সোমবার   ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬   ভাদ্র ৩০ ১৪৩৩   ০১ রবিউস সানি ১৪৪৮

ডিজিটাল নিরাপত্তার মতোই হচ্ছে সাইবার সুরক্ষা আইন

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ১০:১৯ এএম, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সোমবার

সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের জন্য খসড়া প্রস্তুত করেছে সরকার। এতে মানহানির অপরাধে সাজা যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করা, গুজব-অপতথ্য ছড়ালে ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে খসড়ায়। এ রকম কিছু ধারা আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিরোধী দল ও নাগরিক সংগঠনগুলোও বলছে, খসড়ায় মানহানি, গুজব-অপতথ্যের যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে; এগুলোর অপব্যবহার হতে পারে।

আওয়ামী লীগ আমলের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মানহানির জন্য ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান ছিল। সমালোচনার মুখে সেই আইন বিলোপ করে সাইবার নিরাপত্তা আইন করা হয়। এতে জরিমানার বিধান থাকলেও কারাদণ্ড ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মানহানির অংশ বাদ দিয়ে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ করা হয়। বিএনপি সরকার সেই অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করলেও ছয় মাসের মাথায় এসে তা সংশোধন করে পাঁচ বছর কারাদণ্ডের বিধান করতে চাইছে। এ ছাড়া গুজব, অপতথ্য প্রচার করলে ১০ বছর কারাদণ্ডের প্রস্তাব রয়েছে সংশোধনীর খসড়ায়।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ইতোমধ্যে আইন সংশোধনের খসড়া প্রকাশে করেছে। এতে উদ্বেগ জানিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, খসড়াটি পাস হলে সাইবার জগৎ নিপীড়নের ভুবনে পরিণত হবে।

সাইবার সুরক্ষা আইনের এ সংশোধনী হলে তাতে মতপ্রকাশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছে গবেষণা সংস্থা টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট। সংস্থাটির মতে, সংশোধনীতে মানহানির সংজ্ঞা আগের চেয়ে আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। পাশাপাশি ২৫ ও ২৬ ধারায় ‘অবমাননা’, ‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’-সংক্রান্ত নতুন অপরাধ যুক্ত করা হয়েছে। এসব শব্দের সংজ্ঞা যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। ফলে কোনো বক্তব্য মানহানিকর, মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা গুজব কিনা, তা নির্ধারণে ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

খসড়ার বিষয়ে জানতে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে সমকাল। ফোনকল এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালেও তারা সাড়া দেননি। তথ্যপ্রযুক্তি সচিব মামুনুর রশীদ ভূঞার বক্তব্যও পায়নি সমকাল। 

জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সমকালকে বলেন, আইনের সংশোধনীর খসড়ার কথা বলা হচ্ছে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও প্রকাশ হয়নি। প্রকাশের পর এ বিষয়ে সরকার বক্তব্য জানাবে। 

তবে সরকারের একটি সূত্র সমকালকে জানিয়েছে, সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধন করে আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো মানহানিকর বক্তব্যের কারণে কারাদণ্ডের বিধান রাখার প্রশ্নে সরকারের মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে। কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী এ বিধানের পক্ষে। কিন্তু বিএনপির ৩১ দফা, নির্বাচনী ইশতেহার এবং দলের আগের অবস্থান বিপরীত হওয়ায় সরকারের অনেকে এমন সংশোধনীর বিপক্ষে। তাদের আশঙ্কা– মানহানি, হেয় প্রতিপন্ন, বুলিংয়ের মতো বিধান যুক্ত করলে এর অপব্যবহার হবে, যা সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করবে। প্রমাণিত গুজব, অপতথ্য প্রচারকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। তবে এ জন্য গুজব, অপতথ্য চিহ্নিত করার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি থাকতে হবে। 

শেখ হাসিনার শাসনামলে কঠোর আইন

২০০৬ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন করা হয়। ২০১৩ সালে আইনটি সংশোধন করে কঠোর করে আওয়ামী লীগ। মানহানি, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায়, এমন কিছু অনলাইনে লেখা, বলাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় ৫৭ ধারায়। সরকারের সমালোচকদের মামলা ও কারাগারে পাঠানোর কারণে ধারাটি ‘কুখ্যাত’ হয়ে ওঠে। 

