রোববার   ২৩ আগস্ট ২০২৬   ভাদ্র ৭ ১৪৩৩   ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্তারাই ভূমিখেকো

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০৭:৫৮ এএম, ২৩ আগস্ট ২০২৬ রোববার

সরকারের সম্পদ রক্ষা করা যাদের দায়িত্ব, সেই ভূমি মন্ত্রণালয়ের একদল কর্মকর্তা-কর্মচারীই আবির্ভূত হয়েছেন ভক্ষকের ভূমিকায়। ঢাকার বুকে সরকার যখন জনস্বার্থমুখী প্রকল্পের জন্য এক টুকরো জমি পেতে হিমশিম খাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের এ ‘ভূমিখেকো’ চক্রটি যোগসাজশ করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ২৭ একর বা ৮২ বিঘা জমি লিখে নিয়েছে নিজেদের নামে। এর মধ্যে ১৬ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে চক্রটির গড়ে তোলা একটি সমিতির নামে। বাকি ১১ একর নেওয়া হয়েছে সমিতির নামে লিজ হিসেবে। ‘স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন, ২০১৭’ এবং সরকারি চাকরিজীবী আচরণ বিধিমালাকে সম্পূর্ণ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, কোনো প্রকার ব্যক্তিস্বার্থ বা সমিতির জন্য খাসজমি বরাদ্দ নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও, সচিবকে ‘প্রধান উপদেষ্টা’ বানিয়ে জমি হরিলুটের এ মহোৎসব চালিয়েছেন মন্ত্রণালয়েরই কর্মকর্তারা।

জানা যায়, ২০১৪ সালের পুরোনো রেট দেখিয়ে মাত্র ১০৫ কোটি টাকায় এ বিপুল সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ করা হয়েছে, যেখানে দশম গ্রেডের ১৬ হাজার টাকা স্কেলের কর্মচারীদের শতকোটি টাকার অর্থের উৎস নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। এখানেই শেষ নয়, পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের তোয়াক্কা না করে ড্রেজার বসিয়ে ঢাকার প্রাকৃতিক জলাধার ও প্লাবনভূমি ভরাট করে পরিবেশকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে চরম বিপর্যয়ের মুখে। অসাধু কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেটের এ অভিনব দুর্নীতি শুধু রাষ্ট্রের বিপুল আর্থিক ক্ষতিই করেনি; বরং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও জালিয়াতির এক জঘন্যতম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তথ্য বলছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৫৩ ও ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের ধউর মৌজায় সরকারের ৫০ একরের মতো খাসজমি রয়েছে। এর মধ্যে ১৬ একর জমি অধিগ্রহণের নামে পকেটস্থ করেছে কর্মচারীদের সমিতি। ১১ একর নেওয়া হয়েছে লিজ। এর বাইরে এখনো সরকারের যে জমিটুকু অবশিষ্ট রয়েছে, সেই জমিও নিজেদের নামে নিতে নানা অপচেষ্টা চলছে বলে নিশ্চিত করেছে মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র। সমিতির আবাসন প্রকল্প এলাকায় প্রতি শতাংশ জমির স্থানীয় দাম প্রায় ৩০ লাখ টাকা। সেই হিসাবে ১৬ একর জমির দাম পড়ে ৪৮০ কোটি টাকা। আর সরকারি রেটে প্রতি শতাংশ ৬ লাখ ৪৫ হাজার ১০০ টাকা। সরকারি জমি ব্যক্তিমালিকানা বা সমিতির নামে অধিগ্রহণে প্রকৃত জমির মূল্যের তিনগুণ পরিশোধ করতে হয়। এতে শতাংশ ১৯ লাখ ৩৫ হাজার ৩০০ টাকা পড়ে। ১৬ একর খাসজমি অধিগ্রহণে ৩০৯ কোটি ৬৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা লাগে। সেখানে ভূমি মন্ত্রণালয় কর্মকর্তা ও কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড ২০২৪ সালে ১৬ একর জমি ১০৫ কোটি ৭১ লাখ টাকায় অধিগ্রহণ করেছে। যদিও সমিতির দাবি, জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া ২০১৪ সালে শুরু হয়েছিল; কিন্তু ৩ ধারার নোটিশের কারণে অধিগ্রহণ সম্ভব হয়নি। সেই আইন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ২০১৪ সালের রেটে জমির প্রকৃত মূল্যের দেড়গুণ বেশি দিয়ে অধিগ্রহণ করা হয়েছে।

