কোন পথে ভেনেজুয়েলা?
নিউ ইয়র্কে বিচারের মুখোমুখি মাদুরো
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০১:৩৬ এএম, ৫ জানুয়ারি ২০২৬ সোমবার
ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র ফেরানো নাকি সেখানকার তেলসম্পদ টার্গেট করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। সার্বভৌম ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে বছরের শুরুতেই বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছেন তিনি। তার সেনারা দেশটিতে হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে নিউ ইয়র্কের জেলে পুরেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন ভেনেজুয়েলায় গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত দেশটি পরিচালনা করবে যুক্তরাষ্ট্র। সেখানকার তেলসম্পদে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এখানেই থেমে থাকেননি। কার্যত কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে হুমকি দিয়েছেন। তার উদ্দেশ্যে বলেছেন, তাকে ‘নিজের খবর রাখতে হবে।’ সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে ট্রাম্প বলেন, তিনি কোকেন তৈরি করছেন এবং তা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাচ্ছেন। পাশাপাশি কিউবা ও মেক্সিকোকে বার বার সতর্ক করছেন ট্রাম্প। তার এসব কর্মকাণ্ডে, বিশেষত ভেনেজুয়েলায় হামলার পর বিশ্ব জুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ট্রাম্পের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি তার প্রেসিডেন্টের কড়া সমালোচনা কর
দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও ফার্স্টলেডি সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করার পর যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে নেয়া হয়েছে। মাদুরোকে আটক করার পর ট্রাম্প তার ছবি প্রকাশ করেছেন। তাতে মাদুরোকে হ্যান্ডকাফ পরা এবং চোখবাঁধা অবস্থায় দেখা যায়। এ রিপোর্ট লেখার সময় মাদুরোকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল। অভিযোগ গঠন করে জেলে পাঠানো হয়েছে তাকে। দেশটির ভেতর যুক্তরাষ্ট্রের এ অভিযান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। ভেনেজুয়েলায় হামলাকে ‘নির্লজ্জ সাম্রাজ্যবাদ’ বলে অভিহিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বামধারার স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। তিনি বলেন, ট্রাম্পের এই হামলা যুক্তরাষ্ট্র বা বিশ্বকে আর নিরাপদ করবে না। এক্সে দেয়া পোস্টে স্যান্ডার্স বলেন, এই হামলা উল্টো ফল দেবে। আন্তর্জাতিক আইনের এই নির্লজ্জ লঙ্ঘন পৃথিবীর যেকোনো দেশকে অন্য কোনো দেশ আক্রমণ করার, সম্পদ দখল করার বা সরকার পরিবর্তন করার সুযোগ এনে দেবে। অন্যদিকে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে মুক্তি দেয়ার দাবি করেছে চীন। কলম্বিয়ার আহ্বানে সোমবার নিরাপত্তা পরিষদে জরুরি বৈঠক সমর্থন করেছে রাশিয়া ও চীন।
আটক করার পর মাদুরো ও তার স্ত্রীকে নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের স্টুয়ার্ট এয়ার ন্যাশনাল গার্ড বেসে নামানো হয়। সেখান থেকে হেলিকপ্টারে করে তাদেরকে ম্যানহাটানের ডিইএ কার্যালয়ে নেয়া হয়। পরে ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, যতদিন না একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও ন্যায়সঙ্গত ক্ষমতা হস্তান্তর করা সম্ভব হয়, ততদিন ভেনেজুয়েলাকে পরিচালনা করবে যুক্তরাষ্ট্র। ওদিকে মাদুরোকে তুলে নেয়ার পর ভেনেজুয়েলার রাস্তাঘাট ফাঁকা। অস্থির এক সময় পার করছে দেশটি। টম বেটম্যান নামে একজন লিখেছেন, ট্রাম্প বরং দেশটির তেলসম্পদ লুটের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নিচ্ছেন। দেশটির সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রড্রিগেজ। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া ভাষণে তিনি মাদুরোকেই দেশের একমাত্র বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মাদুরোর বিরুদ্ধে নিউ ইয়র্কে মাদক ও অস্ত্র সংক্রান্ত অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তিনি আগে থেকেই নিজেকে কোনো মাদকচক্রের নেতা হিসেবে জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। ভেনেজুয়েলা জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের এ অভিযানকে ‘অত্যন্ত গুরুতর
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের একজন মুখপাত্র বলেন, তিনি ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং বিষয়টি এ অঞ্চলের জন্য উদ্বেগজনক প্রভাব ফেলতে পারে। বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, এই ঘটনাপ্রবাহ একটি বিপজ্জনক নজির সৃষ্টি করেছে।’ এ ছাড়া উল্লেখ করা হয়, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের পূর্ণাঙ্গ সম্মান নিশ্চিত করা সবার জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহাসচিব উদ্বিগ্ন যে, আন্তর্জাতিক আইনের নিয়মসমূহকে এক্ষেত্রে সম্মান জানানো হয়নি। তিনি আরও আহ্বান জানান, ভেনেজুয়েলার উচিত মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি সম্মান রেখে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপে অংশ নেয়া। কলম্বিয়ার আহ্বানে রাশিয়া ও চীন সমর্থন জানিয়েছে। তাদের আহ্বানে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক হবে সোমবার।
