বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অশনি সংকেত
মাসুদ করিম, ঢাকা থেকে
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০১:৪০ এএম, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ শনিবার
বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা খুবই খারাপ। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানী সংকটে নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতির বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) অর্থনীতির নিম্নমুখী পূর্বাভাস দিচ্ছে। প্রবৃদ্ধি কমে তলানিতে নেমে যাওয়ার অবস্থা। মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাবে লাগামহীন। এমন এক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে অশনি সংকেত দেখা যাচ্ছে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্যেও সামনের দিনগুলো সুবিধাজনক হবে না বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক ইকোনমিক আপডেট ২০২৬ মোতাবেক, কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বিশেষ করে জ্বালানী খাতের সংকট গভীর হওয়া, অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল রাজস্ব আহরণসহ বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখানো হয়েছে তিন দশমিক চার শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিনিয়োগের অবস্থা খারাপ, রফতানি তার গতি হারিয়েছে, মুদ্রাস্ফীতি বেড়েই চলছে, গৃহস্থালীর ক্রয় ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আর্থিক খাতের এই দুর্গতির কারণে বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারাচ্ছেন। তবে প্রতিবেদনে কিছুটা আশার চিত্রও রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেমিটেন্স প্রবাহ গতিশীল থাকার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রয়েছে। ২০২৮ আর্থিক বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার তিন দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই ক্ষেত্রে জ্বালানী সরবরাহের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হলে এই অবস্থার উন্নতির কথা বলা হয়েছে।
আইএমএফ বাংলাদেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি আরও কমিয়ে তিন দশমিক দুই শতাংশে নেমে আসবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে প্রবৃদ্ধি হ্রাসের পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। মুদ্রাস্ফীতির পূর্বাভাস খুব উদ্বেগজনক। মুদ্রাস্ফীতি আট দশমিক সাত শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। আইএমএফ মনে করে, স্বল্পমেয়াদে কঠোর নীতি গ্রহণের পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, কর ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা এবং বাজারভিত্তিক নীতি গ্রহণ করার এখনই সঠিক সময়।
এডিবি তাদের সর্বশেষ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বর্তমান অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তিন দশমিক সাত শতাংশ থেকে চার শতাংশের মধ্যে থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। মূল্যস্ফীতি গড়ে আট দশমিক সাত শতাংশ থেকে নয় শতাংশের মধ্যে থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এডিবি জানিয়েছে, টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য আর্থিক খাতের কাঠামোগত সংস্কার, বেসরকারী বিনিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধি ও উপযুক্ত বৈদেশিক বিনিময় হার নির্ধারণ অপরিহার্য। তিনটি আর্থিক সংস্থার প্রায় একই রকমের পূর্বাভাস দিয়েছে।
বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে বিগত পাঁচ দশকে গড়ে প্রায় ছয় শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে স্থিতিশীলতার মডেল হয়ে আছে। সেখান থেকে হঠাৎ করে প্রবৃদ্ধি একেবারে অর্ধেকে নেমে এসেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির এই অশনি সংকেত কী শুধু বৈশ্বিক যুদ্ধ পরি¯ি’তির কারণে হয়েছে নাকি অন্য কিছু কারণ রয়েছে এর নেপথ্যে সেটা জানা জরুরী।
বিশ্বের অর্থনীতির নিম্নমুখিতা শুরু হয় কভিড-১৯ মহামারির মাধ্যমে। সেই ধাক্কা বাংলাদেশের ওপরও পড়েছে। যদিও পশ্চিমা বিশ্ব যেভাবে বড় ধরনের সংকটের মধ্যে পড়েছিল; বাংলাদেশের সংকট সেই তুলনায় অনেক কম। সেটার বড় কারণ হলো, বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও দেশটির ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প যা খুব বেশি আক্রান্ত হয়নি। কারণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতির যোগসূত্র নেই। তার ওপর বাংলাদেশের কৃষিখাত খুব ভাল করায় কোভিড খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনি। তাছাড়া, কভিড মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি খুব ভাল ছিলো।
কোভিড-১৯ মহামারির পরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লেগেছে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে। ওই যুদ্ধের ধাক্কাও সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছিলো। কিন্তু সর্বনাশ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল মিলিতভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পর তা গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে পড়ার কারণে বাংলাদেশ জ্বালানী সরবরাহ পেতে সমস্যায় পড়ে। বাংলাদেশ সাধারনত কাতার থেকে জ্বালানী ক্রয় করে থাকে। কিন্তু কাতার এনার্জি উৎপাদন বন্ধ রাখে।
সৌদি আরবের সঙ্গে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের লড়াইয়ের ফলে বাংলাদেশের ওপর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে। হুথিরা তেলের ক্ষেত্রগুলোকে টার্গেট করেছে। সৌদি তেল ক্ষেত্র টার্গেট হলে বাংলাদেশের জন্যে ক্ষতিকর। এভিয়েশন ফুয়েলের দাম কয়েক দফায় বেড়েছে। সার্বিক বিবেচনায় জ্বালানী ক্রয়ে সংকটে ভোক্তারা।
অপরদিকে, বাংলাদেশের জনশক্তির প্রধান বাজার সৌদি আরব। শুধু সৌদি আরবই নন, উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো বাংলাদেশের শ্রমশক্তির প্রধান বাজার। এই দেশগুলো আবার সৌদি আরবের কথায় উঠেবসে। তাই সৌদি আরব ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
