সোমবার   ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬   ভাদ্র ৩০ ১৪৩৩   ০১ রবিউস সানি ১৪৪৮

দেশ জুড়ে ঘরে ঘরে জ্বর, হাম-ডেঙ্গুর সঙ্গে টাইফয়েড

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ১০:৫১ এএম, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সোমবার

তামনিয়া ইসলাম উত্তরা থেকে প্রতিদিন অফিস করেন মতিঝিলে। তিনি জানান, ‘আমি মেট্রোরেলে প্রতিদিন যাতায়াত করি। গত বৃহস্পতিবার মেয়েকে নিয়ে মেট্রোরেলে উঠেছিলাম। রাতে মা-মেয়ে দুজনেরই জ্বর আসে। আমার জ্বর দুই দিন পর মোটামুটি সেরে গেলেও, আমার ১০ বছর বয়সি মেয়ে এখনো জ্বরে ভুগছে, রবিবার থেকে চার বছর বয়সি ছোট মেয়ের জ্বর শুরু হয়েছে।’ 

তিনি বলেন, ‘আতঙ্কে আছি—বাচ্চাদের কেউ ডেঙ্গু বা হামে আক্রান্ত হলো কি-না!’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে সাধারণত মার্চ-এপ্রিল এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বর ভাইরাসের প্রকোপ বাড়ে। তারা বলছেন—হাম, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা, টাইফয়েড, মামস-সহ—অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস একই সময়ে ছড়াচ্ছে। এর মধ্যে ডেঙ্গু, ইনফ্লুয়েঞ্জা জ্বরের প্রধান কারণ। ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-এ আক্রান্ত হচ্ছে। ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা শহরে গণপরিবহন, স্কুল-কলেজ ও জনসমাগমের স্থানে হাঁচি-কাশির মাধ্যমে দ্রুত ভাইরাস ছড়াচ্ছে। ফলে ঘরে ঘরে বাড়ছে জ্বরের প্রকোপ।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগের সামনে গিয়ে দেখা যায়, ছোট শিশু ও তাদের বাবা-মায়েদের কোথাও জটলা, কোথাও বাচ্চা কোলে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। কথা বলে জানা যায়, বেশির ভাগ শিশুকে অভিভাবকরা এসেছেন শিশুর জ্বরের কারণে। বাচ্চাদের কারো নাক দিয়ে পানি পড়ছে, কেউ কাঁদছে, কেউ-বা কাঁধে মাথা রেখে নিস্তেজ হয়ে আছে। কারো শ্বাসকষ্ট, কারো কাশি—সকাল থেকেই পাঁচটি কাউন্টারে চিকিৎসকরা রোগী দেখছিলেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, অন্য সময় প্রতিদিন যেখানে সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত মেডিসিন বহির্বিভাগে গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ রোগী দেখা হতো। এখন সেখানে দ্বিগুণ রোগী আসছে। জরুরি বিভাগসহ বহির্বিভাগে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। তাদের ৬ থেকে ৮ শতাংশকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হচ্ছে। বাকিদের ব্যবস্থাপত্র দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

