ইয়র্কের জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে চার দিনব্যাপী এই প্রাণের মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়। এবারের মেলার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ‘যত বই তত প্রাণ।’ দুই দিনের টানা বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে প্রতিদিন মেলা প্রাঙ্গণে ছিল সর্বস্তরের মানুষের উপচে পড়া ভিড়। সমাপনী দিনে নিউ ইয়র্কের আকাশ মেঘমুক্ত হয়ে উজ্জ্বল রোদ ওঠায় দর্শনার্থীদের সমাগম ও বই বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
মেলার প্রথম দিনটি ছিল আবেগ এবং ঐতিহ্যের অপূর্ব মেলবন্ধন। বিকেল থেকেই নিউ ইয়র্ক ছাড়াও দূর-দূরান্তের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য নিউজার্সি, কানেকটিকাট, ম্যাসাচুসেটস, ভার্জিনিয়া, পেনসিলভানিয়া, মেরিল্যান্ড, ফ্লোরিডা থেকে বইপ্রেমী, লেখক, পাঠকরা পরিবার-পরিজন নিয়ে মেলা প্রাঙ্গণে জড়ো হতে থাকেন। ঐতিহ্যবাহী ঢোলের বাদ্য এবং ‘সংগীত সাধনা’র শিক্ষার্থীদের সমবেত সংগীতের মাধ্যমে প্রাক-উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয়। এই পর্বের পরিকল্পনা করেন বিশ্বজিত সাহা এবং সঞ্চালনায় ছিলেন মো. এহসান উদ্দিন। 
‘আগুনের পরশমণি’র আবহসংগীতের সাথে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করে বাংলা সাহিত্যের তিন মহান ব্যক্তিত্ব- মহাশ্বেতা দেবী, শামসুদ্দীন আবুল কালাম এবং তপন রায়চৌধুরী-এর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে তাঁদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করেন আবদুন নূর, জিয়াউদ্দিন আহমেদ ও নজরুল ইসলাম। মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলন। 
রোকেয়া রফিক বেবী পাঠ করেন কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর রচনার অংশবিশেষ এবং ও শহিদুল আলম সাচ্চু পাঠ করেন ইতিহাসবিদ তপন রায়চৌধুরীর 'বাঙালনামা' থেকে। পাপি মনা ও তাঁর দল শামসুদ্দীন আবুল কালাম স্মরণে সংগীত পরিবেশন করেন। 
চন্দ্রা ব্যানার্জির নির্দেশনা ও পরিকল্পনায় ‘নৃত্যাঞ্জলি’র শিল্পীরা নৃত্য পরিবেশন করেন। এরপর মহিতোষ তালুকদার তাপস ঘোষণার মাধ্যমে নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নিতে বইমেলায় যাব গো স্লোগানে সবাইকে নিয়ে বইমেলার প্রাঙ্গণ প্রদক্ষিণ করেন। 
মেলার ৩৫ বছর পূর্তিকে স্মরণীয় রাখতে মেলা প্রাঙ্গণে ৩৫ জন বিশিষ্ট উদ্বোধকের নাম সংবলিত একটি বর্ণিল বিলবোর্ড প্রদর্শন করা হয়। দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা লেখক, প্রকাশক ও গুণীজনসহ মোট ৩৫ জন সম্মানীয় অতিথি একসঙ্গে মেলার ‘মঙ্গল প্রদীপ’ প্রজ্জ্বলন করেন। এরপর আমন্ত্রিত অতিথি ও দর্শকবৃন্দ সমবেত কণ্ঠে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন।
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও চিন্তাবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, গত ৩৫ বছরে বাংলাদেশিরা আমেরিকায় একটি দৃশ্যমান জাতিগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে; আগামী ৩৫ বছরে বাংলাদেশিরা এদেশের সমাজ-সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠবে। ১৯৭১ সালের স্মৃতিচারণ করে তিনি আজকের প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাসচর্চার মধ্য দিয়ে জাতীয় ইতিহাসের বহু বিতর্কিত বিষয়ে ঐকমত্যের প্রয়াস চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চিন্তা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অধ্যাপক রেহমান সোবহানকে ‘মুক্তধারা সুকৃতজ্ঞ সম্মাননা’ ও আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়।
