মন্তব্য প্রতিবেদন
বইমেলার ঝাড়ুদার তিনি
মনোয়ারুল ইসলাম
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০৯:৩৮ এএম, ৩০ মে ২০২৬ শনিবার
নিউইয়র্ক বইমেলার আরও একজন ঝাড়ুদার কিংবা হুইপ দরকার। ৩৫টি বছর এই বইমেলার ব্যাপ্তি বেড়েছে। মেলার যাইরে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। মেলার অভিভাবক, ভ্যানগার্ড, প্রবর্তক কিংবা ঝাড়ুদার যে নামেই অভিহিত করা হোক কেন তিনি আর কেউ নন- বিশ্বজিৎ সাহা। সমালোচকরা তাকে ভিন্ন নামে ডাকলেও এই কমিউনিটিতে শত সমালোচনার বাধাবিপত্তির মধ্যে তিনি বইমেলা ও বৈশাখী উৎসবকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। দ্বিতীয় কোন বিশ্বজিৎ আর গড়ে উঠেনি। তার এই কীর্তি ধরে রাখতে আরও এক বা একাধিক সাহা গড়ে তুলতে হবে। যাতে তার অনুপস্থিতিতে এই ৩৫ বছরের অর্জন হারিয়ে না যায়। যদিও মুক্তধারা ফাউন্ডেশন, এনআরবি ওয়ার্ল্ড কিংবা ‘বাঙালী চেতনা’ মঞ্চের নামে তার আয়োজন চলে। কিন্তু আয়োজক, ঝাড়ুদার কিংবা হুইপের দায়িত্বে তাকেই থাকতে হয়। এ সব আয়োজনে ডা. জিয়াউদ্দীন আহমেদ, ড. নুরুন্নবী, সাংবাদিক রোকেয়া হায়দার, সাংবাদিক হাসান ফেরদৌস ও ড. নজরুল ইসলামসহ অনেক গুণীজন ব্যক্তিত্বকে এনে অলংকৃত করেন। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা বিশিষ্ঠ সাহিত্যিক ও গুণীজনদের উপস্থিতি বইমেলাকে আলোকিত করে। এবারও বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন ফরিদুর রেজা সাগর, ড. রেহমান সোবহান, ইমদাদুল হক মিলন ও সাহাদত হোসাইন। এ ধরনের মিলন মেলার আয়োজনে তার জুড়ি নেই। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের আয়োজন সহজ নয়। এই অসাধ্য কাজটি তার নেতত্বেই সাধিত হয়। লাখ লাখ টাকার এই আযোজনের ঘামঝড়ানো পরিশ্রমের জোঁয়াল তাকেই বহন করতে হয়। যদি এর আয় ব্যয়ের হিসেবের কোন জবাবদিহিতা তিনি কখনো জনসন্মুখে আনেননি। কমিউনিটিতে তা নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। প্রতিবছর যদি তা প্রকাশ করতেন তবে নিশ্চয়ই সাধুবাদ পেতেন।
একজন ঝাড়ুদারকে আভিধানিকভাবে এজেন্ট, সহকারী, স্টাইলিস্ট কিংবা গৃহপরিচারক হিসেবে দেখানো হয়। তারা ব্যক্তিগত বিপণন বিভাগ, আইনি দল এবং ব্র্যান্ড পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করে। (মেগান গারবার, দ্য আটলান্টিক)। নিউইয়র্ক বইমেলাকে একটি সাজানো বাগান বা বাড়ি বললে তার সবচেয়ে নিবেদিত কর্মি হলেন বিশ্বজিৎ সাহা। এমন একজন ব্যক্তি যিনি একটি নির্দিষ্ট রীতিতে ঘর-সংসার গুছিয়ে রাখেন। তাকে একজন হুইপ হিসেবেও আখ্যায়িত করা যায়। কোনো আইনসভা বা বিধানসভার এমন একজন সদস্য, যাকে একটি রাজনৈতিক দল কর্তৃক দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনগুলোতে দলীয় সদস্যদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নিয়োগ দেওয়া হয়। বইমেলায় এমন দায়িত্বও তিনি পালন করেন। এর নীতিমালা ও শৃংখলা প্রনয়ন থেকে শুরু করে সব দায়িতই¡ বিশ্বজিতের।