দেশ-বিদেশে সমালোচনার মুখে আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের ২১ ধরায় মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে ‘প্রপাগান্ডা বা প্রচারণা’ চালালে ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান ছিল। ২০১৯ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকীতে বরিশালের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম শ্রদ্ধা জানানোর সময় বাম হাত দিয়ে ফুল ধরে ছবি তোলায় এক বছর কারাদণ্ড হয়।

মানহানির আসামি হয়েছিলেন তারেক রহমানও

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫ এবং ২৯ ধারায় অনলাইনে যে কোনো বক্তব্য, সংবাদ, লেখাকে আক্রমণাত্মক, মিথ্যা, মানহানিকর আখ্যা দিয়ে মামলার সুযোগ ছিল। মানহানিকর বক্তব্য দিয়েছেন– এ অভিযোগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি মামলা করেছিলেন ছাত্রলীগ নেতারা। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এই মামলায় অভিযোগপত্রও গৃহীত হয়েছিল। তারেক রহমান অনলাইনে বক্তব্যের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমানের অবমাননা এবং মানহানি করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়। 

দেশে-বিদেশে সমালোচনার মুখে ২০২৩ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বিলুপ্ত করে সাইবার নিরাপত্তা আইন করে আওয়ামী লীগ সরকার। এই আইনেও জাতির পিতাকে অবমাননা, কোনো ব্যক্তির সম্পর্কে মানহানিকর বক্তব্য, আক্রমণাত্মক বক্তব্যকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে ওই আইনে মানহানির জন্য ১০ বছর কারাদণ্ডের বদলে ২৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান করা হয়। 

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিজিটাল ও সাইবার নিরাপত্তা আইনে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৪৩৬টি মামলায় ৪ হাজার ৫২০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এসব মামলার ৬০ শতাংশের বাদী ছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য বা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। 

সিজিএস ৮৫৯টি মামলার বাদীর পরিচয় শনাক্ত করেছিল। ২৬৩টি মামলাই করেছিলেন তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা। শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়, ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপি, নেতাদের নিয়ে কটূক্তির মাধ্যমে মানহানি করার অভিযোগে এসব মামলায় ৮৮৭ জনকে আসামি করা হয়েছিল। অধিকাংশ আসামি ছিলেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। এর পরেই ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী এবং ফেসবুকের সাধারণ ব্যবহারকারীরা। 

‘শেখ হাসিনার বিধবা ভাতা পাওয়া উচিত’– ফেসবুকে এমন মন্তব্যের কারণে ২০২০ সালের জুনে ১৫ বছর বয়সী স্কুল শিক্ষার্থী মো. ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল আওয়ামী লীগ নেতাদের দায়ের করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায়।  

শেখ হাসিনা ও ব্যবসায়ী নাফিজ শারাফাতকে বিদ্রুপ করে আঁকা কার্টুন ফেসবুকে পোস্ট করায় ২০২০ সালের মে মাসে লেখক মুশতাক আহমেদকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করেছিল র‍্যাব। সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক কথাবার্তা ও গুজব ছড়ানোর মামলায় তাঁর জামিন আবেদন ছয়বার নাকচ হয়। ২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি কারাগারে তাঁর মৃত্যু হয়।

ফিরছে কারাদণ্ডের বিধান 

বিএনপির ৩১ দফায় মতপ্রকাশের সব বাধা অপসারণের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ১২ দফায় বলা হয়েছে,  মুক্ত চিন্তার পথ রুদ্ধ করে কিংবা ভিন্নমত দমন করতে ব্যবহার করা যায়– এমন সব ধরনের দমনমূলক ও কালো আইন সংস্কার বা বাতিল করা হবে। 