উদ্বোধনী মঞ্চের বিশেষ আলোচনা পর্বে অংশ নেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান। তিনি বর্তমান বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের একটি অংশের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন জানানোর প্রবণতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। রেহমান সোবহান ও রওনক জাহানের এই বিশেষ সংলাপ পর্বটি সঞ্চালনা করেন বইমেলার আহ্বায়ক ড. নজরুল ইসলাম।
মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও বিশ্বজিত সাহাকে দেওয়া বিশেষ সম্মাননা পর্ব। উত্তর আমেরিকায় বাঙালির এই প্রাণের উৎসব প্রচলনে তাঁর ঐতিহাসিক অবদানকে তুলে ধরে প্রথম দিনেই (২২ মে, শুক্রবার) একটি দীর্ঘ ও আবেগঘন তথ্যচিত্র বা প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এতে দেখানো হয়, কীভাবে ১৯৯২ সালে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে, অত্যন্ত সীমিত পরিসরে তিনি নিউ ইয়র্কে এই বইমেলার বীজ বপন করেছিলেন। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে তাঁর এই দীর্ঘ ও নিরলস পথচলাকে সম্মান জানিয়ে অনুষ্ঠানে তাঁকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয় এবং মেলা প্রাঙ্গণে উপস্থিত দেশ-বিদেশের লেখক ও অগণিত পাঠক দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানান।
স্বরচিত কবিতা পাঠ: উদ্বোধনী দিনে মূল মঞ্চে আমন্ত্রিত কবিদের স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর বসে। মো. নজরুল ইসলামের সঞ্চালনায় এতে কবিতা পাঠ করেন বব হোলম্যান, মোস্তফা সারওয়ার, সুবোধ সরকার, গৌতম দত্ত, শামস আল মমীন, কৌশিক সেন, জাফর আহমদ রাশেদ, দর্পণ কবীর, রুদ্র শংকর ও ফারুক আহমেদ।  দ্বিতীয় দিন সারাদিনের ঝড়-বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও দ্বিতীয় দিনে মেলা প্রাঙ্গণ ছিল সাহিত্যপ্রেমীদের পদচারণায় মুখরিত।
দুপুরে উন্মুক্ত লালন প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের প্রাণবন্ত আড্ডা ‘গদ্যের অন্দরমহল’। ফারুক ফয়সলের পরিচালনায় এতে অংশ নেন ইমদাদুল হক মিলন, ড. দীপেন ভট্টাচার্য, সাদাত হোসাইন, ফেরদৌস সাজেদীন, মোস্তফা সারওয়ার, বিরূপাক্ষ পাল, আশরাফ কায়সার ও রাজু আলাউদ্দিন। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইনের অটোগ্রাফ ও ছবি তোলার জন্য বৃষ্টির মধ্যেও বিভিন্ন স্টেট থেকে আসা পাঠকদের দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ার মতো ছিল।
স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন মোস্তফা সারওয়ার, রানু ফেরদৌস, ফিরোজ হুমায়ুন, জুলি রহমান, জান্নাতুল ফেরদৌস, হুমায়ূন কবীর ঢালী, মনিজা রহমান, সুরীত বড়ুয়া, ছন্দা বিনতে সুলতান, স্বপন বিশ্বাস, তাহমিনা খান, মোহাম্মদ মহিবুর রহমান, বিমল সরকার, শামছুন ফৌজিয়া, হুমায়ুন কবির, মাকসুদা আহমেদ, কুলসুম আক্তার সুমী, মো. শারফুল আলম, আরি আহমেদ অর্ণব, সোমা রোজারিও, এসরাত জাহান বর্ণা এবং এবিএম সালেহ উদ্দীন । 
লেখক ও কবিরা তাঁদের সদ্য প্রকাশিত বই নিয়ে আলোচনা ও মতবিনিময় করেন। এতে অংশ নেন বদরুজ্জামান রুহেল, বনানী সিনহা, মৈত্রেয়ী দেবী, গোপন দাশ, মো. শারফুল আলম, এ মোহিত, মোহাম্মদ মহিবুর রহমান, আহবাব চৌধুরী খোকন, মনিজা রহমান, মোহাম্মদ আজাদ ও আশরাফ আহমেদ। 
একাত্তরের গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধ সেমিনার: ‘একাত্তরের গণহত্যা, ইতিহাসের দালিলিক সংরক্ষণ এবং মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান’ শীর্ষক বিশেষ সেমিনারে আলোচনা করেন জিয়াউদ্দিন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন ও রাজিয়া নাজমী। সঞ্চালনা করেন ওবায়েদুল্লাহ মামুন। 
