শনিবার   ১৫ আগস্ট ২০২৬   শ্রাবণ ৩০ ১৪৩৩   ০১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

বঙ্গভবনের পথে দুঃসময়ের কান্ডারী

মাসুদ করিম, ঢাকা থেকে

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০১:৫৮ এএম, ১৫ আগস্ট ২০২৬ শনিবার

 

 

মির্জা ফখরুল ইসলাম বিএনপি’র অন্যতম ত্যাগি নেতা। দুঃসময়ের কান্ডারি। শেখ হাসিনার আমলে খালেদা জিয়া ছিলেন কারাবন্দি। তারেক রহমান নির্বাসিত। বাংলাদেশের মাটিতে বিএনপিকে দৃশ্যমান নেতৃত্ব দিয়েছেন মির্জা ফখরুল। জেল খেটেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আপোষ করেননি। সেই সংগ্রামী নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের পরবর্তি রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মির্জা ফখরুলের হাতেই মনোনয়নপত্র তুলে দিলেন। বর্ষিয়ান এই নেতার রাষ্ট্রপতি হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। আগামী ২০ আগস্ট সংসদ সদস্যদের ভোট গ্রহণের পর ফখরুলকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হবে। রাষ্ট্রপতি হিসাবে জামায়াত জোটের প্রার্থী কর্ণেল (অবঃ) অলি আহমেদ। এই দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। তবে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে মির্জা ফখরুলই রাষ্ট্রপতি হওয়া এখন শুধু সময়ের আপেক্ষা।
রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছে দলটি। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুর আড়াইটার দিকে নির্বাচন ভবনে নির্বাচনি কর্তা হিসেবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে মনোনয়নপত্র জমা দেয় বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল।
 
