সোমবার   ০২ নভেম্বর ২০২৬   কার্তিক ১৭ ১৪৩৩   ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

পোশাক খাতে অস্থিরতায় রাজনৈতিক ইন্ধনের গন্ধ

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০৭:২৬ এএম, ২ নভেম্বর ২০২৬ সোমবার

পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে চলমান আন্দোলন-সহিংসতায় রাজনৈতিক ইন্ধন দেখছে পুলিশ। সরকার শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিলেও গত শনি ও রোববার ঢাকা, গাজীপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় সড়কে নেমে আন্দোলন করেছেন শ্রমিকরা। সংঘর্ষে জড়িয়েছেন পুলিশের সঙ্গে। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ হয়েছে পুলিশের স্থাপনা, যানবাহন ও পোশাক কারখানায়।

পুলিশের সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো জানিয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে সপ্তাহ ধরে চলা আন্দোলনের গতিবিধি নজরে রাখা হচ্ছিল। শ্রমিকদের দাবি মেনে নিয়ে সরকার মজুরি বোর্ড গঠনেরও সিদ্ধান্ত নেয়; কিন্তু তারপরও একটি অংশ শ্রমিকদের উসকানি দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি দিয়ে শ্রমিকদের মাঠে নামিয়েছে। কোনো কোনো জায়গায় চক্রান্তকারীরা নিজেরা মাঠে থেকে শ্রমিকদের আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

শিল্প পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসীম উদ্দিন কালবেলাকে বলেন, এই আন্দোলনে রাজনৈতিক ইন্ধন আছে। বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে শ্রমিকদের উসকানি দেওয়া হয়েছে। শ্রমিক সেজে অনেকে আন্দোলনেও অংশ নিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু আইডি ডিটেক্ট করেছি। যাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা আছে। তারা শ্রমিকদের ব্যবহার করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করে চলেছে।’

রোববার দুপুরে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম প্রিভেনশন উত্তর) মো. মহিদুল ইসলাম দাবি করেন, আন্দোলনকারীদের মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যরা ঢুকে পড়েছে।

এদিকে ডিবির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান বলেন, আটকদের মধ্যে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা আছে।

তিনি জানান, মিরপুরের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার ভাগনে আলিফ মোল্লা শতাধিক ব্যক্তিকে সংগঠিত করে শ্রমিক আন্দোলনে পাঠিয়েছিলেন। তারাই পুলিশের গাড়িতে আগুন দিয়েছেন ও ভাঙচুর চালিয়েছেন।

গত শুক্র ও শনিবার শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় সভা ও মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত হলেও রোববার সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সড়কে নামেন শ্রমিকরা। সড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করলে এলাকাগুলো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সহিংসতার মধ্যেই পূর্বঘোষণা অনুযায়ী শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য একটি নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী তার সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর বাতিল করেছেন।

এদিকে শ্রমিক অসন্তোষ মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণ করতে গতকাল সন্ধ্যায় কয়েকজন মন্ত্রী-উপদেষ্টাকে নিজের কার্যালয়ে ডেকে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির জন্য আগে মজুরি বোর্ড গঠন করা জরুরি। তারপর শ্রমিক-মালিকদের নিয়ে হবে নতুন মজুরি নির্ধারণ। শ্রমিকদের আশঙ্কা ছিল—মজুরি বোর্ড দ্রুত গঠন না হলে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে। এতে শ্রমিকদের বঞ্চনা বাড়বে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করে আসছে।

এর আগে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পোশাক খাতে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নিম্নতম মজুরি ঘোষণা করা হয়। পরের মাস থেকেই তা কার্যকর হয়। প্রতি পাঁচ বছর পরপর পোশাক খাতে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে মজুরি পুনর্নির্ধারণ করার কথা থাকলেও গত ১০ এপ্রিল শ্রম আইন সংশোধন বিল সংসদে পাস হয়। এতে মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময় পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়। সে হিসাবে নভেম্বর মাসে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড ঘোষণার কথা।

শ্রমিকদের দাবির মুখে সরকার মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নিলেও সেটার প্রচার সেভাবে হয়নি বলে দাবি করেন গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের সহকারী সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর মঈন। তিনি কালবেলাকে বলেন, শ্রমমন্ত্রীর সঙ্গে শুক্র ও শনিবার দফায় দফায় সভা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলন করে মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়েছে; কিন্তু সেই খবরের প্রচার সেভাবে হয়নি। যে কারণে অনেক জায়গায় শ্রমিকরা সরকারের অবস্থান না বুঝেই আন্দোলনে নেমেছেন।

