শনিবার   ২৯ আগস্ট ২০২৬   ভাদ্র ১৩ ১৪৩৩   ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

দোলাচলে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক

মাসুদ করিম, ঢাকা থেকে

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০১:৪২ এএম, ২৯ আগস্ট ২০২৬ শনিবার


 
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে দোলাচল দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিবেশি দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নতি হবে বলে আশা করা হয়েছিলো। কিন্তু বাস্তবে সম্পর্কে দ্বিধা, আস্থাহীনতা এবং অবিশ্বাসের কারণে সম্পর্কে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের পারদ উঠানামা করছে কয়েক মাসধরে। কখনই একক নেতৃত্বে সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। আবার কখনও সম্পর্ক নীচে নেমেছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক খুবই নাজুক ছিলো। সবাই আশা করেছিলো যে, তারেক রহমানের নেতৃত্ব নির্বাচিত সরকার সম্পর্কের উন্নতি ঘটাবে। কারণ মরহুমা প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুব্রমনিয়াম জয়শঙ্কর অংশ নেন। বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা অংশ নেন। তার জবাবে কিছুদিনের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা (বর্তমানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১) হুমায়ুন কবির ভারত সফর করেন। এছাড়াও, বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা ভারত সফর করেন। এসব যোগাযোগের মাধ্যমে এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, দুই দেশের সম্পর্ক ভাল হতে চলেছে। তার একটা প্রতিষ্ঠিত সরকার দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ককে উন্নতির দিকে নিয়ে যাবে।
এই পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী প্রথম সফরে ভারত যাবে কিনা তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। অনেকে বিশ্বাস করেছিলেন যে, প্রধানমন্ত্রী প্রথম সফরে ভারতই যাবেন। তবে ওই সময়ে চীন সফরে যাবার জন্যেও আমন্ত্রণ ছিলো। আঞ্চলিকভাবে ভারত তারেক রহমানকে সফরে নেবার জন্যে মরিয়া হয়ে ওঠে। তখন প্রধানমন্ত্রী ভারত ও চীন কোনও দেশে না গিয়ে মালয়েশিয়া প্রথম সফর করেন। তারপর চীনের দালিয়ান নগরীতে অনুষ্ঠিত সামার দাভসখ্যাত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে অংশ নেন। এওটা একটা বহুপক্ষীয় সম্মেলন। বহুপক্ষীয় সম্মেলনে যোগদান শেষে সুযোগমত ওই সফরকে দ্বিপক্ষীয় সফরে রুপান্তরিত করেন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
চীনে সফর শেষ করার পর ভারত আরও মরিয়া হয়ে ওঠে। তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্যে তখন কয়েক সপ্তাহ ধরে কাজ করছিলেন দুই দেশের কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার বাংলাদেশ ত্যাগ করার বার্ষিকী ছিলো। অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিবসটি উদযাপনের প্রাক্কালে শেখ হাসিনা তার ভয়েসের মাধ্যমে মিডিয়ার সামনে কথা বলেন। ভারতের মাটিতে বসে এমন রাজনৈতিক কর্মকান্ডে বাংলাদেশ মারাত্মক ক্ষুব্ধ হয়। বাংলাদেশ কড়া ভাষায় তার প্রতিবাদ জানায়। সম্পর্ক এতটাই খারাপ হয় যে, চূড়ান্ত হয়ে যাওয়া একটি সফর অনিশ্চিত হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে বলা হয় যে, অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হলে তারেক রহমান ভারত সফর করবেন। পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে শেখ হাসিনাকে প্রত্যাবাসন করতে হবে। এবং ওসমান হাদীর খুনিদের বাংলাদেশের কাছে ফেরত দিতে হবে।
বাংলাদেশের এই বক্তব্যের বিষয়ে ভারত নিশ্চুপ। তারা শুধু বলছে, শেখ হাসিনার প্রেস মিট করেছে একটি বেসরকারী গোষ্ঠী। তাছাড়া, শেখ হাসিনার বক্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকার একমত নয়। ভারতের এই যুক্তি বাংলাদেশ সরকার মানতে পারছে না। বাংলাদেশ মনে করে, ভারতের সরকারের তত্ত্বাবধানে থেকে এই ধরনের তৎপরতার দায় ভারতের সরকার অস্বীকার করতে পারেনা। এই দায় ভারতের আছে।
এদিকে, গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক একটি সামরিক চুক্তি করেছে। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নামের এই চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দিতে পারে বলে ঘোষণার পর ভারতে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। চুক্তিটিতে বলা হয়েছে যে, এই চুক্তিতে সই করা যে কোনও দেশ আক্রান্ত হলে তিনটি দেশই আক্রান্ত বলে মনে করা হবে। এটাকে তাই মুসলিম ন্যাটো নামে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশকে এখনও তিনটি দেশের তরফে জোটে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তবে বাংলাদেশ জোটে যোগ দিলে ভারত নাখোশ হতে পারে। কারণ ভারত যদি পাকিস্তানে আক্রমন করে তবে চুক্তির ধারা মোতাবেক, বাংলাদেশও আক্রান্ত বলে গণ্য করা হবে। মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দেয় কিনা সেদিকে ভারত লক্ষ্য রাখছে।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বাংলাদেশ চীন থেকে জে-১০ সিই নামের যুদ্ধ বিমান ক্রয় করবে। এসব ফাইটার ভারতের পাকিস্তান আক্রমনের সময় রাফাল যুদ্ধবিমান ডাউন করেছিল বলে জাহেদ উর রহমান উল্লেখ করেন। সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন দোলাচলে।