শনিবার   ০৭ নভেম্বর ২০২৬   কার্তিক ২২ ১৪৩৩   ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

হাসিনা কি ফিরবেন নাকি ফিরবেন না ?

মাসুদ করিম, ঢাকা থেকে

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০২:৫২ এএম, ৭ নভেম্বর ২০২৬ শনিবার




ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন বলে ঘোষণা করেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই বিষয়টা নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। শুধু আলোচনাই নয়; কিছুটা অস্থির পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত পোশাক শিল্পে মজুরী বৃদ্ধির আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও তার বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ঢুকে পড়েছিলো। তাদের অনেককে গ্রেফতারও করা হয়েছে। তারা এই আন্দোলনকে ভেতরে ভেতরে উস্কে দিচ্ছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার লক্ষ্যে পোশাক শিল্পে নাশকতা চালানো হচ্ছে।
শেখ হাসিনা সর্বশেষ নিউইয়র্ক প্রবাসী বাংলাদেশী একজন সাংবাদিককে অনলাইনে দেওয়া এক অডিও সাক্ষাৎকারে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরবেন বলে তিনি ইচ্ছা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ২০২৪ সালে ছাত্রদের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গণঅভ্যুত্থানকালে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিবেশি ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এখন তিনি ডিসেম্বরে পুনরায় বাংলাদেশে ফিরে আসবেন বলে ঘোষণা দিলেও তার হাতে কোনও পাসপোর্ট নেই। সরকার তা জব্দ করেছে। স্বাভাবিকভাবে তাকে ট্রাভেল পাসও দেওয়া হবে না। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির একথা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কোন পাসপোর্ট বা ট্রাভেল পাস দেওয়া হবে না। ভারত থেকে তাকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি কেবল বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন করা হবে। সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের ধরার জন্য ভারতের সঙ্গে একটি প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের ফিরিয়ে আনার জন্য পাসপোর্টের প্রয়োজন হয় না। এটি তাদের হস্তান্তর করার বিষয়।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, শেখ হাসিনা একজন পলাতক ব্যক্তি এবং সন্ত্রাসী। তিনি এমন কেউ নন যে, রংপুরে শ্বশুরবাড়িতে ব্ড়োতে আসছেন, যার জন্য আমরা পাসপোর্ট ইস্যু করব এবং তিনি ভ্রমন করতে এখানে আসবেন। বৃহস্পতিবার হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইসিংয়ের নেতৃত্বে সফররত চীনা প্রতিনিধি দলকে বিদায় জানানোর পর সাংবাদিকদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
হুমায়ুন কবির জানান, গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত কোনও পলাতক ব্যক্তিকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সাধারন পাসপোর্ট বা ভ্রমণ নথি ইস্যু করার কোনও আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। কারণ বিদ্যমান প্রত্যার্পণ ব্যবস্থাতেই তাকে ফিরিয়ে আনার আইনি কাঠামো রয়েছে। শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার জন্য আদালতের পরোয়ানা এবং বাংলাদেশ-ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তির অধীনে নির্ধারিত পদ্ধতিই যথেষ্ঠ। আদালতের পরোয়ানা রয়েছে, সুনির্দিষ্ট বিচারিক প্রক্রিয়া আছে এবং প্রত্যর্পণ চুক্তিও রয়েছে। তাই পাসপোর্ট ইস্যু করার বা দেওয়ার কোনও প্রয়োজন বা বাধ্যবাধকতা নেই। দেশ ছেড়ে পালানোর আগে হাজারো মানুষের মৃত্যুর জন্য তিনিই দায়ী। যে সন্ত্রাসী হাজার হাজার মানুষকে হত্যার পর দেশ থেকে পালিয়ে গেছে, তাকে কি আমরা একজন সাধারন ভ্রমণকারী হিসাবে গণ্য করে পাসপোর্ট দেব? বাংলাদেশ চায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ যেন হাসিনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে সাধারণ ভ্রমণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার ফিরে আসার বিষয়টি কাম্য নয়। আমরা তাকে হস্তান্তরের দাবি জানাচ্ছি। তাকে হস্তান্তর করা উচিত। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তিটি গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত বা দন্ডিত ব্যক্তিদের হস্তান্তরের অনুরোধ জানানোর আইনি ভিত্তি প্রদান করে। বাংলাদেশ এই চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠিত বিচারিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের কথায় এটি স্পষ্ট যে, শেখ হাসিনাকে অপরাধী হিসাবে প্রত্যর্পণের যে দাবি বাংলাদেশ করছে সেটা মূলত রাজনৈতিক কথামালা। বর্তমান সরকারের জন্যে শেখ হাসিনাকে বংলাদেশে ফিরিয়ে আনা অস্বস্তি কর বলে মনে হচ্ছে। ভারত কোনও দিনই শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ফিরিয়ে দেবে না। কারণ শেখ হাসিনা ভারতের বন্ধু। দালাইলামাও ভারতের বন্ধু। তাকেও আশ্রয় দিয়েছে ভারত। ভারতসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশ নিজেদের বন্ধুকে আশ্রয় দিয়ে পরে তাকে তার শত্রুর কাছে তুলে দেয় না। যেহেতু শেখ হাসিনা মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত আসামী ফলে বাংলাদেশের কাছে তাকে তুলে দেওয়া মানে তার জীবন নাশের আশঙ্কা। যেহেতু বাংলাদেশ শেখ হাসিনাকে আদালতের আদেশ কার্যকর করতে পারে। তাই ভারত রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে ফেরত দেবে না।
শেখ হাসিনার যেহেতু পাসপোর্ট কিংবা ট্রাভেল পাস নাই ফলে কোনও বিমান তাকে উঠতে দিবে না। বিকল্প হলো, তিনি যদি স্থলসীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। এই ক্ষেত্রে ভারতের সহযোগিতা লাগবে। কারণ তিনি যে জায়গায় আছেন সেখান থেকে সীমান্তে আসতে হলে ভারতের অনুমতি লাগবে। ভারতের অনুমতি না থাকায় তিনি বক্তব্য রাখার সময়ে তার চেহারা দেখাতে পারেন না। তাকে ভারত সীমান্ত দিয়ে ঠেলে বাংলাদেশে পুশব্যাক করলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খারাপ হতে পারে। শেখ হাসিনার জন্য ভারত সম্পর্ক খারাপ করতে চাইবে না। তাছাড়া, শেখ হাসিনা কোনওভাবে যদি বাংলাদেশে ঢুকেন তবে তাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধরে হেলিকপ্টার যোগে ঢাকায় এনে কারাগারে প্রবেশ করাবে। তারপর তার বিরুদ্ধে চলবে আইনি প্রক্রিয়া। ফলে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে বাংলাদেশে আসা দৃশ্যত অসম্ভব। তবে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা করে তিনি বাংলাদেশে ফিরলে তার ফেরা সম্ভব হবে।