সোসাইটির অ্যাকাউন্টে আছে মিলিয়ন ডলার
আজকাল রিােপর্ট
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ১২:৪২ এএম, ৩ অক্টোবর ২০২৬ শনিবার
বাংলাদেশ সোসাইটির আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বর্তমান কমিটির বিরুদ্ধে একটি মহল আর্থিক অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ করে আসছে। তাই সংবাদ সম্মেলন ডেকে মিথ্যা অভিযোগ প্রত্যাখান করেছেন সোসাইটির বর্তমান কমিটির নেতৃবৃন্দ। তাঁরা বলেন, কোন অর্থিক অনিয়মতো ঘটেইনি বরং কমিটির দক্ষতায় সোসাইটির অ্যাকাউন্টে প্রায় মিলিয়ন ডলার জমা আছে। যা অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি বলে জানানো হয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর এল্মহার্স্টস্থ সোসাইটির কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলনে কাল্পনিক অভিযোগের দালিলিক প্রমাণ থাকলে তা উপস্থাপন করা এবং না থাকলে ভিত্তিহীন অভিযোগ থেকে সংশ্লিষ্টদের বিরত থাকার আহবান জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান শাহ নেওয়াজ বলেন, আমি সোসাইটিকে বাড়ি কেনার জন্য অনুদান হিসেবে ১ লাখ ২৫ হাজার ডলার দিয়েছি। তা ফেরত নেয়া হবে না। বরং সোসাইটির আগামী নির্বাচনের পর যে বা যারাই বিজয়ী হন না কেনো আমি তাদের সহযোগিতা করবো এবং বাংলাদেশ সেন্টার প্রতিষ্ঠা হবেই ইনশাআল্লাহ। নির্বাচন নিয়ে সোসাইটিতে কোন ধরনের মিথ্যা অভিযোগ বা অপতথ্য না ছড়াতে সবার প্রতি আহবান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে ৮ পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর ব্যাখ্যা তুলে ধরেন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী। এরপর বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সোসাইটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান শাহ নেওয়াজ, সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম ও মোহাম্মদ আলী। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সোসাইটি ট্রাস্টিবোর্ডের সদস্য আজিমুর রহমান বুরহান, আব্দুর রহীম হাওলাদার, মোহাম্মদ আতরাউল আলম, আহসান হাবীব, জুনেদ চৌধুরী, ফখরুল ইসলাম দেলোয়ার ও নাঈম টুটুল, কার্যকরি কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি মহিউদ্দিন দেওয়ান, সহসভাপতি কামরুজ্জামান কামরুল, সাংগঠনিক সম্পাদক ডিউক খান, জনসংযোগ ও প্রচার সম্পাদক রিজু মোহাম্মদ, স্কুল ও শিক্ষা সম্পাদক মোহাম্মদ হাসান (জিলানী), কার্যকরি সদস্য জাহাঙ্গীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী, হাছান খান প্রমুখ।
লিখিত বক্তব্যে মোহাম্মদ আলী বলেন, সম্প্রতি সোসাইটির কয়েকজন সদস্য বাংলাদেশ সোসাইটি বর্তমান কার্যকরী পরিষদ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ কিছু মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও বাস্তবতাবিবর্জিত বক্তব্য দিয়ে আসছেন। যা কমিউনিটির মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। যা কোন ভাবেই কাম্য নয়। বর্মমান কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানে ২০২৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিদায়ী কমিটি জানিয়েছিল- সোসাইটির অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩ লাখ ৮৫ হাজার ডলার রয়েছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে