বুধবার   ০৪ মার্চ ২০২৬   ফাল্গুন ১৯ ১৪৩২   ১৫ রমজান ১৪৪৭

যুদ্ধজাহাজ থেকে স্টিলথ বোমারু, ইরানে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘হাই-ট

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০১:২১ এএম, ৪ মার্চ ২০২৬ বুধবার

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিরোধ অনেক দিনের। তাতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে গত শনিবার। ওই দিন ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ইরানের ভূখণ্ডে দেশ দুটির যৌথ বিমান হামলা সামরিক শত্রুতা নতুন করে উসকে দিয়েছে। ইরানও উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। তবে ইরানে যৌথ হামলার আগে মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ গড়ে তোলে ওয়াশিংটন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই সতর্ক করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’। 

এ বিষয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, পেন্টাগনের ভাষায় ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’তে এখন পর্যন্ত যেসব অস্ত্র ও প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার হয়েছে, সেগুলো আধুনিক মার্কিন সামরিক শক্তির প্রায় পূর্ণাঙ্গ প্রদর্শন।

‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ কী

২৮ ফেব্রুয়ারি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ৮ মিনিটের একটি ভিডিও পোস্ট করেন ট্রাম্প। ভিডিওতে তিনি ঘোষণা দেন, ইরানের ভূখণ্ডে একটি ‘বড় যুদ্ধাভিযান’ শুরু করেছে মার্কিন বাহিনী।

 

পরে পেন্টাগন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ পোস্ট দিয়ে জানায়, ইরানে চলমান সামরিক অভিযানের নাম রাখা হয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’।

ট্রাম্পের দাবি, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করাই এ সামরিক অভিযানের মূল উদ্দেশ্য।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে যাচ্ছি। তাদের ক্ষেপণাস্ত্রশিল্প মাটিতে মিশিয়ে দেব। এটি সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হবে।’

শনিবার এ অভিযান শুরুর পর থেকে ইরানের ১ হাজার ২৫০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। পৃথক বিবৃতিতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, তারা হামলা চালিয়ে ১১টি ইরানি জাহাজ ধ্বংস করেছে।

এ অভিযানে বিমান হামলা চালানো হচ্ছে। সাগর থেকে ছোড়া হচ্ছে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। সমন্বিত হামলা চালানো হচ্ছে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে। পাশাপাশি ইরানের প্রতিরক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের ওপরও হামলা হচ্ছে।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় শনিবার যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার প্রথম ধাপে তেহরানে নিজ কার্যালয় কম্পাউন্ডে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তিনি ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বে ছিলেন।

ব্যবহার করা হচ্ছে যেসব ‘হাই-টেক সমরাস্ত্র’

ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত অপারেশন এপিক ফিউরিতে যেসব অস্ত্রব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলো হলো—

বি-২ স্টিলথ বোমারু
বি-২ স্টিলথ বোমারু যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী বোমারু প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি। চার ইঞ্জিনচালিত এই ‘ব্যাট-উইং’ উড়োজাহাজ আন্তঃমহাদেশীয় দূরত্বে উড়তে পারে এবং আকাশেই জ্বালানি নিতে সক্ষম।

সেন্টকম জানিয়েছে, এবারের অভিযানে বি-২ বোমারুগুলো ২ হাজার পাউন্ডের বোমা ব্যবহার করে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় আঘাত হেনেছে।

 

 

 

লুকাস ড্রোন
লুকাস ড্রোন প্রথমবারের মতো যুদ্ধে ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের শাহেদ ড্রোনের নকশা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই ড্রোন তৈরি করা হয়। কম খরচের এই ড্রোন দ্রুত আঘাত হানতে সক্ষম। সেন্টকম বলছে, ‘এটি স্বল্প খরচে কার্যকর প্রতিশোধ নিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। 

বিমানবাহী রণতরি ও ডেস্ট্রয়ার
বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এবং ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন মোতায়েন করা হয়েছে। আরলেই বার্ক-শ্রেণির ডেস্ট্রয়ার থেকে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ভিডিও প্রকাশ করেছে সেন্টকম। এসব জাহাজে এজিস ব্যালিস্টিক মিসাইল ডিফেন্স ব্যবস্থা রয়েছে, যা বহরের সুরক্ষায় ব্যবহৃত হয়। এছাড়া সমুদ্রপথে টহল-নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে পি-৮ পসেইডন টহল উড়োজাহাজ। যুদ্ধের কাজে ব্যবহারের পণ্য ও রসদ পরিবহনে কাজে লাগানো হচ্ছে সি-১৭ গ্লোবমাস্টার, সি-১৮০ হারকিউলিসসহ বিভিন্ন মডেলের উড়োজাহাজ।

 

 

 

ফাইটার জেট ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ
এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছে বি-১, বি-২ স্টিলথ (ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় এ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে হামলা চলছে), সর্বাধুনিক এফ-৩৫, এফ-১৫, এফ-১৬, এফ-১৮, এফ-২২, ‍এ-১০, ফ্যালকন ইত্যাদি।

এ ছাড়া ইএ-১৮জি গ্রোলার ইলেকট্রনিক আক্রমণ উড়োজাহাজ শত্রুর রাডার ও যোগাযোগব্যবস্থা জ্যাম করতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

 

 

 

ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা
প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র সুরক্ষাব্যবস্থা, থাড ক্ষেপণাস্ত্র সুরক্ষব্যবস্থা। এগুলো ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংস করা হচ্ছে। এ ছাড়া ইরানি ড্রোন ধ্বংসে কাউন্টার ড্রোনব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে।

আকাশ সতর্কতা ও নজরদারি
মার্কিন বাহিনী ব্যবহার করছে ই-৩ সেন্ট্রি ও ই-২ হাওয়াকি আকাশ সতর্কতা উড়োজাহাজ। এগুলো শত্রু বিমান ও জাহাজ শনাক্ত করে রিয়েল-টাইম তথ্য সরবরাহ করে।
এ ছাড়া পি-৮ পসেইডন, আরসি-১৩৫ নজরদারি বিমান ও এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনও অভিযানে যুক্ত।

 

 

 

সামুদ্রিক নজরদারি
পি-৮এ পোসেইডন সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধ ও গোয়েন্দা নজরদারিতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

গোয়েন্দা নজরদারি বিমান
আরসি-১৩৫ রিভেট জয়েন্ট তাৎক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে কাজ করছে।

জ্বালানি ও সরবরাহ সহায়তা
দীর্ঘ দূরত্বের অভিযানে কেসি-১৩৫ ও কেসি-৪৬ ট্যাংকার উড়োজাহাজ আকাশে জ্বালানি সরবরাহ করছে। সমুদ্রে সরবরাহ জাহাজ চলমান অবস্থাতেই যুদ্ধজাহাজে জ্বালানি দিচ্ছে। সি-১৭ ও সি-১৩০ কার্গো বিমান সৈন্য ও গোলাবারুদ পরিবহন করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সমন্বিত শক্তি প্রদর্শন শুধু ইরানের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সামরিক লক্ষ্য পূরণের জন্য নয়, বরং আঞ্চলিক প্রতিরোধক্ষমতা প্রদর্শনের অংশও। তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ব্যয়, অস্ত্রভান্ডার ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা- সবই বড় প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। সূত্র: সিএনএন ও আল-জাজিরা