বিরোধী দলে থাকাকালে বিএনপি এই আইনগুলো নিপীড়নমূলক আখ্যা দিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল– ক্ষমতায় গেলে আইনগুলো বাতিল করবে। ২০২৫ সালের মে আসে অন্তর্বর্তী সরকার সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করে। গত এপ্রিলে বিএনপি সরকার অধ্যাদেশটিকে হুবহু আইনে পরিণত করে। 

এই আইনে মানহানি, কটূক্তি, অবমাননার জন্য শাস্তির বিধান নেই। এই আইনে শুধু ভুক্তভোগী বা তাঁর ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি কিংবা পুলিশ মামলা করতে পারে। এই আইনে সাইবার স্পেসে জালিয়াতির অপরাধ, প্রতারণা, হ্যাকিং, সন্ত্রাসী কার্য, কর্তৃত্ব বহির্ভূত ই-ট্রানজেকশন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং বা অশ্লীল বিষয়বস্তু প্রকাশ; সাইবার স্পেসে ধর্মীয় বা জাতিগত বিষয়ে সহিংসতা, ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক তথ্য প্রকাশও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দুই থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে এসব অপরাধে। 

সংশোধনীর খসড়ায় বিদ্যমান আইনের ২৫(১) ধারায় ‘মানহানি বা হেয় প্রতিপন্ন বা বুলিং’ শব্দ তিনটি যোগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যমান আইনে এ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি সাইবার স্পেস অন্য কোনো ব্যক্তিকে ব্ল্যাকমেইলিং বা যৌন হয়রানি বা রিভেঞ্জ পর্ন বা ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়নে কনটেন্ট রাখে, যা প্রকাশ, প্রচারের হুমকি দেন বা যা ক্ষতিকর বা ভীতি প্রদর্শক, তাহলে তা অপরাধ হবে। এর সঙ্গে ‘মানহানি বা হেয় প্রতিপন্ন বা বুলিং’ শব্দগুলো যুক্ত করা হয়েছে খসড়ায়। 

মানহানির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় বর্ণিত ব্যাখ্যা প্রযোজ্য হবে। কোনো ব্যক্তির সুনাম, মর্যাদা বা চরিত্র ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে প্রচারিত বা প্রদর্শিত এমন যে কোনো তথ্য, উপাত্ত, বক্তব্য, অডিও, ভিডিও, অডিও-ভিজুয়াল চিত্র, স্থিরচিত্র বা গ্রাফিক্সও অন্তর্ভুক্ত হবে। যা মিথ্যা, বিকৃত, বিভ্রান্তিকর, অপমানজনক বা ক্ষতিকর এবং যা ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণকৃত, সম্পাদিত বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি। 

২০১৮ সালে কোটাবিরোধী আন্দোলনে শেখ হাসিনার কার্টুন শেয়ার করায় মানহানির অভিযোগে আটক হয়েছিলেন ভয়েস ফর রিফর্মের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর। তিনি সমকালকে বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইনে মানহানির অংশ যুক্ত করার প্রয়োজনই নেই। এ আইনটি হচ্ছে হ্যাঙ্কিং প্রতিরোধ, লেনদেন নিরাপদ রাখা সংক্রান্ত। মানহানির বিচারের জন্য ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি রয়েছে। কারও মানহানি হলে সেই আইনই বিচারের জন্য যথেষ্ট। সাইবার সুরক্ষায় তা যুক্ত করা হলে অবশ্যই আগের মতো অপব্যবহার হবে। কারণ অনলাইনের কোন লেখা, ভিডিও, কার্টুনে মানহানি হয়– তা ব্যাখ্যা দিয়ে স্পষ্ট করা যাবে না।

গুজব অপতথ্যের জন্য ১০ বছর সাজা

সংশোধনীর খসড়ায় হেয় প্রতিপন্নের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির মর্যাদা, সম্মান, সুনাম বা সামাজিক অবস্থানকে কোনো কথা, আচরণ, প্রকাশনা, ইঙ্গিত বা কার্যকলাপের মাধ্যমে ক্ষুণ্ন করা, যা ওই ব্যক্তি অন্যের কাছে অপমানিত, তুচ্ছ, নিকৃষ্ট বা অসম্মানজনক করে তোলে। 