বুঝে নেওয়ার সময় অ্যাকাউন্টে মাত্র ১ লাখ ৩৫ হাজার ৬৭৩ ডলার ছিল। এছাড়া অভিষেক অনুষ্ঠানসহ পূর্ববর্তী কমিটির প্রায় ২০ হাজার ডলারের বকেয়া দায়ও এ কমিটি পরিশোধ করতে হয়েছে। তাই কার্যত মাত্র ১ লাখ ১৬ হাজার ডলারের নিট আর্থিক অবস্থান নিয়ে নতুন কমিটি দায়িত্ব নেয়। অর্থ কম থাকলেও গত ২০ মাসে জমকালো আয়োজনে বাংলাদেশ সোসাইটির ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন, নিউইয়র্ক সিটির বাঙালি অধ্যুষিত চারটি এলাকায় মোট ৮টি ইফতার আয়োজন, ইমিগ্রেশন সেমিনার, এনআইডি কার্ড সংক্রান্ত সেমিনারসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া, ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি, ফিউনারেল সহায়তা, সোসাইটির নিজস্ব কবরের ব্যবস্থাসহ নান কর্মসূচির পরও গত ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত সোসাইটির অ্যাকাউন্টে প্রায় এক মিলিয়ন ডলার (৯ লাখ ১৯ হাজার ডলার) রয়েছে।
তিনি বলেন, অভিযোগ করা হচ্ছে বর্তমান কমিটি ৭ লাখ ২৫ হাজার ডলার ব্যয় আত্মসাৎ করেছে। এর পক্ষে ন্যূনতম কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ থাকলে অভিযোগকারীরা যেন তা সোসাইটির সদস্যদের সামনে প্রকাশ করে। অথচ, জানুয়ারি-২০২৫ থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত সোসাইটির নিয়মিত অপারেটিং ব্যয় ২ লাখ ৫ হাজার ৪৭ ডলার এবং অনুষ্ঠান ও কর্মসূচর ৩ লাখ ২০ হাজার ৪১৮ ডলারসহ মোট ৫ লাখ ২৫ হাজার ৪৬৫ ডলার ব্যয় হয়েছে।
বাংলাদেশ সেন্টার ক্রয় নিয়েও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেয়া হচ্ছে। দীর্ঘ অনুসন্ধান ও প্রাথমিক যাচাই-বাছাইরে পর জ্যামাইকা এলাকায় একটি ভবন পছন্দ হয়। কার্যকরী পরিষদ ও ট্রাস্টি বোর্ডের আলোচনার পর অ্যাটর্নির মাধ্যমে ৩১ অক্টোবর ২০২৫ ভবনটি শর্তসাপেক্ষ ক্রয়চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সোসাইটির পক্ষ থেকে ২ লাখ ডলার ডিপোজিট প্রদান করা হয়, যার মধ্যে ১ লাখ ২৫ হাজার ডলার বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান শাহ নেওয়াজ ব্যক্তিগতভাবে অনুদান হিসেবে প্রদান করেন। শর্ত ছিল ভবনটির কিছু ভায়োলেশন ও অন্যান্য অসঙ্গতি বিক্রেতা সমাধান করে দেবে। কিন্তু বিক্রেতা শর্ত পূরণ করতে না পারায় সোসাইটির বৃহত্তর স্বার্থে চুক্তি বাতিল করে ২ লাখ ডলারের পুরো ডিপোজিট ফেরত নেয়া হয়, যা বাড়ি ক্রয়ের জন্য আলাদা অ্যাকাউন্টে রক্ষিত আছে।
মোহাম্মদ আলী বলেন, সোসাইটির বর্তমান ভবনের ভায়োলেশন ও জরিমানা নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেয়া হচ্ছে। অথচ ভায়োলেশন ও আরোপিত জরিমানা পূর্ববর্তী সময় থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত। পূর্ববর্তী সময়ের বিভিন্ন ভায়োলেশন বাবদ প্রায় ৮২ হাজার ডলারের মত জরিমানা ছিল। বছরের পর বছর এক কমিটি থেকে আরেক কমিটির কাছে বিষয়টি চলে এসেছে। কিন্তু এর স্থায়ী সমাধান হয়নি। এ সংক্রান্ত তথ্য নিউইয়র্ক সিটির সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পাবলিক রেকর্ডে রয়েছে। বর্তমান কমিটি জরিমানা সম্পূর্ণ মওকুফের চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তা কমিয়ে প্রায় ৩১ হাজার ডলারে নিয়ে আসা হয়েছে।