বইমেলার ৩৫ বছরের ইতিহাসে বিশ্বজিৎ সাহা বড় ধাক্ক খান বাংলাদেশে ৫ আগষ্ট ২০২৪ সরকার পরিবর্তনের পর। গত ৩০টি বছর তিনি আওয়ামী ঘরণার আর্শীবাদে বইমেলা, বৈশাখী উৎসব ও জাতিসংঘের সামনে একুশ উদযাপন করতেন। হাসিনা সরকারের আনুকূল্য পাবার জন্য বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে টেলিফিল্ম তৈরি, ঢাকায় গিয়ে তা প্রদর্শন, মন্ত্রী মহোদয় দিয়ে তা উদ্বোধন করেছেন। ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী’ শীর্ষক জনমত জরিপের উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি।আওয়ামী বুদ্ধিজীবি, কবি সাহিত্যক ও ব্যবসায়ীদের সাথে হরিহরি সখ্যতা ছিল তার। সাহিত্য সংস্কৃতির গন্ডি পেরিয়ে তিনি ব্যাংক বীমা নিয়ে সেমিনার ও সভায় আয়োজনে নেমে পড়তেন। ব্যাংকারদের অর্থায়নে মেরিয়ট ম্যারিকুউজ এর মতো ৫ তারা হোটেলে সম্মেলনের আয়োজন করেছেন। মন্ত্রীরা ছিলেন আয়োজনের অতিথি। সরকারের নেক নজরে আওয়ামী আমলে একুশে পদক প্রাপ্তির জন্য দৌঁড়ঝাপ করতেও পিছুপা হননি। হাসিনা সরকার থাকলে হয়তো কপালে একুশে পদক জুটেও যেত। ২০২৪ সালের পর অর্থনৈতিক আনুকুল্যেরও ধাক্কা পড়ে। দ্রুত রাজনৈতিক বলয় পরিবর্তন করেন। ৫ আগষ্টের সর্মথকদের সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। জয়বাংলা ও বঙ্গবন্ধু বন্দনা থেকে সরে আসেন। বিভিন্ন আয়োজনে ধর্মীয় টার্মকার্ড ব্যবহারেরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। রয়েছে আদম আমদানীর অভিযোগ। অবশ্য এসব অভিযোগ তিনি বারবার অস্বীকার করে আসছেন। ২০২৪ এর ৫ আগষ্টের আওয়ামী রাজনীতিক ও সাহিত্য প্রেমিকদের অভিযোগ সুবিধাভোগী বিশ্বজিৎ বটবাহিনীতে ভর করেছে। বইমেলা বটবাহিনীর দখলে চেলে গেছে। তারা ২০২৫ সালেই বঙ্গবন্ধু বইমেলার আয়োজন করেন। যার নেতৃত্ব দেন এক সময়ের শ্রী সাহার ঘনিষ্ঠ ড.নবী,তাজুল ইমাম, বেলাল বেগ ও ফকির ইলিয়াসরা। যদিও বাস্তবে বঙ্গবন্ধু বইমেলা ২০২৫ ও ২০২৬ সালে আওয়ামী ঘরণার কর্মিসভা বা মিলন মেলায় পরিণত হয়েছিল। ছিল হাতেগোনা কিছু সাহিত্য প্রেমিক। তাও আবার যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামীলীগের একাংশের সর্মথিত।
বইমেলার বিবেচনায় বিশ্বজিৎ সাহা একজন সফল সংগঠক। মেলার শুরুতে আঙ্গিনা গোছানো থেকে শুরু করে মেলার শেষদিনে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা তাকেই করতে হয়ে। প্রতিবছরই তার স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীরও যোগ-বিয়োগ ঘটে মতমতান্তরে। বিশ্বজিতের বইমেলাকে যেভাবেই দেখা হোক না কেন-তা সার্বজনীনতা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী সাহিত্যানুরাগী মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয় এই বইমেলায়। নিউইয়কের্র কবি সাহিত্যিকরা এই মেলার জন্য অপেক্ষা করেন। এ্টা শুধু বইমেলাই নয়। মুক্তচিন্তার মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। আমাদেরও প্রত্যাশা নিউইয়র্ক আর্ন্তজাতিক বইমেলা দীর্ঘায়ু হোক।