মনোনয়নপত্রে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান ও জাতীয় সংসদের হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে প্রস্তাব করেন এবং গয়েশ্বর চন্দ্র রায় তার প্রার্থিতাকে সমর্থন জানান।
এ সময় বিএনপির প্রতিনিধি দলে ছিলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন অপু, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুন নবী খান সোহেল, বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম পিন্টু প্রমুখ। এর আগে, দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত মনোনয়ন পান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার হাতে দলের মনোনয়ন তুলে দেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির মহাসচিব ও দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বলে জানিয়েছেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তার ঠাকুরগাঁও-১ সংসদীয় আসনটিও শূন্য হয়ে যাবে। পরবর্তীতে সেখানে উপনির্বাচন আয়োজন করবে নির্বাচন কমিশন। এর আগে, দুপুর ১২টার দিকে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়। তার মনোনয়নপত্র জমা দেন জোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। অলি আহমদের মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবক হয়েছেন ঢাকা-১৫ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। আর সমর্থক হয়েছে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি ও এনসিপির নেতা আব্দুল¬াহ আল আমিন। গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন আওয়ামী লীগের (বর্তমান কার্যক্রম নিষিদ্ধ) মনোনয়নে নির্বাচিত মো. সাহাবুদ্দিন। তখন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুসারে, আজ ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিন। ১৬ আগস্ট যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্টের মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে হবে। একাধিক প্রার্থী বৈধ থাকলে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। ভোটগ্রহণ হবে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।
শিক্ষকতা পেশা থেকে রাজনীতিতে আসা এই নেতার রয়েছে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের  মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলানোর অভিজ্ঞতা। একজন ‘সজ্জন রাজনীতিবিদ’ হিসেবে সবমহলে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে মনোনয়ন দিয়ে বিএনপি দলের ভেতরে উদাহরণ তৈরি করল।
অভাবনীয় কিছু না ঘটলে সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলই জয়লাভ করতে যাচ্ছেন। তিনি হবেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি। আওয়ামী লীগের আমলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পাওয়া মো. সাহাবুদ্দিন গেল ২৪ জুলাই পদত্যাগ করে বঙ্গভবন ছাড়েন। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হতে যাচ্ছে সপ্তাহখানেক পর, ২০ অগাস্ট। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে নামেন চার দশক আগে। সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের অঙ্গীকারে বেছে নেন এক সাধারণ জীবন। প্রাথমিকের কৃতি শিক্ষার্থী ঠাকুরগাঁওয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়ে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সহপাঠী বিগত অর্ন্তবর্তি সরকারের উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, “মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অর্থনীতি বিভাগের কৃতি ছাত্র ছিলেন। ঢাকা কলেজে সবাই ভর্তি হতে পারে না, যদি ব্রিলিয়েন্ট রেজাল্ট না হয়। ফখরুল ছিলেন সেই পর্যায়ের ছাত্র।
“অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র বুঝতেই পারেন, পড়ালেখার চাপ কি পরিমাণ থাকে। এরপরও তিনি ছাত্র রাজনীতি করেছেন। সেই রাজনীতির পথ ধরে জাতীয় রাজনীতিতে অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন। হি ইজ আ ব্রিলিয়েন্ট পারসন।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি বাম ধারার রাজনীতিতে যুক্ত হন মির্জা ফখরুল। ১৯৬০ এর দশকে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। মির্জা ফখরুল সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসএম হল ইউনিটের মহাসচিব নির্বাচিত হন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে উঠে আসেন এবং ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি হন। রাজনৈতিক কারণে সে সময় তাকে কারাগারে যেতে হয়েছিল।
অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের পর শিক্ষাকতায় যোগ দিয়েছিলেন মির্জা ফখরুল। শিক্ষা ক্যাডারে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক পদে যোগ দেন ১৯৭২ সালে। এরপর বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মির্জা ফখরুল বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক পদে এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনেও কাজ করেন। তিনি ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব পদে যোগ দেন। এরপর ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি রাজনীতিতে নেমে পড়েন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন।
মির্জা ফখরুলের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ি এলাকায়। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন এবং মা মির্জা ফাতেমা আমিন। বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন আইনজীবী। তিনি দুইবার পাকিস্তান প্রাদেশিক আইন সভার সদস্য এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। ছিলেন এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য। বাবার মতো রাজনীতির পথ ধরলেও তিনি জাতীয় রাজনীতিতে হাতেখড়ি নেন আবদুল হামিদ খান ভাসানীর দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপে। সেখান থেকে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি ছেড়ে সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে যোগ দেন।
মির্জা ফখরুল ১৯৯০ সালে যোগদান করেন বিএনপিতে। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি এবং পরে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য হন। তারপর ধাপে ধাপে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব পদে উঠে আসেন।
২০১১ সাল থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল। এরপর ২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে দলটির মহাসচিব নির্বাচিত হন। সেই থেকে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে আসছেন কৃষক ফ্রন্ট থেকে আসা এই নেতা। বিএনপির নেতৃত্বের শীর্ষ পর্যায়ে আসার আগে মির্জা ফখরুল দলটির কৃষক সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি এবং পরে সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন দীর্ঘদিন।
রাজনীতির এই দীর্ঘ যাত্রাপথে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মোকাবিলা করেছেন এক-এগারোর পট পরিবর্তন পরবর্তী প্রতিকূলতা। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের সময়টাতে দমন-পীড়ন, নির্যাতনে বার বার বিপর্যয়ের মুখে পড়া বিএনপিকেও অসীম ধৈর্যে সংগ্রামে অটল রেখেছেন। আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০১৮ সাল থেকে প্রায় দুই বছর কারাগারে ছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এরপর অসুস্থতার কারণে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সেনা–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালে লন্ডন চলে যান, সেখান থেকেই দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে বিএনপি চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পক্ষে মাঠ সামলেছেন মির্জা ফখরুল। শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব। বহু মামলা লড়ার পাশাপাশি তাকে তিন দফা কারাগারেও যেতে হয়েছে। দলের শীর্ষ দুই নেতার অনুপস্থিতিতে দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির সংকটে হাল ধরে থাকা এবাওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে দেশের ভেতরে কার্যত দলটির মূল নেতৃত্বে ছিলেন মির্জা ফখরুল। ##