রোববার   ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬   আশ্বিন ১১ ১৪৩৩   ১৪ রবিউস সানি ১৪৪৮

এবার মোহাম্মদপুরে শতাধিক মানুষ নিয়ে জমি দখল

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০১:১৫ এএম, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রোববার

মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার রেশ না কাটতেই এবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরে কয়েকশ’ লোক নিয়ে হামলা-ভাঙচুর করে জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে গাবতলী-সদরঘাট বাইপাস সড়কের পাশে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ সাতমসজিদ হাউজিং সংলগ্ন এলাকায় এই 
ঘটনা ঘটে। খোদ বিট পুলিশিং অফিসের সামনে প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা ধরে তাণ্ডব চালিয়ে ওই জমিতে থাকা স্থাপনা ও হাউজিংয়ের অফিসে ভাঙচুর করে নগদ ১৫ লাখ টাকা, জমির দলিল, এসি, ফ্যান, জানালা-দরজা, আসবাবপত্রসহ মালামাল লুট করা হয়। পরে বাঁশ-টিনের বেড়া দিয়ে দখল নেয়ার চেষ্টা করা হয়। ঘটনার সময়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি পুলিশ।

ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, শনিবার সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটের দিকে মোহাম্মদপুর বিট পুলিশিং অফিসের সামনে দিয়ে দেড় থেকে দুইশ’ লোক মিছিলের মতো করে ওই জায়গাটির সামনে আসছে। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাকের সামনে এসে জায়গাটির সীমানা নির্দেশ করে বাঁধা বাঁশের দড়ি খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন। ভেতরে প্রবেশের পরই সামনে যা পেয়েছে এলোপাতাড়ি ভাঙচুর করতে থাকে তারা। সেসময়ে ওই জায়গায় খেলাধুলা করতে থাকা কয়েকজন শিশুকে ভয়ে দৌড়ে পালাতে দেখা যায়। ভিডিওতে দেখা যায়, হামলাকারীরা নিচে ভাঙচুরের একপর্যায়ে ওই জমিতে থাকা আবাসনের দুইতলা বিশিষ্ট অফিসে উঠে সিসি ক্যামেরা, লোহার গ্রিল, টেবিল, চেয়ার, আলমারি, বাথরুমসহ বিভিন্ন জায়গায় ভাঙচুর চালায়। আলমারিতে থাকা জমির দলিলসহ আবাসনের বিভিন্ন কাগজপত্র মেঝেতে ফেলে পানি ঢেলে সেগুলো নষ্ট করে দেয়া হয়। ভিডিওতে আরও দেখা যায়, কয়েকজন কিশোর কেউ এসি খুলে নিয়ে যাচ্ছে, কেউ আবার হাতে করে ল্যাপটপ নিয়ে যাচ্ছে, কেউ কেউ আবার ধরাধরি করে লোহার সিঁড়ি বেয়ে মাথায় করে ফ্রিজ নিয়ে নামছেন। কেউ জানালা ভাঙছেন, কেউ আবার দরজা খোলার চেষ্টা করছেন। ভাঙচুর শেষে টিন দিয়ে পুরো জায়গা ঘিরে দিয়ে তারা চলে যান।

ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও ওই এলাকার বাসিন্দা সাজিদা বেগম বলেন, আমার বাড়ি এই জায়গার পাশেই। দেয়ালের সঙ্গে। গলি রাস্তা দিয়ে আমরা এই জায়গা দিয়েই চলাচল করি। ঘটনার সময়ে আমি এখানেই ছিলাম। তিনি বলেন, আমি বাচ্চাকে খাওয়াচ্ছিলাম। এরই মাঝে দেখি হঠাৎ প্রায় দুই/তিনশ’ লোক গালিগালাজ করতে করতে এসে গেটের সামনের বাঁশের বাঁধন খুলে ভেতরে প্রবেশ করে। বাচ্চারা তখনো খেলা করছিল। ভেতরে ঢুকেই ওই লোকগুলো আমাদের ধাওয়া করে। তখন আমরা দৌড়ে বাসার গলির মুখে এসে দাঁড়ায়। এরপর ওই লোকগুলো প্রথমে এসেই আগে সিসি ক্যামেরাগুলো ভেঙে ফেলে। তখন সামনে যা ছিল তারা সবকিছু ভেঙে চুরমার করে দেয়। এরপর ওই অফিসে ও জায়গাটিতে যা যা ছিল সব কিছু খুলে নিয়ে যায়। ওই সময়ে পাশের ভবন থেকে কয়েকজন উঁকি দিয়ে দেখছিল। তাদেরও লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে তারা। এমনকি ঘটনার সময়ে আমার পাশের বাড়ির বাসিন্দা জহির নামে এক ভাই ফোনে কথা বলছিলেন। ঘটনার ভিডিও করছে সন্দেহে তার বাসায় ঢুকে দরজা ভেঙে তাকে টেনেহিঁচড়ে বের করে নিয়ে এসে বেধড়ক মারধর করে।

