কিউবাকে কি ভেনেজুয়েলা ভেবেছে ওয়াশিংটন?
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০৫:৫৯ পিএম, ২১ মে ২০২৬ বৃহস্পতিবার
গত ৩০ বছরে নিয়মিত কিউবা সফরের অভিজ্ঞতা থেকে এক ঘটনার কথা স্মরণ করেন ব্রিটিশ গবেষক ও পডকাস্টার হেলেন ইয়াফে। একবার ক্যাটাগরি-ফোর ঘূর্ণিঝড় কিউবার দিকে ধেয়ে আসছিল। তখন তিনি আরও ১৩ জনের সঙ্গে একটি বাড়িতে থাকতেন। ঝড় আঘাত হানার পরও সেখানে কোনো আতঙ্ক দেখা যায়নি, কারণ সবাই আগে থেকেই জানত, কার দায়িত্ব কী। কেউ বৃদ্ধ ও অসুস্থ প্রতিবেশীদের আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দিচ্ছিলেন, কেউ আবার ঝড় থেমে গেলে ধ্বংসাবশেষ সরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় কিউবার জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে প্রাণহানি কমানোর জন্য জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহুবার প্রশংসা করেছে। এখন হাভানা একই ধরনের কাঠামো ব্যবহার করতে চাইছে আরেকটি সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায়—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা।
বুধবার কিউবাকে ঘিরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক বক্তব্যের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
একই দিনে মার্কিন ফেডারেল প্রসিকিউটররা সাবেক কিউবান প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন, যা দুই দেশের সম্পর্কে সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে বড় উত্তেজনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অভিযোগটি ১৯৯৬ সালের এক ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে কিউবার যুদ্ধবিমান কিউবান নির্বাসিতদের পরিচালিত বিমান ভূপাতিত করলে চার মার্কিন নাগরিক নিহত হন বলে অভিযোগ রয়েছে। রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মার্কিন নাগরিক হত্যার ষড়যন্ত্র, চারটি হত্যা এবং দুটি বিমান ধ্বংসের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এই উত্তেজনার মধ্যেই শনিবার কিউবার সিভিল ডিফেন্স ‘সামরিক আগ্রাসন থেকে সুরক্ষার জন্য পারিবারিক নির্দেশিকা’ শিরোনামে একটি বিস্তারিত গাইড প্রকাশ করে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে পরিবারগুলোর দায়িত্ব ও নিরাপত্তা প্রটোকল তুলে ধরা হয়েছে।
গাইডটি কিউবার ‘ওয়ার অব অল পিপল’ বা ‘সবার যুদ্ধ’ প্রতিরক্ষা নীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর কিউবা এই কৌশল গ্রহণ করে।
এর মূল ধারণা হলো, বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে গোটা জনগণকে গেরিলা যুদ্ধ, স্থানীয় মিলিশিয়া এবং সিভিল ডিফেন্স নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রতিরোধে যুক্ত করা।
গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক এবং ‘কিউবা অ্যানালাইসিস’ পডকাস্টের উপস্থাপক হেলেন ইয়াফে আল জাজিরাকে বলেন, “কিউবার প্রায় সবাই সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা কাঠামোর অংশ।”
রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়ানোর ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখছেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিউবার উপকূলের কাছে মার্কিন নজরদারি ফ্লাইট বেড়েছে। এছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন কিউবাকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় হুমকি’ বলেও ঘোষণা করেছে। ট্রাম্প নিজেও বলেছেন, ‘কিউবাই পরবর্তী লক্ষ্য’।
হেলেন ইয়াফে বলেন, জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে অপহরণ করা হলে বিশ্ব হতবাক হয়েছিল। তবে সেই অভিযানে নিহতদের মধ্যে ৩২ জন ছিলেন কিউবান সেনা, যারা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল সোমবার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ‘রক্তস্নান’ হবে।
ইয়াফের ভাষায়, ‘কিউবার নেতারা এবং সাধারণ মানুষ বলছেন, ওরা যদি ৩২ কিউবানের প্রতিরোধকে ভয়ংকর মনে করে থাকে, তাহলে এখানে এলে ১ কোটি মানুষ প্রতিরোধ করবে।’
স্পেনের এলকানো রয়্যাল ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক কার্লোস মালামুদও মনে করেন, কিউবা ভেনেজুয়েলার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চ্যালেঞ্জ। তার মতে, কিউবার সেনাবাহিনী ভেনেজুয়েলার চেয়ে বেশি প্রশিক্ষিত ও সংগঠিত।
তবে ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কিউবান স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের পরিচালক সেবাস্তিয়ান আরকোস ভিন্নমত পোষণ করেন। তার দাবি, “কিউবার সামরিক বাহিনী অনেক পুরোনো ও দুর্বল। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধের সুযোগ খুব কম।”
