বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ পেছাল তিন বছর
আজকাল রিপোর্ট
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০২:১৯ এএম, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ শনিবার
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময় আরও তিন বছর বাড়িয়েছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। ফলে আগামী ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে উত্তরণের নতুন সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে। বাড়তি এই সময়ে রপ্তানিতে সম্ভাব্য বাণিজ্যসুবিধা হারানোর প্রভাব মোকাবিলা অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ পাবে বাংলাদেশ। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও আর্থিক খাতের সংস্কারে কার্যকর অগ্রগতি অর্জন করতে হবে।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত আইরিন জুবাইদা খান বলেন, “বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করছে শুধু আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার কারণে নয়, বরং উত্তরণ আমাদের জনগণের আকাঙ্খা। এটি একটি জাতীয় অপরিহার্যতা এবং আমাদের সরকার এ লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।”
নতুন সরকার গঠনের পর গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আবেদন করে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতি, জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে এ আবেদন করা হয়।
জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি (সিডিপি) বাংলাদেশের আবেদনের পক্ষে সুপারিশ করার পর বিগত ২১ জুলাই জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) বিষয়টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সাধারণ পরিষদে প্রেরণ করে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের উত্তরণের সময় বাড়ানোর প্রস্তাব উত্থাপন করে উরুগুয়ে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপ-স্থায়ি প্রতিনিধি এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান অ্যাপলো আজকালকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপালের উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর আবেদনও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত এসেছে এমন এক সময়ে, যখন বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুর্বলতা দেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতার ওপর চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বিদ্যমান অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যসুবিধা ধরে রাখা এবং বিকল্প সুবিধা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বিভিন্ন বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা কমে গেলে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়তে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে উত্তরণের সময় বাড়ানোর অর্থ সব বাজারে সব ধরনের সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ২০২৯ সাল পর্যন্ত বহাল থাকা নয়।
সংশ্লিষ্ট বাজারের বিধিবিধান ও বাণিজ্য অংশীদারদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সুবিধার মেয়াদ নির্ধারিত হবে। তাই বাড়তি সময়ের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রস্তুতি নিতে হবে বাংলাদেশকে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মাসরুর রিয়াজ গতকাল বলেন, জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি (সিডিপি) এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) সুপারিশকে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখেছেন।
তিনি বলেন, সাধারণ পরিষদে প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করাই ছিল প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। উত্তরণের সময় বাড়ানোর পক্ষে অর্থনৈতিক যুক্তি থাকায় প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন আদায়ে সরকার প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের সামনে এখন প্রধান কাজ হবে বাড়তি সময়কে কার্যকর সংস্কারের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা। রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র বাড়ানোর মতো বিষয়গুলোতে অগ্রগতি প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন না এলে উত্তরণের সময় বাড়ানোর সুফল সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতি মূল্যায়ন করে সিডিপি জানিয়েছে, দেশটি নির্ধারিত সূচকগুলোতে প্রয়োজনীয় মানদণ্ড অতিক্রম করেছে। তবে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন এবং উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে অর্থনীতিকে প্রতিযোগিতামূলক ও স্থিতিশীল রাখা এক বিষয় নয়। এ কারণে বাংলাদেশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় আসে। সিডিপির সুপারিশের পর ইকোসক বিষয়টি সাধারণ পরিষদের বিবেচনার জন্য পাঠায়।
বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপালও উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর সময় পেয়েছে। উভয় দেশের আবেদনের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন এবং টেকসই উত্তরণের প্রস্তুতির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাভুক্ত হয়। এলডিসিভুক্ত থাকার কারণে দেশটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারসহ বিশেষ বাণিজ্যসুবিধা এবং উন্নয়ন সহযোগিতা পেয়ে আসছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে এসব সুবিধা বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) অধীন সিডিপি তিন বছর পরপর এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর অগ্রগতি মূল্যায়ন করে। মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা—এই তিন সূচকের ভিত্তিতে উত্তরণের যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়। সাধারণ নিয়মে অন্তত দুটি সূচকে নির্ধারিত মান অর্জন করতে হয়। বিকল্পভাবে মাথাপিছু আয়ের মানদণ্ড নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ অতিক্রম করলেও কোনো দেশ উত্তরণের যোগ্য হতে পারে।
বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে। ২০২১ সালে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে উত্তরণের সুপারিশ করে। সাধারণত উত্তরণের সুপারিশের পর তিন বছরের প্রস্তুতিকাল দেওয়া হলেও কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব বিবেচনায় বাংলাদেশকে পাঁচ বছর সময় দেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী উত্তরণের তারিখ নির্ধারিত হয় ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর।
এবার সেই সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ল। ফলে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়ানো, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আর্থিক খাতের সংস্কারে অগ্রগতি অর্জনের সুযোগ পাবে। এই সময়ের সঠিক ব্যবহারই নির্ধারণ করবে, বাড়তি প্রস্তুতিকাল উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