অধিগ্রহণ আইন (স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন, ২০১৭) শুধু জনস্বার্থমূলক কাজের জন্য প্রযোজ্য। কোনো ব্যক্তির নিজ নামে খাসজমি অধিগ্রহণ করার আইনি সুযোগ নেই। সরকারি চাকরিজীবীদের খাসজমি অধিগ্রহণ তো দূরের কথা, বন্দোবস্তেরও সুযোগ নেই। সরকারি চাকরিজীবী আচরণবিধিমালায় সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য যে কোনো সরকারি সম্পদ বা জমি ব্যক্তিগত সুবিধা বা লাভের জন্য গ্রহণ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সরকারি পদে থেকে খাসজমি নিজের বা কল্যাণ সমিতি, অফিসার্স ক্লাব বা সমবায় সমিতির নামে বরাদ্দ নেওয়া স্বার্থের সংঘাত এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ও দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

হাইকোর্টের একাধিক রায়ে বলা হয়েছে, ‘সরকারি সম্পত্তি বা খাসজমি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত বা সমিতির স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ নেই।’ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সমিতির নামে খাসজমি লিখে নিলে দুর্নীতি দমন কমিশন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে। এ ছাড়া সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে—‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।’ উচ্চ আদালত এ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যায় বলেন, সরকারি পদের সুবাদে কর্মকর্তারা যে খাসজমির ওপর প্রশাসনিক কর্তৃত্ব পান, তা জনগণের কল্যাণে রক্ষা করার জন্য, নিজেদের গঠিত সমিতির স্বার্থে ব্যবহার বা ভোগদখল করার জন্য নয়।

এ ছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০ অনুযায়ী, যে কোনো জলাশয়, প্লাবনভূমি বা নিচু জমি ভরাট করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ।

