শনিবার   ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   মাঘ ২৪ ১৪৩২   ১৯ শা'বান ১৪৪৭

মন্তব্য প্রতিবেদন

রহস্যময়তায় বাংলাদেশি ভোটাররা!

মনোয়ারুল ইসলাম

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০১:০৮ এএম, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শনিবার



 

#    এই হারটা আমি একাই হেরেছি : মেরি
 
মেরি একটি বিদ্রোহের নাম। স্রোতের বিপরীতে চলা এক রাজনীতিক। মডারেট মুসলিম ঘরের সন্তান ও স্ত্রী হয়ে গনতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিকে বেছে নিয়েছেন। খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ইমিগ্র্যান্ট কমিউনিটির জন্য লড়ছেন ২ যুগেরও বেশি সময় ধরে। কর্মজীবি মানুষের সন্তানদের জন্য ইউনিভার্সাল চাইল্ড কেয়ারের দাবিতে সোচ্চার কন্ঠস্বর। নীতি ও নৈতিকতার প্রশ্নে পরিবার, সমাজ, কমিউনিটি এমনকি মূলধারার রাজনীতিতে আপোষ করেন নি। নিজের হাতে গড়া লং আইল্যান্ড সিটিতে নির্বাচনী বলয় তৈরি করার পরও পরিবারের কল্যাণে সিটি ত্যাগ করে বাফেলোর নায়াগ্রাতে গোড়াপত্তন গেড়েছিলেন। আবার সবকিছু গুছিয়ে ফিরে এসেছেন নিউইয়র্ক সিটিতে। এ যেন ‘ওয়ান স্টেপ ফরোয়ার্ড, ২ স্টেপ ব্যাকওয়ার্ড’ পলিসির প্রতিফলন। এবার মেরি জোবায়দাকে আমরা পেয়েছিলাম অনেক শক্তিশালী হয়ে। মামদানির মেয়র নির্বাচনে তাকে পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় দৌড়াতে দেখেছি। একজন ইমিগ্রান্ট, তরুণ, মুসলিম ও পরিবর্তন প্রত্যাশী মেয়র পদপ্রার্থী মামদানির জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। করেছেন ডোর টু ডোর ক্যাম্পেইন। আমেরিকান বাংলাদেশিরা মামদানির জন্য একট্রা। মেরির মতো হাজারো কর্মিদের পরিশ্রমে মামদানি ইতিহাস গড়ে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচিত হলেন। 
এবার মেরি জোবায়দাদের প্রত্যাশার পালা। নিউইয়র্ক স্টেট এসেমব্লি ডিস্ট্রিক্ট ৩৬ আসনটি ছেড়ে দেন মামদানি। এই শূন্য আসনটির বিশেষ নির্বাচনে তিনি প্রার্থীতা ঘোষণা করেন। আরও ২ জন নির্বাচনে প্রার্থী হন। এই ৩ জনই ডেমোক্র্যাটিক সোশালিস্ট পার্টির সদস্য। বাংলাদেশি কমিউনিটির ধারণা ছিল মেয়র এই নির্বাচনে মেরিকে এনডোর্স করবেন। মামদানি সে পথে হাঁটলেন না। দলের নীতিনির্ধারকদের সুপারিশে তিনি এনডোর্স করলেন ইকুয়েডরের বংশোদভূত ডিয়ানা মরেনোকে।  পুরো ডেমোক্র্যাটিক পার্টি সাপোর্ট করলো তাকে। মেয়র বাংলাদেশি মেরিকে টেলিফোন করে তার সীমাবদ্ধতার কথা জানালেন। বললেন, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারলেন না। ডিয়ানাকেই সর্মথন দিতে হলো। মেরি এই সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য নন। রিভোল্ট করলেন। পিপল ফার্স্ট পার্টি লাইনে এসেমব্লিওম্যান পদে প্রার্থী হলেন। বাংলাদেশি কমিউনিটি পাশে দাঁড়ালেন। প্রার্থী হতে হলে ১৫ শত ভোটারের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। মেরি বোর্ড অব ইলেকশনে ৩ হাজার স্বাক্ষর জমা দিলেন। সাবাশ! মেরির ক্যাম্পেইন টিমের তথ্যানুসারে এই নির্বাচনী এলাকায় ৫ হাজার বাংলাদেশি ভোটার রয়েছেন। এই ভোট ব্যাংক ভিত্তি করেই মেরির এগিয়ে যাওয়া। এস্টোরিয়ার বিভিন্ন  হাউজিং প্রোজেক্টগুলো ছিল মেরির আশা ভরসার ঠিকানা। সেখানে মেরি কাজ করেছেন ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে। গ্রাসরুট ওয়ার্ক ছিল তার শক্তি। হাউজিংগুলোর বাসিন্দাদের অতি পরিচিত মেরি। ভরসার যায়গাটি ছিল মেরির। অথচ সেখানে পেলেন মাত্র ৩০০ ভোট (৬৫১ ভোটের মধ্যে)। কোথায় গেল ৫ হাজার বাংলাদেশি ভোট। কেন মেরি তাদের টানতে পারলেন না।  কোথায় হারিয়ে গেল ৩ হাজার সেগনেটরি। হাউজিং প্রোজেক্টের ভোট বাদই দিলাম।  