বৃহস্পতিবার   ০৮ জানুয়ারি ২০২৬   পৌষ ২৫ ১৪৩২   ১৯ রজব ১৪৪৭

ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ন্ত্রণ ট্রাম্পের জন্য কেন কঠিন

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০১:১৫ এএম, ৬ জানুয়ারি ২০২৬ মঙ্গলবার

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার তেলের মজুদ থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার পরস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে ‘চালিয়ে’ রাখবে। ট্রাম্প চান যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করুক। কারণ ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেলের মজুদ রয়েছে। তিনি দেশটির অব্যবহৃত সম্পদ সংগ্রহ করে অর্থ উপার্জন করতে চান।

 

ট্রাম্প আরও বলেছেন, মার্কিন কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার ভেঙে পড়া তেল অবকাঠামো মেরামত করবে ও অর্থ উপার্জন শুরু করবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পের পরিকল্পনার বাস্তবায়নে বিশাল চ্যালেঞ্জ দেখছেন। তারা ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, তেল উৎপাদন লাভজনক করতে হলে ভেনেজুয়েলায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ হবে এবং এক দশক পর্যন্ত সময় লাগবে।

 

এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই ভেনেজুয়েলার তেলের মজুদের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে, কিংবা ট্রাম্পের পরিকল্পনা কাজ করবে কিনা?

 

ভেনেজুয়েলা বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেল মজুদের আবাসস্থল। মজুদ তেলের পরিমাণ আনুমানিক ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল। কিন্তু বর্তমানে দেশটি যে পরিমাণ তেল উৎপাদন করে তুলনামূলকভাবে তা খুবই কম।

 

২০০০ সালের গোড়ার দিকে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন তীব্রভাবে কমে যায়। কারণ সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ এবং তারপর মাদুরোর প্রশাসন রাষ্ট্র পরিচালিত তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর ওপর আরও কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। ফলে অভিজ্ঞ বিদেশি কর্মীরা ভেনেজুয়েলা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

 

যদিও মার্কিন কোম্পানি শেভরনসহ কিছু পশ্চিমা তেল কোম্পানি এখনও ভেনেজুয়েলায় সক্রিয় রয়েছে। তবে তাদের কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞাগুলো আরও বিস্তৃত করেছে এবং তেল রপ্তানিকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

 

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসন ২০১৫ সালে প্রথম ভেনেজুয়েলার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তখন থেকেই দেশটি বিনিয়োগ ও তেল উত্তোলনের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা হারায়। ইনভেস্টেকের পণ্য প্রধান ক্যালাম ম্যাকফারসন বলেন, ভেনেজুয়েলার আসল চ্যালেঞ্জ হল তাদের অবকাঠামো।

 

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সর্বশেষ তেল বাজার প্রতিবেদন অনুসারে, গত নভেম্বরে ভেনেজুয়েলা প্রতিদিন আনুমানিক ৮ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন করেছিল। এটি ১০ বছর আগের তুলনায় মাত্র এক তৃতীয়াংশ এবং বিশ্ব তেল ব্যবহারের এক শতাংশেরও কম। দেশটিতে মজুত থাকা তেল ভারী ও টক। এই তেল পরিশোধন করা কঠিন। তবে এ থেকে ডিজেল ও অ্যাসফল্ট (সড়ক তৈরির পিচ) উৎপাদন হয় প্রচুর।

 

ডেটা প্ল্যাটফর্ম কেপলারের সিনিয়র পণ্য বিশ্লেষক হোমায়ুন ফালাকশাহি বলেন, তেল সংস্থাগুলোর জন্য ভেনেজুয়েলার তেল উত্তোলনে মূল বাধা আইনি ও রাজনৈতিক। তিনি বিবিসিকে বলেন, ভেনেজুয়েলায় তেলকূপ খনন করতে আগ্রহীদের সরকারের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে। যার জন্য স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ দরকার হবে।