জনপ্রিয় লেখক ও গবেষকদের উপস্থিতিতে সমকালীন লেখালেখি ও সাহিত্য ভাবনা নিয়ে এই বিশেষ মতবিনিময় সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। পারমিতা হিমের প্রাণবন্ত ও রসাল সঞ্চালনায় এতে অতিথি লেখক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য ও মতবিনিময় করেন- সাদাত হোসাইন, দীপেন ভট্টাচার্য, কৌশিক সেন, আশরাফ কায়সার এবং রাজু আলাউদ্দিন।
আকর্ষণীয় বিতর্ক: মূল মঞ্চে "প্রবাস জীবন--বাঙালিকে দিয়েছে বাণিজ্যিকতা, কেড়ে নিয়েছে আন্তরিকতা" শীর্ষক এক চমৎকার বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। পক্ষে অংশ নেন কাবেরী মৈত্রেয়, শামীম রেজা ও মোহাম্মাদ নাকিবউদ্দীন (দলপতি) এবং বিপক্ষে অংশ নেন বাবু কামরুজ্জামান, নাজনীন আহমেদ ও বিরূপাক্ষ পাল (দলপতি) । সভাপতি ছিলেন রোকেয়া হায়দার । বিপক্ষ দলের দলপতি বিরূপাক্ষ পাল-এর ক্ষুরধার, বুদ্ধিদীপ্ত যুক্তি ও সমসাময়িক সাহিত্য-সংস্কৃতির বিশ্লেষণ দর্শকদের ভরপুর আনন্দ দেয়। 
তৃতীয় দিনটি সাজানো হয়েছিল শিশু-কিশোরদের সৃজনশীলতা এবং গুণীজনদের প্রাতিষ্ঠানিক পুরষ্কার প্রদানের মধ্য দিয়ে। সকাল থেকেই লালন প্রাঙ্গণে শিশু-কিশোর-যুবদের উপচে পড়া ভিড় ছিল। বাংলা ভাষা, একুশে ফেব্রুয়ারি, শহীদ মিনার এবং জাতীয় স্মৃতিসৌধকে কেন্দ্র করে আয়োজিত চিত্রাঙ্কন ও বাংলা লিখন প্রতিযোগিতায় বিপুল সংখ্যক নতুন প্রজন্মের শিশু অংশ নেয়। নিরুপমা সাহার পরিচালনায় এবং শাহানা বেগম, সুপ্রিয়া দে চৌধুরীসহ অন্যান্যদের সহযোগিতায় এই সফল আয়োজন সম্পন্ন হয়। 
কাজী নজরুল মঞ্চে এবিএম সালেহ উদ্দীনের সঞ্চালনা ও ব্যবস্থাপনায় কবিদের স্বরচিত কবিতা পাঠের আরেকটি বড় আসর বসে। এতে অংশ নেন শামস আল মমীন, হোসাইন কবির, বেনজির শিকদার, জেবুন্নেছা জোৎস্না, মুহাম্মদ আলী বাবুল, শারমিন রেজা ইভা, লায়লা ফারজানা, সৈয়দ মামুনুর রশীদ, দিমা নেফারতিতি, কামরুজ্জামান বাচ্চু, নাহিদ ফেরদৌস, রেজাউল করিম টিটুল, সীমু আফরোজা, আলম সিদ্দিকী, সুমন শামসুদ্দিন, শাহ আলম দুলাল, এইচ বি রিতা, বনানী সিনহা, মাসুম আহমদ, মিয়া এম আছকির, শ্যাম দাস বৈদ্য, রওনক আফরোজ, লতা চৌধুরী এবং কাজী এজাবুল খালিদ মিঠু।    
সোহানা নাজনীনের সঞ্চালনায় বেশ কয়েকজন লেখক তাঁদের নতুন বই নিয়ে পাঠকদের সাথে মতবিনিময় করেন। আলোচনায় অংশ নেন লায়লা ফারজানা, রেজাউল করিম টিটুল, রানু ফেরদৌস, মাহমুদ রেজা চৌধুরী, ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন, এসরাত জাহান বর্ণা, সাঈদ তারেক, রাজিয়া নাজমী ও বিমল সরকার সারথি। এছাড়া বন্যা মির্জার সঞ্চালনায় ‘বাংলা সাহিত্যে সমকালীনতা’ শীর্ষক বিশেষ আলোচনায় অংশ নেন ফরিদুর রেজা সাগর, ইমদাদুল হক মিলন, ফারুক মঈনউদ্দীন ও মেজবাহ উদ্দিন আহমদ। 
মুক্তধারা-জিএফবি সাহিত্য পুরস্কার: মেলার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আয়োজন ‘মুক্তধারা-জিএফবি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৬’ অর্জন করেন প্রখ্যাত ভাষাসৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা ও ঔপন্যাসিক ড. আবদুন নূর। পুরস্কারের প্রবর্তক ও ফাউন্ডেশনের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক গোলাম ফারুক ভূঁইয়া বিজয়ীর নাম ঘোষণা করেন। পুরস্কার হিসেবে ড. আবদুন নূরের হাতে নগদ ৩ হাজার মার্কিন ডলার, সম্মাননা ক্রেস্ট ও বিশেষ স্মারক তুলে দেওয়া হয়। প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “অনেক সময় নিজের মানুষের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়া কঠিন হয়। আজকের এই সম্মান আমাকে গভীরভাবে আপ্লুত করেছে।”
