শনিবার   ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬   আশ্বিন ১০ ১৪৩৩   ১৩ রবিউস সানি ১৪৪৮

জাতিসংঘে কিভাবে আসন নির্ধারিত ও ব্রাজিলই কেন প্রথম বক্তা

মনোয়ারুল ইসলাম

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ১২:২৪ এএম, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শনিবার


জাতিসংঘে বাংলাদেশের আসনটি কোন সারিতে। কোন সারিতে বসেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী । প্রতিবছর জাতিসংঘের সাধারন অধিবেশ বসে। আর কোন দেশটিই প্রথম সারির প্রথম সারিতে আসন গ্রহন করে এ প্রশ্ন অনেকেরই। এবারের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে প্রথম আসনটি অলংকৃত করেছেন মরক্কোর প্রধানমন্ত্রী আজিজ আখান্নুচ। আর প্রথম বক্তা কে? ব্রাজিলই সবসময় প্রথম বক্তা আর যুক্তরাষ্ট্রই কেনইবা দ্বিতীয় । 

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন কক্ষে বর্ণানুক্রমিক আসন বিন্যাস করা হয়ে থাকে। জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর নামের ইরেজি বর্ণমালার শুরুর অক্ষর ‘এ’ দিয়ে আসন বসানো শুরু হয়। তদানুসারেই সংশ্লিষ্ঠ দেশের আসনগুলোতে প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীরা আসন গ্রহন করেন। বাংলাদেশের নামটি শুরু হয় ‘বি’ অক্ষর দিয়ে। বাংলাদেশের  নির্ধারিত হয় ‘এ’ ও ‘বি’ দিয়ে শুরুর সদস্য দেশের সংখ্যার ওপর। 
জাতিসংঘের প্রতিবছরের অধিবেশনে সরকার প্রধান কিংবা রাষ্ট্র প্রধানদের আসন বিন্যাস দেশের নামের  বর্ণমালার ক্রমানুসারে হলেও ব্যতিক্রমও ঘটে। প্রথম সারির প্রথম আসনটির বেলায় এ রীতি অনুসরণ করা হয় না।  এ আসনটিতে কোন দেশের সরকার বা রাষ্ট্র প্রধান বসবেন তা দিয়ে তা নির্ধারণের লক্ষ্যে জাতিসংঘ মহাসচিব লটারি বা ড্র-এর আয়োজন করেন। সাধারণ পরিষদ হলের পোডিয়াম থেকে দেখলে সামনের সারির ডানদিকের প্রান্তের আসনটিই প্রথম সারি প্রথম আসন। ৮১তম অধিবেশনে প্রথম আসনটিতে জিতেছে মরক্কো। আসন অলংকৃত করবে মরক্কোর প্রধানমন্ত্রী।১৯৪৬ সালে ব্রাজিল প্রথম সারির প্রথম আসনটি লটারিতে জয়লাভ করেছিল। ১৯৫১ সালে পাকিস্থান,১৯৬০ সালে বার্মা,১৯২৪ সালে ইয়েমেন, ১৯২৫ সালে নাইজার প্রথম আসনটি গ্রহন করে। অন্যান্য দেশগুলো ইংরেজি বর্ণানুক্রমিক ক্রম অনুসরণ করা হয় জাতিসংঘের এ/আরইএস/৭১/৩২৩ প্রস্তাবটির বিবেচনায়। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ন কমিটিগুলোর ক্ষেত্রেও একই ক্রম অনুসরণ করা হয়ে থাকে। এই আসন বিন্যাসে সরকার প্রধানের মর্যাদা বা প্রভাবের ভিত্তিতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয় না। এ’ছাড়া ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বর্ণানুক্রমিক ক্রমে আসন গ্রহণের অধিকার প্রদান করা হয়েছে। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক সাধারণ অধিবেশন চলাকালে সাধারণ পরিষদের সভাপতি, মহাসচিব এবং সচিব মঞ্চে (পোডিয়ামে) আসন গ্রহণ করেন। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে সরকার বা রাষ্ট্র প্রধানরা ভাষণ দেন।  

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে কোন দেশ কখন বক্তব্য দেবে, সেই ক্রম কিছুটা এলোমেলো মনে হতে পারে। এটি বর্ণানুক্রমিক নয়। তবে ব্রাজিল প্রথম আর যুক্তরাষ্ট্র সব সময়েই দ্বিতীয় দ্বিতীয় বক্তা। এই ক্রম আসলে ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার কোনো নির্দিষ্ট মাপকাঠির ভিত্তিতেও সাজানো নয়। ভাষণের তালিকায় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সব সময় প্রথমে থাকে ব্রাজিল। এর পরই যুক্তরাষ্ট্র। ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রের পর বক্তাদের তালিকা নির্ধারণে বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে কোন দেশ কাকে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠাচ্ছে, তারা কোন তারিখে বক্তব্য দেওয়ার আবেদন করেছে এবং তালিকায় ভৌগোলিক ভারসাম্য বজায় রাখা। ব্রাজিলের কূটনীতিক অসভালদো আরানহা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রথম বিশেষ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার সময় এই রীতির শুরু হয়। তখন থেকেই ব্রাজিল প্রথম বক্তা হিসেবে ভাষণ দিয়ে আসছে। জাতিসংঘের প্রটোকল বিষয়ক প্রধান ডেসমন্ড পার্কার ২০১০ সালে এনপিআরকে বলেছিলেন, ‘শুরুর দিকে যখন কেউ প্রথমে বক্তব্য দিতে চাইত না, তখন ব্রাজিল সবসময় প্রথমে বক্তব্য দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করতো। এভাবেই সাধারণ পরিষদে প্রথমে বক্তব্য দেওয়ার অধিকার তারা অর্জন করে।’ তবে হোস্ট কান্ট্রি হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দ্বিতীয় বক্তা হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিয়ে থাকেন। ১৯৫৫ সাল থেকে ব্রাজিল সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী বক্তা।  তবে ১৯৮৩ ও ১৯৮৪ সালে এর ব্যতিক্রম হয়েছিল।