নির্বাচনে গ্রাসরুটের কথা মেরি নিজেও বারবার বলেছেন। ফান্ডিং/ডোনেশনে মেরি ছিল এগিয়ে। ডোনেশনে তার অর্জন ছিল ৭৫ হাজার ডলারের বেশি। ম্যাচিং ফান্ডে তার পরিমান দাঁড়াবে বহুগুনে। এটা সম্ভব হয়েছে কমিউনিটির ভালোবাসায়।  বিজয়ী ডিয়ানার ফান্ড ছিল মাত্র ৭০ হাজার ডলার। আরেক প্রার্থী রানা আব্দেল এর অর্থও ছিল মেরির চেয়ে কম। এই মেরি ২০২০ সালে এসেম্বব্লি ডিস্ট্রিক্ট ৩৭ (সীমানা পুর্নবিন্যাসের পর বর্তমানে ডিস্ট্রিক্ট ৩৬) এ নির্বাচন করেন। তখন তার পাশে এবারের মতো বাংলাদেশি কমিউনটি ইনভলভ ছিল না। অনেকেই জানতেন না তিনি নির্বাচন করছেন। একেবারেই নতুন। সেবার মেরি ভোট পান ৫ হাজার ৪৩। মাত্র ১৫১১ ভোটে হেরে যান। ভ্যাটার্ন ডেমোক্র্যাট ক্যাথিরিন নোলান ৬,৫৫৪ ভোট পেয়েছিলেন। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই ছিল। মেরি দ্বিতীয় স্থান দখল করেন। ডানিয়েল ব্রেকার ২১০৬ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছিলেন। এই ৬ বছরে অনেক পানি গড়িয়েছে। মেরি রাজনীতির যবনিকা টেনে পরিবার ও সন্তানদের কথা বিবেচনা করে বসতি গড়েন নায়েগ্রা সিটিতে। হাতে গড়া নির্বাচনী এলাকায় তার নেতিবাচক প্রভাবও পড়ে। ৬ বছর পড়ে এসে নির্বাচনের গড় মেরি হারিয়ে ফেলেন। যে ব্ল্যাক কমিউনিটি ২০২০ সালে মেরির জন্য ঝাপিয়ে পড়েছিল, এবার তারা দৃশ্যমান হননি। তার সর্মথক গোষ্ঠী কেন হারিয়ে গেল তা ভাববার বিষয়।
তবুও এবার নির্বাচনে মেরির পক্ষে জোয়ার দেখা যায়। তবে তা ছিল বাংলাদেশি কমিউনিটি কেন্দ্রিক। অন্যান্য কমিউিনিটির সম্পৃক্ততা অবশ্য চোখে পড়েনি। সোশাল মিডিয়ায় এগিয়ে ছিলেন মেরি। ৩ ফেব্রুয়ারির বিশেষ নির্বাচনের ফলাফলে ভূমিধ্বস বিজয় হলো ডিয়ানা মেরিনোর। প্রাপ্ত ভোট ৬ হাজার ২০৯। দ্বিতীয় হলেন রানা আব্দেল। পেলেন ১ হাজার ৪৩৫। মেরি পেলেন ৬৫১ ভোট। ‘থমকে গেল রাজ্য (স্টেট) জয়ের সমর্থকদের প্রত্যাশা’। রাত ৯টার পর ইলেকশন বোর্ডের ওয়েবসাইডে ফলাফল প্রকাশের পর বাংলাদেশিরা কিছুটা বিস্মিত। হতবাক। সমালোচনা আলোচনায় ঝড় বাংলাদেশি কমিউনিটিতে। প্রশ্ন উঠলো কোথায় গেলো বাংলাদেশি কমিউনিটির ৫ হাজার ভোট। ‘বাংলাদেশি আন্টিরা কোথায় ছিলেন?’ কোথায় হারিয়ে গেল হাউজিং প্রোজেক্টে মেরির এককচ্ছত্র আধিপাত্য। সমালোচনারও ঝড় বইছে। সোশাল মিডিয়ায় এ হারকে শক্তিতে রুপান্তর করে মেরিকে এগিয়ে যাবার আহবান জানিয়েছেন অনেকে। অবশ্য এ নির্বাচনী ফলাফল শুধুমাত্র বাংলাদেশি ভোটারদের উপর নির্ভর করে প্রার্থী হবার খায়েশ অনেকের জন্য আগাম বার্তা হিসেবে কাজ করবে।
মেরির এই পরাজয়ে হতাশ হবার কেছু নেই। কমিউনিটির একজন প্রার্থী হিসে্েব আমরা কি নিজ দায়িত্বটা পালন করেছি। মেরি কি পুরোপুরি প্রস্তুত ছিলেন। গ্রাউন্ড কি তার পক্ষে ছিল? নিজ দলীয় এনডোর্সমেন্ট কেন মেরি পেলেন না। দলের বাইরে যাবার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল?  নির্বাচনী ক্যাম্পেইন টিম কি ব্যর্থ। এই ব্যর্থতাকে হিসেবে নিয়ে মেরিদের আগামীতে এগিয়ে যেতে হবে। সুদিন আসবেই। 
মেরি জোবায়দা এই পরাজয়ের দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। একজন বিজিত প্রার্থী হিসেবে তার মতামত তুলে ধরেছেন। ভুল শুধরিয়ে সামনে এগিয়ে যাবার পথ আপনার জন্য উন্মুক্ত। আপনার বিবৃতি থেকে এগিয়ে যাবার প্রেরণা উচ্চারিত হচ্ছে। সোশাল মিডিয়ায় মেরি লিখেছেন,‘আপনাদের কাছে একটাই অনুরোধ। ধরে নিন যে এই হারটা আমি একাই হেরেছি। এটাকে আমাদের সবার জন্য চিরন্তন ধরে নিবেন না দয়া করে। এটা তো সত্যি যে, আমি এই মাঠে একটা সরিষা দানা মাত্র। আমার ব্যর্থতা দিয়ে আপনারা আমাদের পুরো কমিউনিটিকে মাপবেন না। আমার মতো মানুষরা না রাজনীতি করে না নির্বাচন। আমার পরাজয় হোক ভবিষ্যতের অনেক জয় যাত্রার কারন।’