মঙ্গলবার   ২৫ আগস্ট ২০২৬   ভাদ্র ৯ ১৪৩৩   ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

‘এক ফোঁটা তেলও রপ্তানি হবে না’

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ১২:১৭ এএম, ২৫ আগস্ট ২০২৬ মঙ্গলবার

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদের লক্ষ্য করে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ শুরু করার ঘোষণার জবাবে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে তেহরান রোববার (২৩ আগস্ট) জানিয়েছে, এই অর্থনৈতিক আক্রমণ অব্যাহত থাকলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এক ফোঁটা তেলও রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে। এবার আরও কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। রবিবার ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে তিনি লেখেন, ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হচ্ছে এক অর্থনৈতিক ডি-ডে—কোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এ যাবৎকালের সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক আঘাত।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সরাসরি সামরিক হামলা থেকে বিরত থাকলেও ছয় মাস ধরে চলা এই সংঘাতের অবসানে কোনো কার্যকর আলোচনা হয়নি। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। হামলায় ইরানের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অর্থনীতিতেও আঘাত এসেছে।

তবুও ইরান এখনও উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালানো এবং হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজের জন্য হুমকি তৈরির সক্ষমতা ধরে রেখেছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় চাপ তৈরি হয়েছে।

বেসেন্ট সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপের বিস্তারিত না বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যেসব দেশ ইরানের অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থেকে ‘তোষণ নীতি’ অবলম্বন করছে, তাদেরকেই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হবে।

ইরানও কয়েক দিন ধরে এই নিষেধাজ্ঞার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং কড়া বিবৃতি দিয়ে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। রোববার সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহসেন রেজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, এই অর্থনৈতিক যুদ্ধ চলতে থাকলে হরমুজ প্রণালি কিংবা পারস্য উপসাগরের কোনো জায়গা দিয়েই এক ফোঁটা তেলও রপ্তানি হবে না। তিনি আরও বলেন, ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে আমেরিকার অর্থনৈতিক যুদ্ধে কোনো দেশের অংশগ্রহণ বা সমর্থনকে ইরান যুদ্ধ ঘোষণার শামিল বলে গণ্য করবে।

এর আগে বেসেন্ট চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, চীনের মোট তেল আমদানির অর্ধেক আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। কিন্তু ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র এর জবাবে বলেন, নিষেধাজ্ঞা ও চাপ প্রয়োগ সমস্যার সমাধান করতে পারে না। তিনি কূটনৈতিক আলোচনার আহ্বান জানান।

আগে থেকেই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি চাপে ছিল। এখন চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তেহরান প্রকাশ্যে অনমনীয় অবস্থান বজায় রাখলেও ইরানি কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে নতুন অর্থনৈতিক শাস্তিমূলক পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়াতে পারে এবং নতুন করে অসন্তোষ উসকে দিতে পারে।

যুদ্ধের আগেই ইরানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, জ্বালানি সংকট এবং কাঠামোগত দুর্বলতা ছিল। এখন এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো, বিঘ্নিত বাণিজ্য, উৎপাদন ক্ষতি এবং যুদ্ধপরবর্তী পুনর্গঠনের ব্যয়ভার।

গত জুনে সুইজারল্যান্ডে শেষ বৈঠকের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। এই অচলাবস্থার মধ্যে কাতার, পাকিস্তান ও তুরস্কসহ কয়েকটি দেশ কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করছে।

ইরান জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা পুনরুদ্ধারের অংশ হিসেবে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির সোমবার তেহরান সফর করবেন। সফরের বিস্তারিত তথ্য এখনও জানা যায়নি। পাকিস্তান এই সংঘাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। দেশটির সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকিসহ সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করবেন জেনারেল মুনির।

যুদ্ধ চলাকালে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং লেবাননে ইসরায়েলি আক্রমণে হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ১৮ জন সেনা নিহত এবং ৭৫০ জনেরও বেশি আহত হওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে।

সূত্র: রয়টার্স