চিত্ত রঞ্জন সাহা শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা পুরস্কার: বাংলা প্রকাশনা শিল্পে অনন্য অবদানের জন্য এবছর শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা সংস্থা হিসেবে এই সম্মানজনক পুরস্কার লাভ করে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘বাতিঘর’।
‘মুক্তধারা স্মারক বক্তা ২০২৬’ হিসেবে একক বক্তৃতা প্রদান করেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। এছাড়া জীবনানন্দ দাশের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন ফারুক মঈনউদ্দীন।
সমাপনী দিনের সবচেয়ে আধুনিক ও আলোচিত পর্ব ছিল “সৃজনশীলতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)” শীর্ষক অনুষ্ঠান। রাব্বানী ভূঁইয়ার সঞ্চালনায় শতাধিক টিনএজার ও তরুণ এই সেশনে অংশ নিয়ে সাহিত্য, প্রযুক্তি, ভবিষ্যতের শিক্ষা এবং মানব সৃজনশীলতার ওপর এআই-এর প্রভাব নিয়ে চমৎকার মতবিনিময় করে। বক্তারা উল্লেখ করেন যে, প্রযুক্তি যত বৈপ্লবিকই হোক না কেন, মানবাধিকার বোধ ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক শিকড় ধরে রাখাই হবে আগামী প্রজন্মের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ । সেশনে অংশ নেয় দানিয়াল দর্পণ সামি, মীম দে শ্রাবণী, প্রজ্ঞাত্তম সাহা প্রজ্ঞা, ফারজিন কবীর কাব্য, অদ্রিতা দে ও ধীরাজ সাহা। 
মেলার শেষ দিনে (২৫ মে, সোমবার) ‘তপন রায় চৌধুরী মঞ্চে’ (মূল মঞ্চ) বিকেলের অন্যতম প্রধান ও আকর্ষণীয় আসর ছিল জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইনের মুখোমুখি অনুষ্ঠান। মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের সিইও বিশ্বজিত সাহা-এর প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় এই বিশেষ সাহিত্য আড্ডায় দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় ছিল। সাহিত্য, নতুন প্রজন্মের পাঠাভ্যাস, সামাজিক পরিবর্তন, লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং সৃজনশীলতার নানা দিক নিয়ে বিশ্বজিত সাহার ক্ষুরধার ও আকর্ষণীয় প্রশ্নের মুখোমুখি সংলাপে বসেন সাদাত হোসাইন। দর্শকদের সাথে তাঁদের এই সরাসরি প্রশ্নোত্তর ও মতবিনিময় পর্বটি ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত, যা বইমেলার সমাপনী দিনকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
দিনভর লালন প্রাঙ্গণ ও তপন রায়চৌধুরী মঞ্চে ছোটদের গল্প লেখার বিশেষ কর্মশালা পরিচালনা করেন অতিথি লেখক ও শিশুসাহিত্যিক আশিক মুস্তাফা। এছাড়া রং-তুলিতে শিশু-কিশোর-যুব উৎসব, উত্তরাধিকার দুই প্রজন্ম (পণ্ডিত রামকানাই দাসের গান), উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সংগীতানুষ্ঠান এবং অধ্যাপক ড. মোস্তফা সারওয়ারের ‘উচ্চশিক্ষার জন্য দিক-নির্দেশনা’ বিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। 
অনুষ্ঠানের শেষলগ্নে উপস্থিত সকলের সমবেত কণ্ঠে বাংলাদেশ ও আমেরিকার জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে ৩৫তম মেলার সফল সমাপ্তি ঘটে। মেলা কমিটির আহ্বায়ক ড. নজরুল ইসলাম, সহযোগী আহ্বায়ক ওবায়েদুল্লাহ মামুন, রাব্বানী ভূঁইয়া এবং চেয়ারপারসন ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ সংশ্লিষ্ট সকলকে, বিশেষ করে স্বেচ্ছাসেবকদের ও প্রবাসের সংবাদমাধ্যমকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহা আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “দেখতে দেখতে ৩৫ বছর পার হয়ে গেল। নিউ ইয়র্ক বইমেলা আজ শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়- এটি প্রবাসী বাঙালির এক যৌবনের অহংকার।”
সমাপনী মঞ্চ থেকে আগামী বছরের মেলার তারিখ ঘোষণা করা হয়। ২০২৭ সালের ৩৬তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে ২১ মে থেকে ২৪ মে পর্যন্ত।