ভারতের নির্বাচনে বড় আতঙ্ক ভোটিং মেশিন
নিউজ ডেস্ক
আমাদের নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশিত : ০৬:১৩ পিএম, ২৬ জানুয়ারি ২০১৯ শনিবার
বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের নির্বাচনী উৎসবে এবার সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ভোটিং মেশিন’। রাজনীতিকদের ভাগ্যনির্ধারণী এ যন্ত্রটি শেষ পর্যন্ত কি নিরপেক্ষ থাকবে? নাকি কারও পক্ষে ব্যবহার করা হবে? ভোটাররা যে প্রতীকে বাটন টিপবেন, ভোট কি সেখানেই পড়বে না অন্য কোথাও।
নির্বাচন যতই দোরগোড়ায় আসছে, ভেতরের ভয়টা যেন ততই বাইরে বেরিয়ে আসছে। ভোটার থেকে শুরু করে বিরোধী দলীয় রাজনীতিক, সবার মাঝেই একই আতঙ্ক- ভোটিং মেশিন। ভারতীয় খবরপাড়া পেরিয়ে এ খবর পৌঁছে গেছে বিশ্ব গণমাধ্যমেও। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ের ইভিএম বিতর্ক নিয়ে পরপর দুটি হত্যাকাণ্ডের পর আতঙ্ক আরও পেয়ে বসেছে ভারতবাসীকে।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার বিশেষজ্ঞ সৈয়দ সুজা দাবি করেন, ‘২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে গোপন প্রযুক্তির মাধ্যমে ইভিএম ‘হ্যাক’ করে ভোটের ফলাফল বদলে দিয়েছিল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি)। এ গোপন ঘটনা জেনে যাওয়াতেই খুন করা হয়েছিল বিজেপি নেতা গোপীনাথ মুন্ডে ও সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশকে।’
এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে জল্পনা। বিগত প্রায় দু’দশক ধরে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তারিফ কুড়িয়ে আসার পর ভারতে ইভিএমকে ঘিরে সংশয় এখন তুঙ্গে। দেশের পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের পর কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী সুর চড়িয়েছিলেন, বহু জায়গাতেই ইভিএম ‘রহস্যজনক আচরণ’ করেছে।
শুক্রবার পুদুচেরির (ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল) মুখ্যমন্ত্রী ভি নারায়ণস্বামীরও অভিযোগ, ইভিএম কারচুপি করেই ভোটে জিতেছিল বিজেপি। ডেঙ্গু সচেতনা বিষয়ক এক র্যালিতে তিনি ভারতের সব রাজনৈতিক দলকে ইভিএমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।
গত সোমবার লন্ডনে ইউরোপ ইন্ডিয়ান জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত লাইভ অনুষ্ঠানে সৈয়দ সুজা বলেন, যে বিশেষজ্ঞ দল ভারতের নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) ইভিএম মেশিন সরবরাহ করেছিল, তিনি সেই দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন।
ওই লাইভে ইভিএম মেশিনে কীভাবে কারচুপি করা যায়, তাও দেখান সুজা। তার দাবি, নির্বাচনে ইভিএম কারচুপির কথা ফাঁস করে দেবেন ভয়ে মোদি সরকারের গ্রামোন্নয়নমন্ত্রী গোপীনাথকে ২০১৪ সালের ৩ জুন হত্যা করা হয়েছিল। ইভিএম দুর্নীতির বিষয়টি জেনে তা ফাঁস করে দেয়ার কথা ভেবেছিলেন সাংবাদিক গৌরীও। তার আগেই আততায়ীর গুলিতে ঝাঁজরা হয় তার দেহ।
তবে সুজার এ অভিযোগ ‘উসকানিমূলক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে ইসি। সুজার এমন দাবির পর থেকে ভোটিং মেশিনের কার্যকারিতা নিয়ে আদালতে অন্তত ৭টি চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে। পাল্টা সুজার বিরুদ্ধে দিল্লিতে দুটি এফআইআর করেছে ইসি।
বিশ্বের প্রায় ১২০টি দেশে গণতান্ত্রিক চর্চা রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৩৩টি দেশ ইভিএম ব্যবহার করে। নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে বিশ্লেষকদের মিশ্র মত রয়েছে। ভারতের ১৬ লাখ ভোটিং মেশিনের প্রত্যেকটি সর্বোচ্চ ২ হাজার ভোট ও ৬৪ প্রার্থী রেকর্ড করতে পারে। দেশটিতে প্রতিটি কেন্দ্রে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি নয়।
ইভিএমের প্রভাব নিয়ে ২০১৭ সালে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন শিশির দেবনাথ, মুদিত কাপুর ও শামিকা রবি। তারা দেখিয়েছেন, ইভিএম ভোট কারচুপির হার কমিয়ে দিয়েছে। ভোট গণনার ক্ষেত্রে সময় বাঁচায় সেটাও প্রমাণিত।
তবে ভিন্নমতও রয়েছে বিশেষজ্ঞদের। আট বছর আগে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ভোটিং মেশিনের সঙ্গে বাড়িতে তৈরি একটি ডিভাইসের সংযোগ দিয়ে ভোটের ফলাফল পরিবর্তন করে দেখিয়েছিলেন। মোবাইল ফোন থেকে বার্তা পাঠিয়েই এ কারচুপির প্রমাণ দিয়েছিলেন তারা। এ ক্ষেত্রে ম্যাসাচুসেটস প্রযুক্তি ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানী ধিরাজ সিনহা বলেন, ‘লাখ লাখ ইভিএম হ্যাক করা ব্যয়সাপেক্ষ। তবে অসম্ভব নয়।’
ভারতের লোকসভা নির্বাচনের আগে ইভিএম নিয়ে এমন অভিযোগে ভোট চুরির শঙ্কা তো থাকছেই। রাজনৈতিক নেতারা তাই আবার ব্যালট পেপারে ফিরে আসার পক্ষে সোচ্চার। গত সপ্তাহে কলকাতায় মমতা ব্যানার্জির ডাকে ব্রিগেড র্যালিতে ভোটিং মেশিনের বিরুদ্ধে একজোট হন ২৩ দলের নেতারা।
জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহ বলেছিলেন, ইভিএম চোর মেশিন। ভারতের সাবেক ইসি প্রধান শাহাবুদ্দিন ইয়াকুব কুরাইশি বলেন, ‘ভোটার ও রাজনৈতিক নেতাদের মনের নানা সন্দেহ-সংশয় দূর করতে আবার ব্যালট পেপার চালু করা উচিত।’
