স্বীকৃতি থাকলেও স্বামীর বাড়িতে মর্যাদা পেতেন না মরিয়ম
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০৭:৪৪ এএম, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মঙ্গলবার
সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন রাগে-অভিমানে ও কষ্টে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন-এমনটাই ধারণা করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন বিভাগের সদস্যরা।
তারা বলছেন, কাগজে-কলমে স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি থাকলেও স্বামীর বাড়িতে মর্যাদার ঘাটতি এবং সামাজিক চলাফেরায় অবহেলার কারণে অল্পবয়সী মরিয়মের মনে অভিমান ও ক্ষোভ তৈরি হয়ে থাকতে পারে। এসব কারণেই তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন বলে ধারণা করছেন তারা।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) শুনানি শেষে ঢাকার আদালত গাজী নজরুল ইসলামের চার দিন এবং তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামসুজ্জোহা সরকার দুজনেরই সাত দিন করে রিমান্ড আবেদন করেছিলেন।
মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলাটি করেন।
মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম ও ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ওবায়দুর রহমান পলাতক রয়েছেন।
এর আগে রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটের একটি কক্ষ থেকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় মরিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে ওই কক্ষ থেকে হাতে লেখা কয়েকটি চিরকুট জব্দ করে পুলিশ। এসব চিরকুট মরিয়মের নিজের লেখা কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কয়েকটি চিরকুট সাদা কাগজে কালো ও লাল কালি দিয়ে লেখা। এর মধ্যে একটি ‘বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ’ লেখা প্যাডেও লেখা রয়েছে। চিরকুটগুলোর লেখক মরিয়ম নিজেই কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।
সোমবার দুপুরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে মরিয়মের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। বেলা দেড়টার দিকে মর্গে থাকা স্বজনরা মরদেহ গ্রহণ করে দাফনের জন্য নিয়ে যান।
ময়নাতদন্তের সময় পরীক্ষার জন্য মরিয়মের মস্তিষ্ক ও হৃদ্যন্ত্রের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া হাই ভ্যাজাইনাল সোয়াব ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে এবং ভিসেরা পরীক্ষার জন্যও নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে মর্গ সূত্রে জানা গেছে।
শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ফরেনসিক বিভাগে জমা দেয়। প্রাথমিকভাবে শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি; তবে গলায় ফাঁসের দাগ রয়েছে। ময়নাতদন্ত ও অন্যান্য পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে।
মরিয়মের মৃত্যুর কারণ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে নানা ধারণা রয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ মনে করছেন, পারিবারিক ও সামাজিক নানা বিষয় নিয়ে মরিয়মের মধ্যে অভিমান, ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তবে এসব বিষয় এখনো তদন্তে নিশ্চিত হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মনোবিজ্ঞানী বলেন, অল্পবয়সী মরিয়মকে ঘিরে পূর্বের ঘটনাগুলো এবং পরবর্তী সময়ে সেগুলো দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে তার মানসিক অবস্থার একটি ধারণা পাওয়া যেতে পারে। ঘটনাগুলোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় কোটি মানুষ সেগুলো দেখেছেন। ফলে আত্মীয়-স্বজন ও সমাজের মানুষও তাকে ভিন্নভাবে দেখেছেন-এমন অনুভূতি তার মধ্যে তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
মরিয়মকে স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পরও পারিবারিক বা সামাজিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন—এমন ধারণাও তার মনে তৈরি হয়ে থাকতে পারে। বয়স কম হওয়ায় এসব বিষয় তাকে আরও বেশি প্রভাবিত করে থাকতে পারে। সব মিলিয়ে তার মধ্যে হতাশা, ক্ষোভ ও একাকিত্ব তৈরি হয়ে থাকতে পারে। ‘কোথায় যাবে, কার কাছে যাবে’-এমন পরিস্থিতিতে তার মনে হতে পারে, তার আর কেউ নেই। একই সঙ্গে বাবা-মা ও পরিবারের সম্মানের বিষয়টিও তাকে মানসিকভাবে আঘাত করে থাকতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু হাতে লেখা কাগজ যদি মরিয়মেরই হয়ে থাকে, তাহলে সেসব লেখায় তার হতাশা, ক্ষোভ, অবহেলা, মর্যাদাবোধ এবং ভালোবাসার ক্ষয়ের বিষয়গুলো ফুটে উঠেছে বলে মনে হতে পারে।
মেট্রোপলিটন পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, মরিয়মের বাবা আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেছেন। মামলায় তার মেয়ের স্বামী গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রীকে আসামি করা হয়েছে।
মরিয়মকে নির্যাতন করা হতো কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তবে এ মুহূর্তে পুলিশের কাছে এ ধরনের কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।
তিনি আরও বলেন, মরিয়মের মৃত্যুর সময় গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী ন্যাম ভবনের ওই ফ্ল্যাটে ছিলেন। মরদেহ উদ্ধারের সময় তাদের পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
এদিকে আদালতে গাজী নজরুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, অভিযোগগুলো মিথ্যা এবং মরিয়ম নিজেই আত্মহত্যা করেছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত হন গাজী নজরুল ইসলাম। পরে তার একটি ব্যক্তিগত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় দলীয়ভাবে তদন্ত করা হয়।
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাংগঠনিক তদন্তে তার বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২২ জুলাই তাকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে জানানোর সিদ্ধান্তের কথাও জানায় দলটি।