 

বিশ্লেষকরা সতর্ক করেন, ভেনেজুয়েলার আগের উৎপাদন পুনরুদ্ধার করতে কয়েক বিলিয়ন ডলার এবং সম্ভবত এক দশক সময় লাগবে। ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের গ্রুপ প্রধান অর্থনীতিবিদ নীল শিয়ারিং মনে করেন, ট্রাম্পের পরিকল্পনা বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের ওপর সীমিত প্রভাব ফেলবে। কারণ ভেনেজুয়েলায় সফলতা পেতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক সময় দরকার হবে। তাছাড়া এখন বিশ্বে তেলের ঘাটতি নেই।

 

শেভরনই একমাত্র মার্কিন তেল উৎপাদন কোম্পানি, যারা ভেনেজুয়েলায় এখনও সক্রিয়। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ২০২২ সালে জো বাইডেনের সময় তারা লাইসেন্স পায়।

 

ফিনান্সিয়াল টাইমস জানায়, ট্রাম্পের ঘোষণার পর শেভরনের সাবেক প্রধান নির্বাহী জায়ান্ট আলী মোশিরি ভেনেজুয়েলার তেল প্রকল্পের জন্য ২ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করার লক্ষ্য নিয়েছেন। তিনি জানান, গত দুদিনে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে এক ডজন ফোন এসেছে। তারা ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগে ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছেন।

 

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প তেল নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে যত সহজেই কথা বলছেন, বাস্তবায়ন আরও কঠিন। অবকাঠামো মেরামত ও বিনিয়োগের ব্যাপারটি অত্যন্ত জটিল। মার্কিন উচ্চাকাঙ্খা বাস্তবায়ন করতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে। মার্কিন ভূরাজনীতি বিশ্লেষক পিটার ম্যাকনালি মনে করেন, ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পের ব্যাপারে এখনও অনেক কিছু অজানা রয়েছে। এই শিল্প ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে হবে।

 

মার্কিন তেল কোম্পানি শেভরনের একজন মুখপাত্র বলেন, আমরা সমস্ত প্রাসঙ্গিক আইন ও বিধি মেনে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। আরেকটি মার্কিন তেল জায়ান্ট কনোকোফিলিপস বলেছে, তারা ভেনেজুয়েলার উন্নয়ন এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ও স্থিতিশীলতার ওপর নজর রাখছি। ভবিষ্যতের কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম বা বিনিয়োগ নিয়ে অনুমান করে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে এক্সনমোবিল, শেল, বিপি, টোটালএনার্জি এবং সৌদি আরামকোসহ অন্যান্য তেল কোম্পানিগুলো তাদের অবস্থান এখনও স্পষ্ট করেনি।

 

ভেনেজুয়েলার তেল পরিস্থিতি কেমন

এনার্জি ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ভেনেজুয়েলা বিশ্বব্যাপী তেলের মজুদের প্রায় ১৭ শতাংশ ধারণ করে, যা ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেলের সমপরিমাণ। ১৯৭০-এর দশকে দেশটি প্রতিদিন ৩.৫ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত উৎপাদন করতো। গত বছর এই সংখ্যা গড়ে মাত্র ১.১ মিলিয়নে নেমে আসে, যা বিশ্বব্যাপী উৎপাদনের মাত্র ১ শতাংশ। এক সময় যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেলের প্রধান ক্রেতা ছিল। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর থেকে দেশটি থেকে তেলের প্রধান ক্রেতা হয়ে ওঠে চীন।

 

ব্যাপক দুর্নীতি ও তহবিলের অভাবে ভেনেজুয়েলা সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো মজুদ কাজে লাগাতে সক্ষম হয়নি। তবে কিছু পশ্চিমা তেল কোম্পানি ভেনেজুয়েলায় সক্রিয় থাকলেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা পদক্ষেপ নিতে বাধা পাচ্ছে।

 

সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, স্কাই নিউজ