মিরপুরে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও আগুন: রাজধানীর মিরপুর এলাকায় পুলিশের সঙ্গে তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল বেলা সোয়া ১১টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে তা মিরপুরের বিভিন্ন সড়কে ছড়িয়ে পড়ে।

সরেজমিন দেখা গেছে, শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করলে তাদের সরে যেতে বারবার অনুরোধ করে পুলিশ। বেলা সোয়া ১১টার দিকে পুলিশকে লক্ষ্য করে শ্রমিকরা ইটপাটকেল ছুড়লে সংঘর্ষ হয়। পুলিশ লাঠিপেটা শুরু করে। শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান দিয়ে পানি ছিটানোর পাশাপাশি সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে পুলিশ। শ্রমিকরা সাময়িক সময়ের জন্য ছত্রভঙ্গ হলেও আবার সংঘবদ্ধ হয়ে ফিরে এসে বিভিন্ন দিক থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। দুপুর ১২টা পর্যন্ত এই পরিস্থিতি চলে।

সংঘর্ষের মধ্যে দুপুর ১২টার দিকে পূরবী সিনেমা হলের সামনের সড়কে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জালাল উদ্দিন বলেন, আন্দোলনকারীদের দেওয়া আগুনে পুলিশের একটি গাড়ি পুড়েছে।

এদিকে সংঘর্ষ-ভাঙচুরে জড়িত থাকার অভিযোগে মিরপুর থেকে ২৯ জনকে আটক করেছে পুলিশ। মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়।

সাত ঘণ্টা অবরোধে অচল ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক: রোববার সকাল থেকে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কার্যত অচল হয়ে পড়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শুরু হওয়া শ্রমিকদের আন্দোলন চলে বিকেল ৩টা পর্যন্ত। টানা প্রায় ৭ ঘণ্টা অবরোধের পর শ্রমিকরা মহাসড়ক ছেড়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে। দিনভর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গাজীপুরের কোনাবাড়ী, কালিয়াকৈর, চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, সফিপুর, মৌচাক, রতনপুর, তেলিচালা ও কাশিমপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের হামলা ও অগ্নিসংযোগে কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে থাকা ট্রাফিক পুলিশ বক্স, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি গাড়ি, কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় একটি পিকআপ ভ্যান এবং ট্রপিক্যাল পোশাক কারখানার ঝুটের গোডাউন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া যমুনা ব্যাংক, কয়েকটি কারখানার ফটক এবং মৌচাক এলাকার একটি পুলিশ বক্স ভাঙচুর করা হয়। আন্দোলনের সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে কয়েকজন সংবাদকর্মীও শ্রমিকদের মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গাজীপুরের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল ও মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পাঁচ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়। একই সঙ্গে পুলিশ, শিল্প পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়।

শ্রমিক আন্দোলনের মুখে কালিয়াকৈরসহ গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অন্তত ৩০টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। পুলিশ, শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই সপ্তাহ ধরে গাজীপুরের কোনাবাড়ী, মৌচাক, সফিপুর ও কালিয়াকৈরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিক অসন্তোষ চলছে। শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণে সরকারের পক্ষ থেকে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও আন্দোলন থামেনি।

শ্রমিকদের দাবি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বর্তমান বেতনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাসাভাড়া, খাবার, চিকিৎসা ও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ মেটাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। এরই ধারাবাহিকতায় রোববার সকাল থেকেই বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ না দিয়ে আন্দোলনে নামেন।

আশুলিয়ায় ১৭৭ কারখানায় ছুটি: আশুলিয়ায় বিক্ষোভের মধ্যে ১৭৭ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কায় শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও কারখানার সামনে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

রোববার সকালে অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলেও পাঁচটি কারখানার শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখে কারখানার ভেতরে অবস্থান করেন। পরে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এতে আশুলিয়ার নরসিংহপুরসহ আশপাশের শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া সন্ধ্যায় বলেন, সাভার-আশুলিয়ায় দিনের বিভিন্ন সময় ১৭৭ কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।

শিল্পাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

হেমায়েতপুরে কারখানায় হামলা-ভাঙচুর: ঢাকার সাভারের হেমায়েতপুরে একেএইচ গ্রুপের একটি কারখানায় হামলা ও ভাঙচুর চালিয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন পোশাক শ্রমিকরা। এ সময় কারখানার কাচ ও বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করায় মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ ঘটনায় তথ্য সংগ্রহ ও ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে বিক্ষোভকারীদের মারধরের শিকার হয়েছেন স্থানীয় এক সাংবাদিক।

রোববার দুপুর আড়াইটার দিকে হেমায়েতপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।