নিউ ইয়র্কে চলছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন। এতে অংশ নিতে জড়ো হয়েছেন বিশ্বনেতারা। অধিবেশন চলবে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। আর এবারের অধিবেশনে ভাষণ দেবেন অন্তত ১৩০ জন রাষ্ট্রপ্রধান। ২২ সেপ্টেম্বর অধিবেশনের প্রথম দিনে স্বাগত ভাষণ দেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তেনিও গুতেরেস। এর পর বক্তব্য দেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি  ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তবে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে প্রথম বক্তব্য দেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভা।

জাতিসংঘে প্রতিবছর একজন সভাপতি নির্বাচিত হন। তা কখনো নির্বাচনের মাধ্যমে এবং কখনো বিনাপ্রতিন্দ্বিতায় হয়ে থাকে। জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। এর আগেও হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর নির্বাচিত হয়ে তিনি এই মর্যাদাপূর্ণ পদে আসীন প্রথম বাংলাদেশি ও বাঙালি হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। বাংলাদেশ ৫৫ বছরের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমান বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দিচ্ছে। সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনটি ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে এবং তা আগামী বছরের ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। খলিলুর রহমান এ সময়কালীন সময়ে জাতিসংঘে নেতৃত্ব দিবেন। 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই বিশ্ব দরবারে একই পরিবারের সরকারর প্রধান হিসেবে ৩ জনের উপস্থিতি একটি ইতিহাস। তারেক রহমানের জন্য একটি আবেগী ঘটনা। তার বাবা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও মা বেগম খালেদা জিয়া সরকার প্রধান হিসেবে ভাষণ দিয়েছেন। একই পোডিয়ামে তৃতীয় প্রজন্মের তারেক রহমান ভাষণ দিলেন ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬। 
জাতিসংঘের অধিবেশন মানেই যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আবেগ ও উৎসবের যায়গা। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশিরা এ উৎসবে সামিল হয়। অপেক্ষায় থাকেন নিজ দেশের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে আসছেন কবে। তার আগমনে বিমানবন্দরে দলবেঁধে গিয়ে স্বাগত জানাবেন। শ্লোগান দেবেন। তবে বিরুদ্ধাচারণও ঘটে। সরকার বিরোধী দলগুলো বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করে থাকে। এ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি শ্লোগান দেয়া হয়। অনেক সময় তারা অনাকাংখিত ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন।। ডাক পড়ে পুলিশেরও। ২০২৫ সালে জাতিসংঘে যোগ দিতে আসা অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার প্রধান ড. ইউনূসের সফরসঙ্গীদের ওপর ডিম ছুড়ে মারা হয়েছিল। তা নিয়ে কমিউিনিটির সাধারন মানুষ ক্ষোভও প্রকাশ করেছিলেন। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, পক্ষে বিপক্ষে মিছিলকারিা জ্যাকসন হ্ইাটসে ফিরে একই রেষ্টুরেন্টে আড্ডা ও খানাপিনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্টেট থেকেও বাংলাদেশিরা এ সময় নিউইয়র্কে আসেন। জ্যাকসন হাইটস এলাকা হয়ে ওঠে বাংলাদেশিদের উৎসব কেন্দ্রে। 

ম্যানহাটনের জাতিসংঘ সদর দপ্তর থেকে মাইল দশেক দূরে জ্যাকসন হাইটস। দিনরাত এখন লোকারণ্য। পোষ্টারে ছেয়ে গেছে দেয়াল। আকাশ ঝুলছে ব্যানার। প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর আবাসিক হোটেলের ৪২ স্ট্রিটে বিএনপির নেতাকর্মিরা প্রতিদিন মিছিল করছেন। এতে সামিল হচ্ছেন বিভিন্ন স্টেট থেকে আসা নেতাকর্মিরা। বিএনপির মধ্যে ঈদঈদ ভাব। তবে দুংখের বিষয় হচ্ছে, বিএনপির এই হাজার হাজার কর্মি স্বচোখে তাদের নেতা তারেক রহমানকে দেখতেও পারবেন না। নাগরিক সংবর্ধণাও বাতিল করা হয়েছে। হয়তো জনাবিশেক নেতা হোটেলে তার সাক্ষাৎ পেতে পারেন। তা নিয়েও চলছে দলটিতে উত্তেজনা।
 
নিজের সময়, নিজের অর্থ, নিজের শ্রম দিয়ে রাজনৈতিক সমাবেশে অংশ নেওয়ার এই প্রবণতা বিশ্বের অন্য কোনো দেশের প্রবাসী কমিউনিটিতে নেই। সরকার প্রধানদের হোটেলগুলোতে বাংলাদেশি ছাড়া অন্য কোন দেশের মানুষ চোখেও পড়ে না। আর এই বাংলাদেশিদের সামাল দিতে হোটেল সিকিউরিটিম্যানদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।  শুধু তাই নয়। জাতিসংঘের সাধারন অধিবেশন কাভার করতে নিউইয়র্কে এসেছেন শতাধিক বাংলাদেশি সাংবাদিক। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সংখ্যাই এখন সবচেয়ে বেশি। জাতিসংঘের মিডিয়া এক্রেডিটেশন বিভাগের তথ্যানুসারে, বাংলাদেশি সাংবাদিকরা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক মিডিয়া পাশ গ্রহণ করেছেন। খলিলুর রহমানের দপ্তরে নিয়োগ পেলেন জাইমা রহমানসহ ৬ বাংলাদেশি