ভুক্তভোগী জহির বলেন, আমি বারবার করে তাদের বলি- আমার ফোন চেক করেন, আমি ভিডিও করিনি। তারপরও আমাকে মারধর করে তারা। তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘদিন থেকে এই এলাকায় বসবাস করি। আমাদের জন্ম এখানে। তিনি বলেন, মূলত এই জমিটি ২০০৬ সালে চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ের তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. আলম হোসেন কেনেন। এরপর এই জমি তার কাছ থেকে সাম্প্রতিক সময় ভবন নির্মাণের জন্য হুমায়ুন নামে এক ব্যক্তি কিনে নেন। পরে তিনি ওই জমি প্লট আকারে আরও ২৯ জনের কাছে শেয়ার বিক্রি করেন। যার মধ্যে ৯ জন প্রবাসীও রয়েছেন। বর্তমানে ওই জায়গায় একটি শপিংমল নির্মাণের কাজ চলছিল। নিচে শপিংমল উপরে আবাসিক বাসা। এর মধ্যেই ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে হামলা চালিয়ে এই দখলের চেষ্টা চালানো হলো। তিনি বলেন, হামলাকারীদের মধ্যে স্থানীয় রাজনীতি যারা করে ছাত্র, যুব ও মূল দল সব কয়েকটি ইউনিটেরই নেতাকর্মীরা ছিল। আমরা অনেককেই চিনি। কিন্তু নাম বলতে পারবো না। তবে সেলিম মোল্লা নিজে ছিলেন তাদের সঙ্গে। তিনিই প্রথম ভেতরে ঢুকেছেন।
সব সিসি ক্যামেরা ফুটেজে আছে। ঘটনার সময় সামনের বিট পুলিশিং অফিসে ফোন করলেও কেউ ফোন রিসিভ করেনি, এমনকি ঘটনাস্থলেও আসেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তিনি বলেন, অবাক করা বিষয় কয়েকজন পুলিশ সদস্য এসে এই জমির সামনে থেকে ঘুরে যাওয়ার ঠিক পর পরই এই হামলা চালানো হয়।

ওই জায়গাটির ২৯ জন শেয়ার মালিকদের মধ্যে লন্ডন প্রবাসী শেয়ারহোল্ডার রবিন বলেন, আমরা সারা জীবন বিদেশে থাকি। অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে এই জমিটির একটা শেয়ার কিনেছি। ওখানে ফ্ল্যাট পাবো। ভেবেছিলাম জীবনের শেষ মুহূর্তে দেশে গিয়ে ওই ফ্ল্যাটে থাকবো। কিন্তু এগুলো কি শুরু হলো। যে কেউ এসে আমাদের ন্যায্য জমি জখল করে নিচ্ছে। দেখার কেউ নেই। এই যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি হয় তাহলে আমরা কোথায় যাবো। দেশে ফিরে কি করবো!

এদিকে এই ঘটনার বিচার চেয়ে মোহাম্মদপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন মো. জয়নাল আবদিন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেছেন, মোহাম্মদপুর থানাধীন চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ের ৮ নম্বর বাসার সঙ্গে ভবনসহ ১১ কাঠা জমি তার মায়ের মালিকানাধীন। গত কিছুদিন ধরে মো. মোস্তাকের রহমান খোকন চৌধুরী (৬২) স্থানীয় মহিন, প্রিন্স, আলামিন সহ আরও অন্তত এক থেকে দেড়শ’ সন্ত্রাসী সঙ্গে নিয়ে ওই জমি দখলের চেষ্টা করছেন। একইসঙ্গে হুমায়ুনের মালিকানাধীন জমিও দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে। জমিটি নিয়ে ভবিষ্যতে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। লিখিত অভিযোগে তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি ওই জমির মালিকানা দাবি করে দখলের চেষ্টা করছেন, তারা দাবি করছেন ২০২২-২৩ সালে তারা কারও কাছ থেকে জমিটি কিনেছেন। তবে বাস্তবে ওই ব্যক্তিদের কাছে থাকা জমির কাগজপত্রের সঙ্গে এই জমির কোনো সম্পর্ক নেই। তারা উদ্দেশ্যপ্রবণভাবে এইগুলো করছে।

এ বিষয়ে জমিটির ঠিক সামনে থাকা বিট পুলিশিং অফিসে গেলে দেখা যায়, সেখানে কেউ নেই। লাইট-ফ্যান সব চলছে কিন্তু ভেতরে কেউ নেই। পরে সেখানকার দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদপুর থানার এসআই রাজুর ফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এই ঘটনায় আলোচনায় আসা মোহাম্মদপুর ৩২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক সেলিম মোল্লা বলেন, আমি ঘটনাস্থলে ছিলামই না। এ বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই।

বিষয়টি নিয়ে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল হালিম বলেন, ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের টিম ঘটনাস্থলে যায়। যতটুকু জানতে পেরেছি, ওই এলাকায় দু’টি বস্তি ছিল এবং আনুমানিক ১৭ কাঠা জমি নিয়ে একাধিক পক্ষের বিরোধ রয়েছে। মূলত ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর থেকে আলম নামের এক প্রবাসী দেশের বাইরে রয়েছেন। জমিটি তার দখলে ছিল। সেখানে থাকা দু’টি বস্তির একটি তিনি আগেই দখলমুক্ত করেছেন। এরপর জমিটি খালি ছিল। অন্যপক্ষ খালি জমিটি দখলে নেয়ার চেষ্টা করায় বিরোধের সৃষ্টি হয়। এ বিরোধের জেরেই হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। তবে কারা হামলা-ভাঙচুর চালিয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তদন্ত করে বিস্তারিত জানানো হবে। ওসি বলেন, জমি বা দখলসংক্রান্ত বিষয়ে পুলিশ পদক্ষেপ নিতে পারে না। তবে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হলে পুলিশ অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন বলেন, ঘটনার সংবাদ পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। যাচাই বাছাই শেষে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।