পাঁচ বছরের সাধিয়ার মুখ গলা ফুলে আছে, দুদিন ধরে জ্বরের কারণে কিছুই খেতে পারছিল না। অভিভাবকরা ভেবেছিল বাচ্চার টনসিল ফুলেছে। কিন্তু ডাক্তার দেখানোর পর জানতে পারেন শিশুটির সম্ভবত মামস হয়েছে। টেস্ট দিয়েছে, রিপোর্ট এলে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানান শিশুর বাবা।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা, কমন কোল্ড, টাইফয়েড, প্যারা-টাইফয়েড নিয়ে আসছে, তবে ডেঙ্গু জ্বরটাই নিয়ে বেশি রোগী আসছে। তবে যারা বয়স্ক, শ্বাসকষ্ট আছে শ্বাসনালির ইনফেকশন, ইউরিন ইনফেকশন—এসব নিয়ে বেশি রোগী আসছে। তবে টপে আছে ডেঙ্গু জ্বর আছে। ডেঙ্গু জ্বরের অধিকাংশ রোগীর ঘরে বসে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব। তবে যদি শিশু রোগী হয় অথবা কো-মরটিডিটি আছে, বয়স্কদের ক্ষেত্রে, যাদের ক্যানসার আছে, হাই ব্লাড প্রেসার আছে, এছাড়া লিভার-কিডনির রোগ আছে, অথবা গর্ভবতী নারী, অথবা যেসব ডেঙ্গু রোগী খেতে পারে না, বমি হয়, রক্ত-ক্ষরণ হচ্ছে— এ ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রে অবশ্যই হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দিতে হবে। তাদের ঘরে বসে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. কামরুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, সিজনাল জ্বর বা ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে জ্বর হচ্ছে। হামের জ্বর নিয়ে আসছে, হামটা অনেক বেশি এখন। যাদের হাম হয়ে গেছে, সেই শিশুরা আবার হাম পরবর্তী বিভিন্ন জটিলতায় জ্বর নিয়ে আসছে। এছাড়া এই সময় ভয়াবহ ডেঙ্গু জ্বর হচ্ছে, পাশাপাশি গরমের এই সময়ে টাইফয়েড জ্বর নিয়ে আসছে শিশুরা। ভাইরাল হেপাটাইটিস এ ভাইরাসজনিত জ্বর নিয়ে আসছে তারা। এছাড়া ফ্লুর ভাইরাসেও আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। তবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে হাম ও ডেঙ্গু জ্বরে। তৃতীয় কমন হচ্ছে টাইফয়েড জ্বর। এছাড়া মাম ভাইরাস দিয়ে মামস হচ্ছে শিশুদের, এতেও জ্বর হচ্ছে, টনসিলাইটিস, ফ্যারেঞ্জাইটিস হচ্ছে। কনজাংটিভাইটিসেও জ্বর নিয়ে আসছে, চোখে পিঁচুটি থাকছে। এছাড়া চিকনগুনিয়া জ্বর নিয়ে আসছে। এতে প্রচুর পরিমাণে জয়েন্টে ব্যথা নিয়ে আসছে।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, যদি জ্বরের সঙ্গে শরীরে র‌্যাশ থাকে, তাহলে শিশুকে বাসায় না রেখে হাসপাতালে ভর্তি করানোই ভালো। অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে যেন না মেশে, আইসোলেশন করতে হবে। পাশাপাশি শিশুকে তরল জাতীয় খাবার খাওয়াতে হবে। বাচ্চারা বুকের দুধ খাবে। জ্বরের ক্ষেত্রে শুধু প্যারাসিটামল খাওয়াতে হবে। কোনো প্রকার ব্যথার ওষুধ খাওয়ানো যাবে না। বেশি জ্বর হলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। 

সেপ্টেম্বরের ১৩ দিনে অর্ধশত মৃত্যু: ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে মারা গেছেন আরও ছয় জন। এ নিয়ে চলতি বছর মোট ১৪৯ জনের মৃত্যু হলো। তাদের মধ্যে ৫২ জনই মারা গেছেন চলতি সেপ্টেম্বর মাসের ১৩ দিনে। এছাড়া হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ১ হাজার ৫১৬ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৫১ হাজার ৮৩৭ জন। তাদের মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছে ৪৮ হাজার ৯৩ জন।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো ডেঙ্গু বিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানান হয়। এতে বলা হয়েছে শনিবার সকাল ৮টা থেকে রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টা সময়ের তথ্য জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। মোট মৃত্যু হওয়া ব্যক্তিদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৪৯ জনের মধ্যে ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ নারী এবং ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ।

হাম ও উপসর্গে মোট মৃত্যু ১০২২ শিশুর: হামের উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল ৮টা থেকে রবিবার সকাল ৮টা) সারা দেশে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৯০৫ জন এবং চলতি বছর ১৫ মার্চ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট হাম রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৭১ হাজার ৫৪৩ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা ৬৩ জন, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা ২০ হাজার ৬৯ জন। অন্যদিকে গত ১৫ মার্চ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হামের উপসর্গে মোট ৯২২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ১০০ শিশুর।