‘আমি এখন কাকে মা বলে ডাকব’
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০৮:০৯ এএম, ৩০ আগস্ট ২০২৬ রোববার
চোখের চিকিৎসা করাতে স্বামীর সঙ্গে বগুড়া থেকে ঢাকায় গিয়েছিলেন রনজিলা পারভীন রুলি (৫৩)। স্বপ্ন ছিল চিকিৎসা শেষে শনিবারই মেয়ের কাছে ফিরে আসবেন। কিন্তু ছিনতাইকারীদের টানে রিকশা থেকে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। এখন মায়ের মরদেহের অপেক্ষায় একমাত্র মেয়ে রাইসা আক্তার। বারবার ‘মা মা’ বলে আহাজারি করতে করতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে সে।
শনিবার রাতে ঢাকায় রুলির মৃত্যুর খবর বগুড়ার রহমাননগরের বাসায় পৌঁছালে সেখানে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজনরা ঢাকার পথে রওনা দেন। আর বাড়িতে রাইসাকে ঘিরে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা।
রাইসা কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘আমার মা আমাকে ছাড়া থাকতে পারত না, আমিও আমার মাকে ছাড়া থাকতে পারি না। আমি মায়ের সঙ্গে যেতে চেয়েছিলাম। মা বলেছিল, আমি একদিনের মধ্যেই ফিরে আসব। তুমি কোনো চিন্তা করো না। সেই মা আর আমাদের মাঝে আসবে না। আমি এখন কাকে মা বলে ডাকব।’
রুলির মা জোবেদা খাতুন বলেন, ‘আমার তিন মেয়ের মধ্যে মেঝ মেয়ে রুলি আমাকে খুব ভালোবাসত। স্কুল ছুটি হলেই আমাকে দেখতে যেত। আজ আর সে আমাদের মাঝে নেই। তার একমাত্র মেয়ে রাইসা অল্প বয়সে মাকে হারাল। আমরা ওই ছিনতাইকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে শাস্তির দাবি করছি।’
নিহতের স্বামী আব্দুল মতিন বলেন, ‘যারা আমার মেয়েকে মা-হারা করেছে, তাদের ফাঁসি চাই। আমার মতো আর কোনো পিতা ও স্বামী যেন এমন নির্মম ঘটনার শিকার না হন।’
রুলির বড় ভাই জাহিদুল ইসলাম বলেন, পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তাঁর বোন ছিলেন খুবই নিরীহ প্রকৃতির। কারও সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ করতেন না। বিভিন্ন সময়ে তাঁদের সহায়তা করতেন এবং ভালো কাজের পরামর্শ দিতেন।
স্বজনরা জানান, চোখের চিকিৎসার জন্য শুক্রবার রাতে স্বামী আব্দুল মতিনের সঙ্গে শ্যামলী পরিবহনের একটি কোচে বগুড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন রুলি। শনিবার ভোরে ঢাকায় পৌঁছে কল্যাণপুর থেকে রিকশায় করে ফার্মগেটের ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে যাচ্ছিলেন তাঁরা।
সংসদ ভবন এলাকায় পৌঁছালে মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তি রুলির হাতে থাকা ব্যাগ টান দিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় রিকশা থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। পরে তাঁকে উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
রুলির ভাই জাহিদুল ইসলাম জানান, ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের কথা রয়েছে। শনিবার রাত ৮টার দিকে নিহতের স্বামী আব্দুল মতিন জানান, মরদেহ নিয়ে তাঁরা ঢাকা থেকে বগুড়ার উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। রাত ৮টার দিকে তাঁরা গাজীপুরে পৌঁছেছেন।
রনজিলা পারভীন রুলি গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তাঁর বাড়ি উপজেলার তরফসরতাজ মধ্যেপাড়া গ্রামে। তিনি সোনাকানিয়া গ্রামের ময়েজ উদ্দিনের মেয়ে। স্বামী ও একমাত্র মেয়ে রাইসাকে নিয়ে বগুড়া শহরের রহমাননগর এলাকায় বসবাস করতেন।
নিহতের স্বামী নিউমার্কেট এলাকায় তৈরি পোশাকের ব্যবসা করেন। তাঁদের একমাত্র মেয়ে রাইসা নবম শ্রেণিতে পড়ছে।
গাবতলী উপজেলার সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ইদ্রিস আলী প্রামাণিক জানান, রনজিলা পারভীন ১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। পরে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পেয়ে বাগবাড়ি সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেন। তিনি একজন ভালো শিক্ষক ছিলেন।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রায়হান আলী বলেন, ‘বেশ কিছুদিন ধরে ম্যাডাম চোখের সমস্যায় ভুগছিলেন। বগুড়ায় একাধিক চিকিৎসক দেখিয়েছেন, কিন্তু ভালো হচ্ছিল না। আমরা তাঁকে ঢাকায় যেতে বলেছিলাম। তিনি ছুটি নিতে চাচ্ছিলেন না, প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হবে মনে করতেন। আমাদের পীড়াপীড়িতে ছুটি না নিয়েই ঢাকায় গিয়ে চোখ দেখিয়ে শনিবারই ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর আর ফেরা হলো না।’
