পূরণ হলো না লিমন বৃষ্টির স্বপ্ন
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০৭:২৯ এএম, ২৬ এপ্রিল ২০২৬ রোববার
উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি। কিন্তু সেই স্বপ্নই শেষ হয়ে গেল এক রহস্যঘেরা হত্যাকাণ্ডে। ফ্লোরিডায় রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গেলেও, অকালেই নিভে গেল তাদের জীবন। নিখোঁজের ১০ দিন পর সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তারকৃত হিশাম আবুঘরবেহ ভিকটিম জামিলের রুমমেট বলে জানিয়েছে পুলিশ। তার তথ্যেই মিলে জামিলের লাশ। এরপর হিশামের বাসা থেকেই নাহিদা বৃষ্টির মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের মাধ্যমে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বৃষ্টির পরিবার। শনিবার বৃষ্টির ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে মৃত্যুর বিষয়টি জানান। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ তাকে ফোন করে মৃত্যুর খবর জানায়। তারা জানায়, একটি বাসার ভেতরে রক্তের মধ্যে পাওয়া মরদেহের অংশের ডিএনএ পরীক্ষায় নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে। তবে তার পূর্ণাঙ্গ মরদেহ পাওয়া যাবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
লিমনের পিএইচডি গবেষণা এবং বৃষ্টির রাসায়নিক প্রকৌশলের উজ্জ্বল ক্যারিয়ার কেন এমন নৃশংসতায় থেমে গেল, তার নেপথ্যে হিশামের ব্যক্তিগত আক্রোশ না কি অন্য কোনো মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে ওয়াশিংটন ডিসি বাংলাদেশ দূতাবাস আর মায়ামির কনস্যুলেট জেনারেল থেকে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
গত ১৬ই এপ্রিল থেকে (বৃহস্পতিবার) নিখোঁজ ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি। বৃহস্পতিবার রাতে নিখোঁজ জাহিদ লিমনের ছোট ভাই জুবায়ের আহমেদ জানিয়েছিলেন, দেশ থেকেই লিমন এবং বৃষ্টির জানাশোনা ছিল-বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। কিন্তু কী কারণে তারা নিখোঁজ সেই তথ্য জানা ছিল না। নিখোঁজ হওয়ার পর তাদের সন্ধান পেতে মাঠে নামে ফ্লোরিডার ৪টি কাউন্টির পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থা। বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল, মায়ামি থেকেও রাখা হয় যোগাযোগ। প্রায় দশদিন পর স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্দেহভাজন হিসেবে হিশামকে গ্রেপ্তার করে স্থানীয় পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তাদের দেয়া তথ্যমতে, জামিল লিমনের খণ্ডিত মরদেহ সেতুর নিচ থেকে উদ্ধার এবং নাহিদা বৃষ্টির মৃত্যুর চূড়ান্ত নিশ্চিত হওয়ার পর এখন হিশামকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
হিশামকে গ্রেপ্তার করার প্রক্রিয়াটি ছিল বেশ নাটকীয় ও উত্তেজনাকর। টাম্পার উত্তরে হিশামের নিজের বাড়িতে পারিবারিক সহিংসতার খবর পেয়ে পুলিশ উপস্থিত হলে তিনি নিজেকে ঘরের ভেতর অস্ত্রসহ অবরুদ্ধ করে ফেলেন। পরিস্থিতি এতটাই জটিল আকার ধারণ করে যে, শেষ পর্যন্ত পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট ‘সোয়াট’ টিম তলব করতে হয়। দীর্ঘ সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পর একপর্যায়ে সোয়াট টিমের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় এই ঘাতক।
মূলত তার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাকে বাড়ি থেকে বের করে আনতে পুলিশকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। হিলসবোরো কাউন্টি আদালত ও শেরিফ অফিসের রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হিশাম আবুঘরবেহ ইউএসএফেরই প্রাক্তন শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে পড়াশোনা করলেও গ্রেপ্তারের সময় তার ছাত্রত্ব ছিল না। আদালতের নথি বলছে, ২০২৩ সালের মে ও সেপ্টেম্বর মাসেও তার বিরুদ্ধে শারীরিক আঘাত এবং চুরির মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছিল। গ্রেপ্তারের পর হিশামের বিরুদ্ধে বর্তমানে একাধিক গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মৃত্যুর সংবাদ গোপন করা, অবৈধভাবে মৃতদেহ সরানো, আলামত নষ্ট করা এবং পরিকল্পিতভাবে শারীরিক আঘাত ও সহিংসতা। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির আকাশ চৌধুরী রাশু জানান, দুইজন শিক্ষার্থী এমন নির্মম পরিণতিতে তারা শোকাহত। সহপাঠী এবং স্থানীয়দের সঙ্গে লিমন-বৃষ্টির ভালো সম্পর্ক ছিল। গত একুশে ফেব্রুয়ারিতেও কমিউনিটির বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি এমন হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল, মায়ামির কনসাল জেনারেল সেহেলী সাবরীন জানান, নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থীর ব্যাপারে তারা শুরু থেকেই নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন। শুক্রবার সন্দেহভাজন হিসেবে হিশামকে গ্রেপ্তারের পরই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। দু’জন শিক্ষার্থী এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডে পুরো কমিউনিটি শোকাহত। জামিল লিমন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং নাহিদা বৃষ্টি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। লিমন ২০২৪ সালে এবং বৃষ্টি ২০২৫ সালে পিএইচডি করতে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় পাড়ি জমান।
গ্রামের বাড়িতে শোকের মাতম: ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি’র শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনের নিহত হওয়ার খবরে তার গ্রামের বাড়ি জামালপুরের মাদারগঞ্জে মাতম চলছে। ১০ দিন নিখোঁজ থাকার পর তার মরদেহ পাওয়ার খবরে স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির আঙিনা। নিহত জামিল আহমেদ মাদারগঞ্জের কড়ইচড়া ইউনিয়নের মহিষবাথান এলাকার জহুরুল হকের ছেলে। কর্মসূত্রে জহুরুল হক দীর্ঘদিন ধরেই গাজীপুরের মাওনা এলাকায় বসবাস করতেন। সেখানেই জামিলের বেড়ে ওঠা ও পড়ালেখা। একই এলাকায় তিনি স্ত্রী লুৎফন নেছাকে নিয়ে স্থায়ীভাবে সংসার গড়ে তোলেন। যদিও পরিবারের সদস্যরা মাঝেমধ্যে গ্রামের বাড়ি মহিষবাথানে আসতেন। জহুরুল হক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। দুই ছেলের মধ্যে জামিল ছিলেন বড়। ছোট ছেলে জোবায়ের হোসেন। পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে জামিলকে ঘিরে সবার অনেক স্বপ্ন ও প্রত্যাশা ছিল। তার মৃত্যুর খবরে স্তব্ধ পুরো মহিষবাথান গ্রাম। বাড়ির আঙিনায় জড়ো হন স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনরা। লিমনের চাচা জিয়াউল হক জানান, ‘জহুরুল হক আমার ছোট ভাই। সে দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুরের মাওনা এলাকায় বসবাস করে। আমার দুই ভাতিজা ঢাকায় লেখাপড়া করতো। জামিল বাংলাদেশে লেখাপড়া শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিল। তার মৃত্যুতে আমরা বাকরুদ্ধ।
ওদিকে নিহত শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির গ্রামের বাড়িতে বইছে মাতম। তার মৃত্যু কোনোভাবেই মানতে পারছে না পরিবার। বৃষ্টির গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুর এলাকায়। তার বাবার নাম জহির উদ্দিন আকন দুই যুগের বেশি সময় ধরে রাজধানী ঢাকার মিরপুর ১১ নম্বরে পরিবার নিয়ে থাকেন। তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে কর্মরত। তিনি বলেন, মেয়ের সঙ্গে আমাদের রোজই কথা হতো। গত বৃহস্পতিবার আমার সর্বশেষ কথা হয়। তখন বৃষ্টি ওর ক্যাম্পাসের ল্যাবের ডেস্কে ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করছিল। এর পর থেকে বৃষ্টির ফোন বন্ধ। পরে বাংলাদেশি অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও বৃষ্টির কোনো সন্ধান পাইনি। যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ আমাদের বৃষ্টির মৃত্যুর সংবাদ জানিয়েছে।
বৃষ্টির পরিবার সূত্র জানায়, ঢাকার মিরপুরের নাহার একাডেমি হাইস্কুল থেকে ২০১৪ সালে এসএসসি পাস করেন নাহিদা সুলতানা। পরে শহীদ বীরউত্তম লেফটেন্যান্ট আনোয়ার গার্লস কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হন। স্নাতকোত্তর শেষ করার আগেই ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ফুল স্কলারশিপে পিএইচডি করার সুযোগ পান। ২০২৫ সালের ১২ই আগস্ট ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন নাহিদা।