সরেজমিন দেখা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাধীন ৫৩ ও ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের তুরাগ থানার ধউর মৌজায় কয়েকটি ড্রেজার বসিয়ে নিচু এলাকা ও জলাশয় নির্বিচারে বালু ভরাট করা হচ্ছে। যে অংশগুলোতে একসময় বর্ষার পানি জমে থাকত এবং যা এলাকার প্রাকৃতিক জলধারা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার মূল উৎস হিসেবে কাজ করত, সেগুলোকে বালুর স্তূপে পরিণত হয়েছে। এই কার্যক্রমের সঙ্গে ভূমি মন্ত্রণালয়, ভূমি অধিদপ্তর, এসিল্যান্ড অফিস ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরাসরি জড়িত। ভূমি মন্ত্রণালয়ের সমিতির নামে প্লাবনভূমি বালু দিয়ে ভরাটের এই মহোৎসব চলছে। স্থানীয়রা বলছে, এভাবে চলতে থাকলে আগামী বর্ষায় তাদের ঘরবাড়িতে পানি উঠে যাবে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ধউর মৌজার ৩ নম্বর জেএল-এর অন্তর্গত ১৯৯২ ও ১ নম্বর খতিয়ানের মোট ৩৮টি সিটি দাগে সর্বমোট ১৬ দশমিক ৩৫৮২ একর জমি ২০২৪ সালে ভূমি মন্ত্রণালয় কর্মকর্তা ও কর্মচারী সমবায় সমিতি লিমিটেডের অনুকূলে অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়। এ সময়ে ঢাকার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ছিলেন আনিসুর রহমান। তবে ৫০ শতাংশের অধিক জমি হওয়ায় আইনি প্রক্রিয়া অনুসারে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব এটি চূড়ান্ত অনুমোদন দেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, এসিল্যান্ড, জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় প্রশাসনের দাপটে একটি চক্র পরস্পর যোগসাজশে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে খাসজমি দলিল করে অধিগ্রহণের ব্যবস্থা করে নিয়েছে। তারা প্রশ্ন তুলে বলেন, সরকারের বেতনভুক্ত চাকরিজীবী যখন এভাবে খাসজমি অধিগ্রহণ করে নেয়, তখন নিয়মনীতি আর কোথায় থাকে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জমি অধিগ্রহণে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতিতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মো. জসিম উদ্দিন পাটওয়ারী, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও বর্তমানে সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের (সড়ক) সহকারী সচিব মো. রেজাউল করিম (পলাশ), ভূমি মন্ত্রণালয়ের হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা মো. শফিকুর রহমান, হিসাব নিয়ন্ত্রকের (রাজস্ব) দপ্তর মো. ইউনূস মিয়া, ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. জামাল উদ্দিন খান (টিপু), মো. জাহিদুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম, হাদিছ উল্লাহ, ভূমি মন্ত্রণালয়ের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগ) মো. মনজুর রহমান, কর্মকর্তা দেবরাজ পাহলান, মো. শাহ জামাল, কাজী রহমত উল্লাহ, মো. রেজাউল করিম, মো. হুমায়ূন কবীর, আল আমিন, মো. সাদ্দাম হোসেন, মো. হারুন অর রশিদ, সুদর্শন মণ্ডল, জামাল উদ্দিন খান, মো. মুনতাসির মামুন, মোহাম্মদ রাজিউর রহমান, মো. সফিকুর রহমান, প্রশাসনিক কর্মকর্তা (অব.) আলমগীর পাটোয়ারী এবং ঢাকা ডিসি অফিসের নজরুল ইসলামসহ দুইশর অধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী সদস্য হিসেবে রয়েছেন। বহুমুখী সমবায় সমিতি কাঠাপ্রতি জমির মূল্য নির্ধারণ করেছে ২০ লাখ টাকা। সে হিসাবে তিন কাঠা জমির জন্য একজন সদস্যকে ৬০ লাখ টাকা এবং পাঁচ কাঠার জন্য ১ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। সরকারের দশম গ্রেডের কর্মকর্তাদের এই বিপুল টাকা পরিশোধ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

জানা গেছে, ভূমি মন্ত্রণালয় ও জেলাপ্রশাসকের প্রভাবশালী একটি চক্রের মাধ্যমে ১৬ একর খাসজমি অধিগ্রহণ করা হয়। খাসজমি অধিগ্রহণের পরবর্তীকালে যেন কোনো ধরনের সমস্যা তৈরি না হয়, সেজন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিবকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বহুমুখী সমবায় সমিতিতে রাখা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ে যখনই কোনো সচিবের পদায়ন হয়, তখনই সমিতির পক্ষ থেকে নেতারা ফুলের শুভেচ্ছা জানান।

ভূমি মন্ত্রণালয় কর্মকর্তা ও কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের এক সদস্য বলেন, ডিসি অফিসের মাধ্যমে ২০২৪ সালে জমি অধিগ্রহণ শেষ করা হয়, এখন বালু ভরাটের কাজ চলমান রয়েছে। আবাসনের জন্য ভূমি উন্নয়নে প্রত্যেক সদস্যের কাছে কাঠাপ্রতি ২০ লাখ টাকা করে জমা নিচ্ছে সমবায় সমিতি। সমিতির নির্দেশনায় এরই মধ্যে বহু সদস্য ২০ লাখ টাকা করে ফান্ডে জমা দিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, ধউর মৌজায় যেখানে ১৬ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, যেখানে সরকারি আরও ১১ একর জমি লিজ নেওয়া হয়েছে। আগামী ৫ বছরের মধ্যে ওই ১১ একরও অধিগ্রহণ করবে সমিতি। সব মিলিয়ে সেখানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ৫০ একর খাসজমি রয়েছে। ধাপে ধাপে সব জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা সহজ।