ভেনেজুয়েলার পর কলম্বিয়া, কিউবা, মেক্সিকোর দিকে দৃষ্টি যুক্তরাষ্ট্রের
ভেনেজুয়েলায় ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজলভ’ নামে সামরিক অভিযানে নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের পর দৃশ্যত যুক্তরাষ্ট্রের চোখ এখন কলম্বিয়া, কিউবা ও মেক্সিকোর দিকে। অনেকেই বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী টার্গেট হতে পারে এই দু’টি দেশ। এরই মধ্যে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে কিউবা। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প মেক্সিকো প্রসঙ্গে বলেছেন, তাদের সঙ্গে অবশ্যই কিছু একটা করতে হবে। এ খবর দিয়ে অনলাইন এনডিটিভি বলছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে সতর্ক করেছেন। তিনি পেত্রোকে উদ্দেশ্য করে বলেন- তাকে ‘নিজের খবর রাখতে হবে।’ সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে ট্রাম্প বলেন, তিনি কোকেন তৈরি করছেন এবং তা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাচ্ছেন। সুতরাং তাকে নিজের খবর রাখতে হবে।
মাদুরোর নাম উল্লেখ না করেই পেত্রো ওয়াশিংটনের অভিযানকে লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের ওপর হামলা হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন যে, এর ফলে মানবিক সংকট তৈরি হবে। ট্রাম্প ক্যারিবিয়ানে কথিত মাদক চালানবাহী জাহাজের বিরুদ্ধে সামরিক মোতায়েনের নির্দেশ দেয়ার পর থেকেই পেত্রো এসব পদক্ষেপের সমালোচক। মাদকবিরোধী কৌশলের অংশ হিসেবে ট্রাম্প সম্প্রতি ইঙ্গিত দেন যে, কলম্বিয়ার মাদক উৎপাদন ল্যাবেও হামলা চালানো হতে পারে। একে পেত্রো ‘আক্রমণের হুমকি’ বলে নিন্দা করেন।
কারাকাস থেকে মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে সরিয়ে নেয়ার কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে দেশটি পরিচালনা করবে। তিনি বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও বিচক্ষণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা না যায়, ততক্ষণ আমরা দেশটি পরিচালনা করবো। তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র আরও বড় ধরনের দ্বিতীয় আক্রমণ চালানোর জন্য প্রস্তুত।
লাতিন আমেরিকা নিয়ে ওয়াশিংটনের বৃহত্তর পরিকল্পনা প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, পশ্চিম গোলার্ধে আবার কখনো আমেরিকার আধিপত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে না। তার ভাষায়, আমরা নিজেদের চারপাশে ভালো প্রতিবেশী চাই, স্থিতিশীলতা চাই, শক্তির উৎস চাই। ওই দেশে আমাদের বিরাট ‘এনার্জি’ রয়েছে এবং সেটাকে আমাদের রক্ষা করতে হবে। আমাদের নিজেদের জন্যই তা প্রয়োজন।
ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের প্রতি আস্থা প্রকাশ করে ট্রাম্প বলেন যে, দেশটিকে আবার মহান করতে যা দরকার তিনি তা করতে আগ্রহী। তবে বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোর দেশীয় সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, তার (মাচাদো) জন্য নেতা হওয়া খুব কঠিন হবে। দেশে তার ভেতরে সেই সমর্থন বা সম্মান নেই। তিনি খুব ভদ্র একজন নারী, কিন্তু তার সে সম্মান নেই।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র তাদের বড় তেল কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলায় পাঠাবে। ভেঙেপড়া তেল অবকাঠামো মেরামতে বিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে এবং দেশের জন্য আয় সৃষ্টি করবে। তার ভাষায়, আমাদের বিশাল মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো সেখানে যাবে, বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে, ভেঙেচুরে যাওয়া তেল বিষয়ক অবকাঠামো ঠিক করবে এবং দেশটির জন্য অর্থ উপার্জন শুরু করবে। ভেনেজুয়েলার সব তেলের ওপর আরোপিত অবরোধ বহাল আছে। আমেরিকান নৌবহর প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক বিকল্প খোলা রয়েছে যতক্ষণ না আমাদের সব দাবি পুরোপুরি মেনে নেয়া হয়।
মেক্সিকো ও কিউবার উদ্দেশ্যে বার্তা
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইঙ্গিত দেন যে, ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে কিউবা। তিনি বলেন, আমি যদি হাভানায় সরকারে থাকতাম, তাহলে অন্তত কিছুটা হলেও চিন্তিত হতাম।
লাতিন আমেরিকায় দীর্ঘ সামরিক হস্তক্ষেপের ইতিহাস রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। এর মধ্যে ১৯৬১ সালের কিউবান নির্বাসিতদের নেতৃত্বাধীন ব্যর্থ ‘বে অব পিগস’ অভিযান, যা ফিডেল কাস্ত্রোকে ক্ষমতাচ্যুত করার উদ্দেশ্যে চালানো হয়েছিল। মেক্সিকো প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, দেশটির সঙ্গে কিছু একটা করতেই হবে। তিনি দাবি করেন, তার (প্রেসিডেন্ট শেইনবাউমের) সঙ্গে আমাদের খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। তিনি একজন ভালো নারী। কিন্তু মেক্সিকো চালাচ্ছে মাদক কার্টেলগুলো।
ট্রাম্প বলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউমকে বহুবার জিজ্ঞেস করেছেন ‘আপনি কি চান আমরা ওই কার্টেলগুলোকে গুঁড়িয়ে দিই?’ কিন্তু তিনি নাকি সবসময়ই ‘না’ বলেছেন।
