ডেঙ্গু সংক্রমণ ২৬ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ১০:২৭ এএম, ২১ অক্টোবর ২০২৬ বুধবার
বছরের প্রথম সাড়ে ৯ মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা এক লাখ ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে। ২০০০ সালে ডেঙ্গু রোগী শনাক্তের তথ্য সংরক্ষণ শুরুর পর সংক্রমণের হিসাবে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। অন্যদিকে, গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ভাইরাসজনিত এই রোগে প্রাণ গেছে ৩৫৭ জনের। মৃত্যুর দিক থেকে ২৬ বছরের মধ্যে এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ।
সংক্রমণের এই হিসাব শুধু হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের। ফলে উপসর্গ নিয়ে বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়া, পরীক্ষা না করানো কিংবা হাসপাতালের বাইরে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের সংখ্যা এতে অন্তর্ভুক্ত নেই। প্রকৃত সংক্রমণ আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এর আগে ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ওই বছর প্রাণ হারান এক হাজার ৭০৫ জন। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয় ২০২৪ সালে, ৫৭৫ জনের।
এদিকে ডেঙ্গু রোগী ও মৃত্যু বাড়তে থাকলেও সরকার বলছে, এ রোগ নিয়ন্ত্রণে তাদের চেষ্টায় কোনো ঘাটতি নেই। সবাই মিলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা, বৃষ্টি ও আর্দ্রতার ধরন বদলানোর পাশাপাশি এডিস মশার বিস্তার ও আচরণেও পরিবর্তন এসেছে। এ ছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ণ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যকর উদ্যোগের অভাব এবং মশক নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দুর্বলতার কারণে ডেঙ্গু পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে।
এদিকে, দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ ছিটানো ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চললেও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসায় প্রচলিত কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০০০ সালে দেশে পাঁচ হাজার ৫৫১ জন রোগী শনাক্ত হন, মারা যান ৯৩ জন। এর পর বিভিন্ন সময়ে সংক্রমণ বাড়লেও ২০২৩ সালে তা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। পরের বছরগুলোতেও ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনক ছিল। ২০২৪ সালে এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হন, মারা যান ৫৭৫ জন। ২০২৫ সালে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল এক লাখ দুই হাজার ৮৬১, মৃত্যু হয় ৪১৩ জনের।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়। এই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এক হাজার ৩৬৬ জন।
মশক নিয়ন্ত্রণে কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
ডেঙ্গু প্রিভেনশন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের (ডিপিএফবি) সাধারণ সম্পাদক ও জাপানের ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স টোকিওর গবেষক ডা. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ খান সমকালকে বলেন, মশা নিধনের কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে লোক-দেখানো কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। শুধু ওষুধ ছিটিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এ জন্য মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে সেখানে কার্যকরভাবে লার্ভা ধ্বংসের উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; এ কার্যক্রমে সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করলেও মানুষকে সচেতন করে প্রতিরোধ কার্যক্রমে যুক্ত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে।
ডা. আব্দুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও ‘স্কুল অ্যাম্বাসাডর’ কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি পরিবার ও সমাজেও ডেঙ্গু প্রতিরোধের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। তিনি আরও বলেন, মশক নিধন আর এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ এক বিষয় নয়। তাই প্রচলিত মশক নিধন কর্মসূচিতে পরিবর্তন এনে এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্তকরণ, লার্ভা ধ্বংস এবং নিয়মিত তদারকির ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু উড়ন্ত মশা মারার বদলে বংশবিস্তার বন্ধ করতে পারলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডেঙ্গু একবার কোনো এলাকায় বিস্তার লাভ করলে তা পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন। তবে পরিকল্পিত মশক নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, প্রজননস্থল ধ্বংস এবং কার্যকর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
একসময় বর্ষাকালকে ডেঙ্গুর প্রধান মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সাধারণত জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সংক্রমণ বেশি দেখা যেত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বছরের অন্য সময়েও ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। ফলে শুধু বর্ষাকাল সামনে রেখে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা, বৃষ্টি ও আর্দ্রতার পরিবর্তন ঘটছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। এর ফলে এডিস মশার বিস্তার এবং ডেঙ্গুর সংক্রমণের ধরন বদলে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের কৌশল ঢেলে সাজাতে হবে। এ ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দুটি পদ্ধতি রয়েছে—মিটিগেশন বা প্রশমন এবং অ্যাডাপটেশন বা অভিযোজন। মশক নিয়ন্ত্রণে যুক্ত সংস্থাগুলোর পক্ষে বড় পরিসরে প্রশমন কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হলেও অভিযোজনের মাধ্যমে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। কবিরুল বাশারের মতে, পরিবেশ ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে এডিস মশার আচরণে যেসব পরিবর্তন ঘটছে, সেগুলো শনাক্ত করে সে অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
রাজধানীর বাইরেও বাড়ছে রোগীর চাপ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে দুজন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালের রোগী। বরিশাল সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় দুজন এবং রংপুর সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় একজনের মৃত্যু হয়েছে।
নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ১১০ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ১১৩ জন ভর্তি হয়েছেন। ঢাকার দুই সিটির বাইরে ঢাকা বিভাগের অন্য হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪১৫ জন। এ ছাড়া বরিশালে ১৯১, চট্টগ্রামে ১০৫, খুলনায় ১৪১, ময়মনসিংহে ৮০, রাজশাহীতে ১২৮, রংপুরে ৭২ ও সিলেটে ১১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
রোগীর এই বিস্তৃত ভৌগোলিক উপস্থিতি বলছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নজরদারি জোরদার এবং চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত সমকালকে বলেন, ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে, মারা যাওয়া অধিকাংশ ব্যক্তি অসুস্থ হওয়ার তিন দিন বা তারও পরে হাসপাতালে এসেছেন। এ ছাড়া ডেঙ্গুর হটস্পট চিহ্নিত করে মশার লার্ভা ধ্বংস ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনগুলোও কাজ করছে। হাসপাতালে আসা রোগীদের ঠিকানা যাচাই করে যেসব এলাকা থেকে বেশি রোগী আসছেন, সেসব এলাকায় তাৎক্ষণিকভাবে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও লার্ভিসাইড প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের চেষ্টায় কোনো ঘাটতি নেই। প্রতি সপ্তাহে মেয়র ও প্রশাসকদের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ বিষয়ে বৈঠক করছেন। সবাই মিলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছেন।