যেভাবে ১৬ একর খাসজমি ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দখলে: ২০১৪ সালের মার্চে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেনের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়- ভূমি মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রণালয়ের অধীন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আবাসন সমস্যা সমাধানে ঢাকা জেলার উত্তরা হালে তুরাগ থানাধীন ধউর ও গ্রাম ভাটুলিয়া মৌজার বিভিন্ন দাগে ৪৮ দশমিক ১২০১ একর জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনাপত্তিপত্র এবং আর্থিক সনদ পাওয়া যায়নি। ফলে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারেনি ঢাকা জেলা প্রশাসক। ওই বছরের আগস্টে আরও ৯ একর জমি বাড়িয়ে ৫৭ দশমিক ৬১৫৫ একর জমির অনাপত্তিপত্র চেয়ে রাজউকে আবেদন করে ভূমি মন্ত্রণালয় কর্মকর্তা ও কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড। এরপর অনাপত্তিপত্র দেয় রাজউক। একই বছরের সেপ্টেম্বরে জমির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ), সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত হুকুমদখল কর্মকর্তা, কানুনগো, সার্ভেয়ার ও চেইনম্যান প্রস্তাবিত জমি সরেজমিন পরিদর্শনে সিটি ১২৪৬ হতে ১২৭০, ১৫১৬ এবং ১৫২০, ১৭০১ সহ বেশকিছু দাগে বাড়িঘর থাকায় ৫৭ একর জমির স্থলে ৫০ দশমিক ৮৭৭৬ একর জমি অধিগ্রহণের কথা বলা হয়। এতেও বিভিন্ন ধরনের মামলা জটিলতা থাকায় ৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করতে পারেননি ঢাকা জেলা প্রশাসক।

তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফের নেতৃত্বে ২০১৪ সালের নভেম্বরে সচিবালয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় ভূমি বরাদ্দ কমিটির ১০২তম সভার কার্যবিবরণীতে ভূমি মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রণালয়ের অধীন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আবাসন সমস্যা সমাধানে ঢাকা জেলার উত্তরা হালে তুরাগ, ধউর ও গ্রাম ভাটুলিয়া মৌজার সিটি জরিপের বিভিন্ন দাগে ৫০ দশমিক ৮৭৭৬ একর জমি অধিগ্রহণের লক্ষ্যে প্রত্যাশী সংস্থা ও ঢাকা জেলা প্রশাসককে জানানোর বিষয়ে বলা হয়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপসচিব মো. রাশেদুল ইসলামের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, ২০১৪ সালের ২৫ নভেম্বরে কেন্দ্রীয় ভূমি বরাদ্দ কমিটির ১০২তম সভার কার্যবিবরণীর ৩ দশমিক ৬ নম্বর ক্রমিকে ভূমি মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রণালয়ের অধীন কর্মকর্তা/কর্মচারীদের আবাসন সমস্যা সমাধানকল্পে ঢাকা জেলার উত্তরা হারে তুরাগ, ধউর ও গ্রাম ভাটুলিয়া মৌজার সিটি জরিপের বিভিন্ন দাগে ৫০ দশমিক ৮৭৭৬ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ভূমি বরাদ্দ কমিটির সভায় ভূমি মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রণালয়ের অধীন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সমস্যা সমাধানকল্পে আলোচনা হলেও সেটি ‘ভূমি মন্ত্রণালয় কর্মকর্তা ও কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর আবাসন সংকট নিরসন প্রকল্পে রূপ নেয়। ফলে মূল উদ্যোগটি ভূমি মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রণালয়ের অধীন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য শুরু হলেও পরবর্তীকালে এটি একটি সমিতির আওতাভুক্ত হয়ে পুরো বিষয়টি বেসরকারি প্রক্রিয়ায় রূপ নিয়েছে।

