বৃহস্পতিবার   ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬   ভাদ্র ২৫ ১৪৩৩   ২৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

সার সংকট নিয়ে উদ্বেগ সংসদে

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০৭:৪৫ এএম, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বৃহস্পতিবার

 

সার সংকট নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা হয়েছে। সরকারি দল দাবি করেছে, দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই, বরং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত মজুত রয়েছে। স্বৈরাচার আমলের ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। অপরদিকে বিরোধী দল বলেছে, সরকার দাবি করছে সারের অতিরিক্ত মজুত আছে। অথচ কৃষকরা সার পাচ্ছেন না, তাদের কালোবাজারে যেতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে কৃষকরা গুদাম লুট করেছেন। বিজিবি দিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। মজুত থাকার পরও এই হাহাকারের দায় সম্পূর্ণ সরকারের। 

বুধবার জাতীয় সংসদে ‘দেশজুড়ে তীব্র সার সংকটে সম্ভাব্য খাদ্য সংকটের ঝুঁকি নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা এসব কথা বলেন। জামায়াতের সংসদ-সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান এটি উত্থাপন করেন। 

নজিবুর রহমান বলেন, দেশে চলমান সার সংকট মূলত মজুতের কোনো সমস্যা নয়, বরং এটি সরকারের চরম ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও হরিলুটের অপচেষ্টার ফল। ভর্তুকির সার মিয়ানমারে পাচার হয়ে তার বদলে দেশে ইয়াবা আসার খবরে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এটি দেশের জন্য চরম সর্বনাশ ডেকে আনছে। নাজিবুর রহমান বলেন, জ্বালানি সংকট যখন শুরু হলো তখন সরকার বলেছিল দেশে কোথাও লোডশেডিং নেই। পরে তারাই জানাল জ্বালানি সংকট নিয়ে দিনগোনা ছাড়া কিছুই করার নেই। এখন সারের মজুত নিয়ে সরকারের কথা আমরা বিশ্বাস করব নাকি অবিশ্বাস করব-প্রশ্ন রাখেন তিনি। 

নজিবুর রহমান বলেন, সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতা নির্ভর করে ব্যবস্থাপনার ওপর। সার কারখানা বন্ধ রেখে জনগণের টাকায় বেশি দামে সার কিনছেন, আর বলছেন মজুত আছে। অথচ কৃষকের হাতে পৌঁছাচ্ছে না। এটাই সরকারের চরম ব্যর্থতা। নতুন ডিলার নিয়োগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী আমলের ডিলারদের বাদ দিচ্ছেন ঠিক আছে, কিন্তু লাখ লাখ টাকা নিয়ে নতুন করে যেসব দলীয় লোককে ডিলার নিয়োগ দিচ্ছেন, তাদের করা দুর্নীতির দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে।

জবাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, সারের কোনো ঘাটতি নেই, বরং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত মজুত রয়েছে। তিনি দাবি করেন, বিগত স্বৈরাচার সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া ডিলাররাই সরকারকে হেয় করতে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে। সংকট নিরসনে সরকার সারা দেশে নতুন করে প্রায় পাঁচ হাজার ডিলার এবং তাদের অধীনে আরও ১৬ হাজার খুচরা ডিলার নিয়োগ দিচ্ছে। 

প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্বৈরাচার সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া ৩ হাজার ৭৫৯ জন সারের ডিলার বর্তমানে পলাতক থাকায় ওই পয়েন্টগুলো শূন্য রয়েছে। সারের সাপ্লাই চেইন ও বিতরণ প্রক্রিয়া যাতে ব্যাহত না হয়, সেজন্য নতুন নিয়োগের উদ্যোগ। কমবেশি ৪ হাজার ৯১৮ জন নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে। তারা প্রত্যেকে আবার দুটি করে খুচরা ডিলার নিয়োগ করতে পারবেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে সারের দাম কম হওয়ায় পার্শ্ববর্তী ভারত ও মিয়ানমারে সার পাচারের কিছু তথ্য প্রশাসনের কাছে এসেছে। সার মনিটরিং কমিটিতে সংসদ-সদস্যদের না রাখার বিষয়ে বিরোধী দলের ক্ষোভের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সার বিতরণের দায়িত্ব সংসদ-সদস্যরা নিতে চান না, ট্রেজারি বেঞ্চের আমরাও নিতে চাই না। তাহলে সার বিতরণ ডিলাররাই নিয়মমাফিক করবে। 

জামায়াতের সংসদ-সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, সরকার বলছে সারের জোয়ারে দেশ ভাসছে। অথচ কৃষকরা ন্যায্যমূল্যের চেয়ে ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনছেন। সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানার ছয়টিই বন্ধ। মন্ত্রীর ব্যক্তিগত গোডাউন সারে ভর্তি। ভর্তুকির সার মিয়ানমারে পাচার হয়ে যাচ্ছে এবং এর বিনিময়ে দেশে ঢুকছে আইস ও ইয়াবার মতো ভয়ংকর মাদক। 

শফিকুল ইসলাম মাসুদ ডিলার নিয়োগে চরম দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বলেন, ডিলার নিয়োগে এখন ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা ঘুস লেনদেন হচ্ছে। বিগত ১৭ বছর ধরে জেঁকে বসা চক্রের সঙ্গে মিলে এক ডিলার নিজ নামে, স্ত্রীর নামে, ছেলে-মেয়ের নামে ডিলারশিপ নিচ্ছেন। খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৫০ কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। তিনি বলেন, মাথা থেকে দুর্নীতি ও দলীয়করণ দূর করা না গেলে শুধু গাছের পাতা ছিঁড়ে দেশ ভালো করা যাবে না। 

সার সংকটের কারণে আগামী রবি ও বোরো মৌসুমে দেশ মারাত্মক খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন জামায়াতের সংসদ-সদস্য ব্যারিস্টার মো. মাহবুবুল আলম। তিনি বলেন, কালোবাজারি রুখতে, ডিলারদের সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং কৃষকের ঘরে ঘরে সার পৌঁছে দিতে সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।