বিশ্লেষকদের মতে, কিউবার সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি তার ভৌগোলিক অবস্থান। মালামুদ বলেন, কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের এত কাছাকাছি যে, হামলা হলে কিউবার পাল্টা আঘাত মার্কিন শহর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তার ভাষায়, “মিয়ামির মতো শহরে বেসামরিক হতাহতের আশঙ্কা অনেক বেশি।”
রোববার মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এক প্রতিবেদনে দাবি করে, কিউবা ৩০০ সামরিক ড্রোন সংগ্রহ করেছে এবং গুয়ান্তানামো বে, মার্কিন নৌযান ও কি ওয়েস্টে হামলার পরিকল্পনা করছে।
তবে ইয়াফে ও মালামুদ এই গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, কিউবা সামরিক সংঘাত চায় না।
অন্যদিকে আরকোস বলেন, এই প্রতিবেদন ‘অবিশ্বাস্য নয়’, কারণ কিউবার সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
কিউবা অবশ্য প্রতিবেদনটিকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের হামলার অজুহাত তৈরির চেষ্টা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কিউবায় হামলা ভেনেজুয়েলার তুলনায় রাজনৈতিকভাবেও অনেক বেশি জটিল হবে।
হেলেন ইয়াফে বলেন, “হামলা হলে তাৎক্ষণিকভাবে কিউবা থেকে বিপুল অভিবাসী ঢল শুরু হবে। সমুদ্রপথে লাখো মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার চেষ্টা করবে।”
অভিবাসনবিরোধী অবস্থানকে কেন্দ্র করেই ট্রাম্পের রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে উঠেছে। ফলে এই পরিস্থিতি তার জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে কিউবান-আমেরিকানদের রাজনৈতিক প্রভাবও অনেক বেশি।
কার্লোস মালামুদ বলেন, ভেনেজুয়েলানদের তুলনায় কিউবান নির্বাসিতদের মার্কিন কংগ্রেস ও প্রশাসনে বহু দশকের শক্ত অবস্থান রয়েছে। বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবান বংশোদ্ভূত।
এই গোষ্ঠী কাস্ত্রো-পরবর্তী ব্যবস্থার বাইরে প্রকৃত শাসন পরিবর্তন ছাড়া কিছু মেনে নেবে না বলে মনে করেন তিনি। হেলেন ইয়াফের মতে, কিউবা ইস্যুতে ট্রাম্প ও মার্কো রুবিওর মধ্যেও মতপার্থক্য থাকতে পারে।
রুবিও কিউবার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও ট্রাম্প বেশি ‘চুক্তিভিত্তিক’ দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ এবং দীর্ঘদিন ধরেই কিউবায় ব্যবসায়িক আগ্রহ রয়েছে তার। এছাড়া ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, ইরান যুদ্ধের বিষয়টি শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিউবায় মনোযোগ দেওয়া সম্ভব নয়।
ইয়াফের মতে, রাউল কাস্ত্রোকে অপহরণ করা হলেও তা কিউবান সরকারকে নতি স্বীকারে বাধ্য করবে না। তিনি বলেন, ‘কিউবায় বিপ্লবী সম্মান শহীদত্বের সঙ্গে জড়িত’। কিউবার রাষ্ট্রীয় স্লোগান ‘পাত্রিয়া ও মুয়ের্তে, ভেন্সেরেমোস’। অর্থাৎ ‘স্বদেশ না মৃত্যু, আমরা জয়ী হব’।
উরুগুয়ের ওআরটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মাতিয়াস ব্রুম বলেন, কিউবার পরিস্থিতি পুরো লাতিন আমেরিকার জন্য সতর্কবার্তা।
তার ভাষায়, “আগে ভাবতাম যুক্তরাষ্ট্র কখনো হামলা করবে না। কিন্তু তারা ভেনেজুয়েলায় মাদুরোকে অপহরণ করেছে। এখন ট্রাম্পকে আমি গুরুত্ব দিয়েই দেখি।”
তিনি বলেন, কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর মতো বামঘেঁষা সরকারগুলোও উদ্বেগ নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
বুধবার মার্কো রুবিও কিউবার জন্য ১০ কোটি ডলারের খাদ্য ও ওষুধ সহায়তার প্রস্তাব দেন। তবে তিনি কিউবার অর্থনৈতিক সংকটের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অবরোধকে দায়ী না করে হাভানার নেতৃত্বকেই দায়ী করেন।
আরকোসও একই সুরে বলেন, কিউবার সংকট শুরু হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর এবং সরকারের অনমনীয় অবস্থানই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মূল কারণ।
তবে মালামুদ মনে করেন, মানবিক সংকট গভীর হলেও যুক্তরাষ্ট্রকে নিরুৎসাহিত করার মতো কিছু সক্ষমতা এখনো কিউবার আছে। তিনি বলেন, ‘কিউবার পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটপূর্ণ এবং প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ের’। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার কয়েক দশকের বৈরিতা নতুন মোড়ে পৌঁছেছে।
হাভানায় এখন একটি স্লোগানই সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে বলে জানান হেলেন ইয়াফে: ‘আকি নো সে রিন্দে নাদিয়ে’। অর্থাৎ, ‘এখানে কেউ আত্মসমর্পণ করে না’।
