মন্ত্রী-এমপিদের কঠিন বার্তা দিলেন তারেক রহমান
মাসুদ করিম, ঢাকা থেকে
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০২:০৭ এএম, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ শনিবার
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুরোপুরি অ্যাকশনে চলে গেছেন। ঢাকা-৬ আসনের এমপি ইশরাক হোসেনকে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী হয়েও নিজ হাতে অস্ত্র নিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে নেমেছিলেন তিনি। মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই। কিন্তু প্রতিমন্ত্রী নিজ হাতে অস্ত্র তাক করা নিয়ে যত বিপত্তি। এই বিতর্কিত কর্মকান্ডে সরকার এবং সরকারী দল বিএনপি’র ভাবমূর্তি বিনষ্ট হয়েছে। তাই তড়িঘড়ি প্রতিমন্ত্রীকে পদত্যাগের নির্দেশ দিলেন প্রধানমন্ত্রী। ইশরাককে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া বিএনপি’র জন্যে বড় ঘটনা। রাজধানীতে বিএনপি’র সাংগঠনিক কাঠামোর ভিত্তি অনেকখানি ইশরাক হোসেনের ওপর নির্ভরশীল।
পুরনো ঢাকায় অবস্থিত ঢাকা-৬ আসনের এমপি ব্যারিষ্টার ইশরাক হোসেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার বাবা সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ঢাকা-৬ আসন থেকে খোকা একবার ভোটে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে হারিয়ে ছিলেন। এতটাই শক্ত তার ঘাঁটি। খোকা ঢাকার মেয়র ছিলেন। মন্ত্রীও ছিলেন। তারই পুত্র ইশরাক হোসেন অনেক জনপ্রিয় একজন নেতা। তার আসনের ঘুন্টি ঘর নামের একটি জায়গা দীর্ঘ দিন যাবত মাদকের আখড়া। এখানে মাদকসেবীরা শুধু মাদক সেবন করে এমন নয়। মাদক ছড়িয়ে দেওয়া হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে। ঘুন্টি ঘর এলাকায় ইশরাক মাদকবিরোধী অভিযান চালান। এতে তিনি প্রকাশ্যে পিস্তল হাতে নিয়ে মাদকসেবী ও কারবারীদের তাড়া করেন। এই ভিডিও তিনি আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করেন। মুহূর্তেই এই ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায়। শুরু হয় আলোচনা ও সমালোচনা। বিতর্কিত এই কান্ডে প্রধানমন্ত্রী ইশরাককে ডেকে নিয়ে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দেন।
নাটকীয়তার পর ইশরাক সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। জনাকীর্ণ ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, তার দল বিএনপিকে বিব্রতকর অবস্থা থেকে বাঁচাতে তিনি পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে তিনি এও বলেন যে, মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে তিনি কোনও ভুল করেননি। বিএনপি’র রাজনীতির জন্যে ইশরাক হোসেন একজন শক্তিশালী নেতা। তার নিজের ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত। তবুও প্রধানমন্ত্রী কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সম্প্রতি ইশরাকের ঘটনার আগে মিরপুরে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে এমপি পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। দুর্বৃত্তরা রাজধানী ঢাকার মিরপুরে শিশুদের টিকাদানকারী প্রতিষ্ঠান রাড্ডা ক্লিনিক রাতের আঁধারে কয়েক ঘন্টা হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। পুলিশ এই হামলা বন্ধ করতে কোনও ভূমিকা পালন করেনি। এই হামলার নেপথ্যে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির জড়িত থাকার অভিযোগ মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাৎক্ষণিকভাবে মিষ্টিকে এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দেন। মিষ্টি পুরনো ঢাকার বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর বোন এবং মিরপুরে বিএনপি দলীয় ওয়ার্ড কমিশনার নিউটনের স্ত্রী। পিন্টু গডফাদার হিসাবে পরিচিতি লাভ করে কারাগারে মারা যান। নিউটনকেও দুর্বৃত্তরা গুলি করে হত্যা করে। পিন্টু ও নিউটনের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে মহানগর বিএনপি’তে মিষ্টির অবন্থানও পাকাপোক্ত। কিন্তু মিষ্টির ছত্র-ছায়ায় রাড্ডা ক্লিনিক গুঁড়িয়ে দিলে প্রধানমন্ত্রী মিষ্টির এমপি পদ থেকে তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই দুইটি ঘটনার মাধ্যমে তার দলের মন্ত্রী-এমপিদের সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, দলের জন্যে কেউ অপরিহার্য নয়। কেউ তার অপকর্মের মাধ্যমে বিএনপিকে বিব্রতকর পরি¯ি’তির মধ্যে ফেললে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী তার দুইটি বার্তার পর মন্ত্রী ও এমপিরা সতর্ক হয়ে পড়েছেন। সবাই দূর্গাপূজায় নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে পূজা উদযাপনে সহায়তা করেছেন। মন্ত্রী-এমপি কিংবা বিএনপি’র দলীয় কর্মীর বিরুদ্ধে অপতৎপরতা শুধু নয়; প্রত্যাহিত যে কোনও আইন লংঘণের ঘটনা চোখে পড়লে সেখানেও একইভাবে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন প্রধানমন্ত্রী। এমন ঘটনা প্রসঙ্গে সম্প্রতি দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে গ্রেফতারের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। আগরওয়ালা খুবই প্রভাবশালী হওয়ার পরও তিনি গ্রেফতার হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেআইনি কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে সক্রিয়। রাজধানী ঢাকার মিরপুরে ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ করার উদ্যোগ নিয়েছেন। এ নিয়ে হকার এবং পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত হকার উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়েছে। এখন পর্যন্ত নতুন হকার সেখানে বসেনি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্রিয় রয়েছেন। কিন্তু আমলাতন্ত্র সেখানে সহযোগিতা করছে না। প্রকৃতপক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে সফল সরকার প্রধান হতে চাইছেন। কিন্তু তার দলের লোকজন এবং আমলারা সেই কাজে আন্তরিক সহায়তা করছে না। এটা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আইন-শৃঙ্খলা পরি¯ি’তির উন্নতি ঘটিয়ে দেশে স্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি করা। দেশে নিয়মতান্ত্রিক পরিস্থিতিতে না গেলে বিনিয়োগ হবে না। বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি যে পূর্বাভাস দিচ্ছে তাতে সামনের দিনে প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী হবে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে না পারলে উন্নতি করা সম্ভব হবে না। পরিস্থিতির গোটা চিত্র আঁচ করতে পেরেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শক্ত হাতে সবকিছু মোকাবেলা করতে চাইছেন। এই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বাঁধা তিনি ধরেছেন। তিনি বলেছেন, তার কাছে গোয়েন্দা তথ্য আছে যে, ফ্যাসিস্ট ও গুপ্ত এক হয়েছে। একজন দেশের বাইরে থেকে টাকা পাঠাচ্ছে। আরেকজন দেশের ভেতরে ষড়যন্ত্র করছেন। দুইয়ে মিলে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে চায়। প্রধানমন্ত্রী মূলত দেশের বাইরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এবং দেশের ভেতরে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। এখন প্রশ্ন হলো, এটা কি কথার কথা নাকি এর বাস্তবিক কোনও ভিত্তি আছে ?