ফাহিম মাশরুর সমকালকে বলেন, এ ব্যাখ্যা বিপজ্জনক। কারণ একজন দুর্নীতিবাজ ব্যক্তির বিরুদ্ধে যদি অপকর্মের তথ্য অনলাইনে উন্মোচিত হয়, তাহলে তিনি হেয় প্রতিপন্ন বোধ করার দাবি করে মামলা করে দিতে পারেন। 

বুলিংরের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ইচ্ছাকৃত, পরিকল্পিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ বা কাজ দ্বারা কাউকে শারীরিক, মৌখিক, সামাজিক, ডিজিটাল বা অন্য কোনো মাধ্যমে শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি বা পীড়ার শিকার করা। 

সাইবার সুরক্ষা আইনে ২৬(ক) ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে সংশোধনীর খসড়ায়। এতে বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি সাইবার স্পেসে গুজব ও অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড হবে। 

গুজের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এমন কোনো অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবি, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে বা করবার সম্ভাবনা রাখে। অপতথ্যের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, কোনো মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য, যা ব্যক্তি, জনসাধারণ, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত, প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি। 

বিরোধী দল এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা নাগরিক সংগঠনগুলো বলছে, এমন ব্যাখ্যা রাখলে যে কোনো কিছুকে গুজব বলা যাবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন মানবাধিকারকর্মী সমকালকে বলেন, সম্প্রতি বাগেরহাটের মোংলায় মিরাজ শেখ নামে এক তরুণকে গুমের অভিযোগ উঠেছে কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে। এ অভিযোগ কোনো আদালতে প্রমাণ হয়নি। কিন্তু অনেক প্রত্যক্ষদর্শী রয়েছেন। যাদের বক্তব্য আবার সরকার সত্য বলে মানছে না। তাহলে সাইবার সুরক্ষা আইন যেভাবে সংশোধন করা হচ্ছে, তাতে বলা যাবে– মিরাজ শেখের গুমের গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এটি বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করবে মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে। 

প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে গালাগাল করা, কুৎসার বিরুদ্ধে সংসদে সরব হয়েছেন সদস্যরা। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও এ ইস্যুতে সরকারকে সমর্থন করার কথা বলেন। 

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সমকালকে বলেন, কারও ব্যক্তিজীবন নিয়ে নোংরা কুৎসা রটনা করলে তা শাস্তির আওতায় আসতে পারে। কিন্তু সাইবার সুরক্ষা আইন যেভাবে সংশোধন করা হচ্ছে, তাহলে বাকস্বাধীনতা থাকবে না। 

হামিদুর রহমান বলেন, শেখ হাসিনার স্বৈরাচার হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। ভিন্নমতকে যখন তখন দমন করা হয়েছে মানহানির নাম দিয়ে। বর্তমান সরকার সেই পথেই যাচ্ছে। এটা জনগণ মানবে না। প্রতিহত করতে বাধ্য হবে। তাই সরকারের উচিত ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার চেষ্টা থেকে বিরত থাকা। 

বিদ্যমান আইনের ১২ ধারায় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল রয়েছে। সংশোধনীতে কাউন্সিলে স্বরাষ্ট্র এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সদস্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। 

সংশোধনীর মাধ্যমে ৮ ধারায় নতুন বিধান যুক্তের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যমান আইনে নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন হলে সরকার কোনো কনটেন্ট ব্লক করতে পারে। সংশোধনীতে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন হবে আশঙ্কা থাকলেও কনটেন্ট ব্লক করতে পারবে সরকার। তবে জানাতে হবে না– কী কারণে কোন কোন কনটেন্ট ব্লক করা হয়েছে।

তবে সংশোধনীতেও বহাল থাকছে, শুধু সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি, তার প্রতিনিধি বা পুলিশ মামলা করতে পারবে এই আইনে। কোনো মন্ত্রী, এমপিকে কটূক্তি করেছে অভিযোগে অন্য কেউ মামলা করতে পারবে না। এই আইনের সব মামলা জামিনযোগ্য থাকছে।