ভূমি-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, অনিয়মের সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি হয় মাঠ প্রশাসনের বিভিন্ন ধাপে। খাসজমি বহুমুখী সমিতির নামে অধিগ্রহণের মতো প্রক্রিয়ায় অসাধু চক্রের যোগসাজশ রয়েছে। আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের দুর্বলতা এবং অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না থাকায় প্রশাসনিকভাবে খাসজমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। সরকারি জমি এভাবে সমিতি কিংবা ব্যক্তিমালিকানায় অধিগ্রহণের নজির প্রশাসনের জন্য আগামীতে নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

জমি অধিগ্রহণের অর্থ নিয়ে বিভ্রান্তি: ১৬ একর খাসজমি ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতির নামে অধিগ্রহণে সম্পৃক্ত থাকা ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাবেক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, সমিতির নামে ১৬ একর খাসজমি অধিগ্রহণে ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা ঢাকা জেলা প্রশাসক বরাবর জমা দেওয়া হয়েছে। সমিতির আরেক সদস্য বলেন, জমি অধিগ্রহণে ১ কোটি ৫ লাখ টাকা ডিসি অফিসে জমা দিয়েছি। এসব তথ্যের বিপরীতে সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন খান ১০৫ কোটি ৭১ লাখ ২৬ হাজার টাকার জনতার ব্যাংকের চেকের ফটোকপি প্রতিবেদকের হোয়াটসঅ্যাপে পাঠান। অন্যদিকে বিদ্যুৎ ভবনে অবস্থিত জনতা ব্যাংকের উপমহাব্যবস্থাপক মজিবুর রহমান ১০৫ কোটি ৭১ লাখ টাকার তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতির অনুকূলে খাসজমি অধিগ্রহণের বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার কালবেলাকে বলেন, সরকার বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জমি বছরে বছরে অধিগ্রহণ করে আসছে। সেখানে উল্টো সরকারি জমি সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যোগসাজশ করে অধিগ্রহণ করেছেন। সরকারি চাকরি করে খাসজমি অধিগ্রহণ করে নেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক।

তিনি আরও বলেন, ঢাকার বুকে জমির মূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় জনস্বার্থে প্রকল্প নিতে গিয়ে যেখানে জমি সংকটে হিমশিম খায় সরকার, সেখানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ১৬ একর খাসজমি অধিগ্রহণ করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতি। খাসজমি অধিগ্রহণের পেছনে অনিয়ম থাকতে পারে। সুষ্ঠু তদন্ত করে সেই অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। না হলে আগামীতেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এটিকে উদাহরণ হিসেবে দেখবেন এবং নিজেদের স্বার্থে সরকারি জমি অধিগ্রহণ করবেন। এতে একপর্যায়ে সরকার উন্নয়নমূলক প্রকল্প নিতে গিয়ে জমি সংকটের কারণে বিপদে পড়বে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের খাসজমি অধিগ্রহণে ১০৫ কোটি টাকার উৎস খুঁজে বের করতে হবে। কারণ ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন ও অফিসগুলোর প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ১০ম গ্রেডের। তারা যে বেতন পান, তা দিয়ে বর্তমান বাজারে সংসার চালানোই কষ্টসাধ্য, সেখানে ১০৫ কোটি ৭১ লাখ টাকায় ১৬ একর খাসজমি অধিগ্রহণ করেছেন। জমি অধিগ্রহণ ও টাকার প্রকৃত উৎস অনুসন্ধানে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে কাজ করতে হবে, তাহলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক কালবেলাকে বলেন, কোন কোন ক্ষেত্রে সরকারি জমি অধিগ্রহণ করা যাবে, তার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা আছে। সেই নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যদি ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সমিতির নামে নিজেরাই সরকারের জমি অধিগ্রহণ করেন, তাহলে অন্যরা এটিকে উদাহরণ হিসেবে দেখাবেন। এ অপরাধকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই, গুরুত্বসহকারে বিষয়টি দেখতে হবে। সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী ভূমি অধিগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। একই সঙ্গে জমি অধিগ্রহণের আদেশটি বাতিল করতে হবে। সরকারি চাকরি করা অবস্থায় সরকারি জমি অধিগ্রহণ করা, এটি সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত কাজ। সংশ্লিষ্টদের বিচারের মুখোমুখি করতে পারলে অন্যরাও ভাববেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড করলে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়।

এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় কর্মকর্তা ও কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন খান কালবেলাকে বলেন, সমিতির নামে ২০২৪ সালে ধউর মৌজায় ১৬ একর জমি প্রায় ১০৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা দিয়ে অধিগ্রহণ করেছি। আইনে ডোবা, নালা যা রয়েছে, সে অনুযায়ী জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। যেহেতু আমরা ভূমি মন্ত্রণালয়ের চাকরি করি, সেহেতু ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে আইনের কোনো ব্যত্যয় করা হয়নি। প্রথমে আমরা ৫৭ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য ঢাকা জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করেছিলাম। পরে ব্যক্তিমালিকানা জমি বাদ দিয়ে, ১৬ একর খাস অধিগ্রহণ করেছি। পাশেই আরও ১১ একর খাসজমি লিজ নেওয়া আছে।

স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন, ২০১৭-এর দ্বিতীয় অধ্যায়ে বলা হয়েছে, ‘সরকারি কোনো প্রয়োজনে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে উপধারা (১) এর দফা (ক)-তে বর্ণিত বাজারদরের ওপর অতিরিক্ত শতকরা ২০০ (দুইশ) ভাগ ক্ষতিপূরণ প্রদান করিতে হইবে। তবে শর্ত থাকে যে, বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে উক্ত ক্ষতিপূরণের পরিমাণ হইবে বাজারদরের ওপর অতিরিক্ত শতকরা ৩০০ (তিনশ) ভাগ।’

এ ব্যাপারে সমিতির সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিন খান বলেন, স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন, ২০১৭ গেজেট প্রকাশের পূর্বে যে সব এলএ কেস ‘স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল অধ্যাদেশ, ১৯৮২’-এর আওতায় ৩ ধারার নোটিশ জারি হয়েছে, সেই সব এলএ কেস উক্ত অধ্যাদেশ এবং উহার আওতায় পূর্বে জারিকৃত নির্দেশনাবলি বা পরিপত্র অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে হবে। সে অনুযায়ী জমি অধিগ্রহণের জন্য ২০১৪ সালে অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ৩ ধারার নোটিশের কারণে ওই সময়ে অধিগ্রহণ সম্ভব হয়নি। ২০২৪ সালে এসে ২০১৪ সালের রেটের জমির প্রকৃত মূল্যের দেড়গুণ বেশি দিয়ে অধিগ্রহণ করা হয়েছে।

ভূমি মন্ত্রণালয় সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ কালবেলাকে বলেন, ‘অকৃষি খাসজমি ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতির নামে অধিগ্রহণ করা হয়েছে। আইনে বলা আছে, কমপক্ষে ২০ জনের অধিক হলে খাসজমি অধিগ্রহণ করতে পারবে। সমবায় সমিতি আমাকেও জমি নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। কারণ, বাংলাদেশে আমার নামে এক ইঞ্চি জমি নেই, সেজন্য প্রস্তাব দিয়েছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘নৈতিকভাবে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সমিতির নামে খাসজমি অধিগ্রহণ করতে পারেন না, তবে আইনগতভাবে তা সঠিক আছে।’

ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন কালবেলাকে বলেন, ‘ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারী সমবায় সমিতির নামে খাসজমি অধিগ্রহণের বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই, এটি আমাদের আমলে হয়নি। অতীতে যত দুর্নীতি হয়েছে, সব দুর্নীতির ব্যাপারে ভূমি মন্ত্রণালয় কাজ করছে। খাসজমি অধিগ্রহণে দুর্নীতি হলে সেটিও প্রতিহত করা হবে। দুর্নীতির সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।’