ইফতারের খরচ নিয়েও ঢালাও অভিযোগ করে বলা হচ্ছে, বর্তমান কার্যকরী পরিষদ প্রতি ইফতার মাহফিলে প্রায় ৮৯ হাজার ডলার খরচ করেছে। অথচ দুই বছরে ৮টি ইফতার মাহফিলে এই ব্যয় হয়েছে। আবার এই ব্যয়ের মধ্যে ৪২ হাজার ৫৭০ ডলারের বেশি এসেছে বোর্ড অব ট্রাস্টির ও কার্যকরী পরিষদের সদস্য, স্পন্সর ও শুভাকাঙ্খীদের সহযোগিতা থেকে। সোসাইটির ফান্ড থেকে ব্যয় হয়েছে ৪৬ হাজার ৪৩০ ডলার, গড়ে প্রতিটি ইফতার মাহফিলে মাত্র ৫ হাজার ৮০৩ ডলার। অতীতে একটি ইফতার মাহফিল আরো অনেক বেশি খরচ হতো। এসব ইফতার অনুষ্ঠানে প্রতিবছর প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ বেশী শিশু-কিশোর ও নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণে কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সোসাইটির কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে অনেক সময় এমন কিছু জরুরি খরচ আসে, যেখানে নগদ অর্থে পেমেন্ট করতে হয়। ফলে প্রয়োজনে কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নিজের পকেট থেকে সোসাইটির অনুমোদিত খরচটি পরিশোধ করেন। পরে সেই খরচের যথাযথ রসিদ বা ভাউচার জমা দেওয়ার পর তা যাচাই-বাছাই করা হয় এবং ব্যয়টি সঠিক প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে তার নিজের খরচ করা অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য তার নামে চেক ইস্যু করা হয়।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সোসাইটির হিসাব, অডিট এবং আর্থিক কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। অথচ, গত ডিসেম্বর মাসে বার্ষিক সাধারণ সভায় সিপিএ রিপোর্টসহ সোসাইটির আয়-ব্যয়ের বিস্তারিত সোসাইটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বড় এলইডি স্ক্রিনে তুলে ধরা হয়। যা সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়। বলা হচ্ছে বর্তমান কার্যকরী পরিষদ নাকি কবর বা ফিউনারেল সার্ভিসের অর্থ শেষ করে ফেলেছে। বরং বাস্তবতা হচ্ছে আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ফিউনারেল ও কবর সংক্রান্ত অর্থের জন্য সম্পূর্ণ পৃথক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং কার্যকরী পরিষদে এ বিষয়ে রেজুলেশনও গৃহীত হয়েছে।
বর্তমান কমিটি দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার পর ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা করতে গিয়ে দেখা যায়, শপথ গ্রহণের দিনই বিদায়ী কার্যকরী পরিষদ একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কবর ক্রয়ের উদ্দেশ্যে ২ লাখ ৪০ হাজার ডলার প্রদান করা হয়েছিল। সেই অর্থ প্রদানের প্রক্রিয়ায় গঠনতান্ত্রিক প্রশ্ন দেখা দেওয়ায় বর্তমান কার্যকরী পরিষদ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করে। আলোচনার পর তারা সম্পূর্ণ ২ লাখ ৪০ হাজার ডলার কয়েকটি কিস্তিতে বাংলাদেশ সোসাইটিকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হন। এরই মধ্যে বড় অংশ ফেরত এসেছে। আমরা বলতে চাই, আমরা কখনো দাবি করি না যে আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিখুঁত। আমাদের সঙ্গে কেউ দ্বিমত করতে পারেন, সমালোচনা করতে পারেন, আরও ভালো পথ দেখাতে পারেন আমরা সেটিকে স্বাগত জানাই। কিন্তু অর্ধসত্য দিয়ে পূর্ণ সত্যকে আড়াল করা যায় না, আর অভিযোগ দিয়ে কাজের রেকর্ড মুছে ফেলা যায় না। আমরা যখন পথচলা শুরু করি, তখন সোসাইটির সদস্যসংখ্যা ছিল প্রায় ১৮ হাজার। আজ যা ৩৫ হাজারেরও বেশি বলে তারা জানান।
