বুধবার   ১৪ অক্টোবর ২০২৬   আশ্বিন ২৮ ১৪৩৩   ০২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

রিয়াদে হামলা আতঙ্ক, ঢাকায় চরম ভোগান্তি

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০৯:৪৩ এএম, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ বুধবার

ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে এবং ভ্রমণকারীরাও রাজধানী এড়িয়ে চলছেন। নিরাপত্তাঝুঁকি বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে বিভিন্ন প্রাসাদে দফায় দফায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। 

এদিকে, রিয়াদসহ দেশটির বিভিন্ন বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও তার প্রভাব পড়েছে। গত শনিবার রাত থেকে গতকাল মঙ্গলবার রাত সোয়া ৮টা পর্যন্ত বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি এবং ট্রানজিট রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ৮২টি ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত হয়েছে। এতে ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েছেন ১৩ হাজার ৭১ যাত্রী। এ ছাড়া আগামী শনিবার পর্যন্ত রিয়াদ ও দাম্মামগামী সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। 

সৌদি আরবে কর্মস্থলে যোগ দিতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকার বিমানবন্দরে আসছেন যাত্রীরা। বিমানবন্দরে পৌঁছে ফ্লাইট বাতিলের খবর জানতে পেরে বিপাকে পড়ছেন তারা। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা সৌদিপ্রবাসী মো. মাহিরুল বলেন, দুই মাসের ছুটিতে দেশে ফেরার সময়ই ফিরতি টিকিট করেছিলাম। গত রোববার ঢাকা বিমানবন্দর থেকে রিয়াদে যাওয়ার কথা ছিল। বিমানবন্দরে আসার পর জানতে পারি রিয়াদগামী ফ্লাইট বন্ধ। ফ্লাইট বাতিলের খবরটি আগে থেকে জানতে পারলে ভোগান্তিতে পড়তে হতো না। 

তিনি বলেন, পরে ঢাকা-দুবাই হয়ে আল কাসিমগামী অন্য একটি এয়ারলাইন্সের টিকিট কেটেছি। ভিসার মেয়াদ প্রায় শেষ। এ অবস্থায় কর্মস্থলে সময়মতো পৌঁছতে না পারলে ঝামেলায় পড়তে হবে। 

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১০টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ১০টি, সৌদিয়ার পাঁচটি এবং রিয়াদ এয়ারের সাতটি ফ্লাইট রয়েছে। এ ছাড়া ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগোর ২২টি, সালামের চারটি, ইজিপ্টএয়ারের একটি, এমিরেটসের ১১টি, কাতার এয়ারওয়েজের ছয়টি এবং ফ্লাইদুবাইয়ের ছয়টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। 

এদিকে ফ্লাইট বাতিল, বিলম্ব বা সময়সূচি পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে এয়ারলাইন্সগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গত সোমবার রাতে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ এক চিঠিতে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন। চিঠিতে বলা হয়, ফ্লাইটের বিলম্ব, বাতিল বা সময়সূচি পরিবর্তনের বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের এসএমএস, ফোনকলসহ বিভিন্ন মাধ্যমে জানাতে হবে। 

এদিকে, আগামী শনিবার পর্যন্ত ঢাকা থেকে দাম্মাম ও রিয়াদগামী সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে সংস্থাটি। 

সানার তেল স্থাপনা খালি করার নির্দেশ ও হুতিদের পাল্টা হুমকি 

সৌদি নেতৃত্বাধীন যৌথ সামরিক জোট হুতি-নিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানায় বিশেষ অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছে। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি এক্সে একটি মানচিত্র প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট এলাকার বেসামরিক নাগরিকদের অনতিবিলম্বে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান। 

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সানার উপকণ্ঠে অবস্থিত ইয়েমেন পেট্রোলিয়াম কোম্পানির আল-সাবাহা সেন্ট্রাল স্টেশনটি সৌদি জোটের সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্যবস্তু হতে যাচ্ছে। এই নির্দেশনার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে হুতিরা। গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারিয়া সতর্ক করেছেন, সানায় সৌদি জোট হামলা চালালে রিয়াদে অত্যন্ত কঠোর ও যন্ত্রণাদায়ক জবাব দেওয়া হবে। 

এদিকে, গতকাল সকালেও রিয়াদ লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। রিয়াদের উত্তরাঞ্চল লক্ষ্য করে ধেয়ে আসা তিনটি ড্রোন আকাশেই ধ্বংস করার দাবি করেছে সৌদি জোট। এ ঘটনার পর হুতি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পাল্টা বিমান হামলা চালানো হয়েছে। 

অন্যদিকে হুতিরা দাবি করেছে, তারা রিয়াদের পাশাপাশি দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কামিস মুশাইতের একটি বিমানঘাঁটিতেও পৃথক ড্রোন হামলা চালিয়েছে। 

সৌদি যুবরাজকে দফায় দফায় সরানো হচ্ছে 

হুতিদের হামলার মধ্যে নিরাপত্তা বিবেচনায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে বাংকারসুবিধাসহ কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত বিভিন্ন প্রাসাদে দফায় দফায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ৪১ বছর বয়সী যুবরাজ সালমানকে গত মঙ্গলবারের পর থেকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। সেদিন জাতীয় রক্তদান কর্মসূচিতে রক্ত দিতে তাঁকে উপস্থিত হতে দেখা গিয়েছিল। 
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবর অনুসারে, নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে যুবরাজকে তাঁর পছন্দমতো বাছাই করা একটি নিরাপত্তা দল পাহারা দিচ্ছে। 

রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধের মেয়াদ বাড়ল 

হুতিদের ধারাবাহিক হামলার মুখে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধের মেয়াদ আগামী শনিবার পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া রাজধানীর সড়কগুলো কিছুটা সচল দেখা গেলেও নিরাপত্তা উদ্বেগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। 

দেশটির সরকারঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা বিশ্লেষক আলি শিহাবি জানিয়েছেন, বিশাল আয়তনের সৌদি আরবে অসংখ্য বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও পাইপলাইন রয়েছে। একযোগে এসব স্থাপনা রক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত এই মুহূর্তে নেই। ফলে ফ্রান্স, ব্রিটেন, পাকিস্তান ও মিসরের কাছে অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তার আবেদন জানিয়েছে রিয়াদ। 

আগাম সতর্কবার্তার অভাব, সাধারণ মানুষের মনে শঙ্কা বাড়ছে

রিয়াদ বিমানবন্দরে গত কয়েকদিনে ধারাবাহিক হামলায় ১৮ জন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। এর কয়েকদিন আগেই সম্ভাব্য সামরিক হামলার বিষয়ে সাধারণ নাগরিকদের সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়েছিল প্রশাসন। 

চলমান উত্তেজনার মধ্যেও সৌদি সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করছে। এটি সেই মানসিকতারও প্রতিফলন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে এই কৌশল শেষ পর্যন্ত উল্টো ভয় ও অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। তীব্র বিতর্কের মুখে গত সোমবার সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ পুনরায় রিয়াদ ও দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরগুলোতে নতুন করে সতর্কবার্তা জারি করা শুরু করেছে। 

২০১৫ সালে সৌদি আরব ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে দেশটির সরকারের পক্ষে যোগ দিলে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। ২০২২ সালে দুই পক্ষের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল। তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের জুলাইয়ে সেই চুক্তি ভেঙে যায়। ইরান থেকে আসা একটি উড়োজাহাজ সানার বিমানবন্দরে অবতরণের চেষ্টা করার সময় সৌদি বাহিনী সেখানে হামলা চালিয়েছে– এমন অভিযোগ তুলে হুতিরা আবার হামলা শুরু করে।