বুধবার   ১২ আগস্ট ২০২৬   শ্রাবণ ২৭ ১৪৩৩   ২৭ সফর ১৪৪৮

টরন্টোয় কনসাল জেনারেল খোকনের ক্ষমতার দম্ভ

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০২:০২ এএম, ১২ আগস্ট ২০২৬ বুধবার

কানাডার টরন্টোয় জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল শাহ আলম খোকনের বক্তব্য ও আচরণ নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশি এবং বিএনপির নেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনুষ্ঠানে নিজের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা তুলে ধরে তিনি ‘ক্ষমতার প্রভাব’ বা ‘খুঁটির জোর’ দেখিয়েছেন—এমন অভিযোগ করেছেন উপস্থিত অনেক বিএনপি নেতা ও প্রবাসী।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় শাহ আলম খোকন বলেন, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তার ‘অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ’ সম্পর্ক রয়েছে এবং নিউইয়র্কে তারা একসঙ্গে রুম শেয়ার করেছেন। তিনি যা করেন, তা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করেই করেন এবং অন্যরা কী বলল, তাতে তার কিছু যায়-আসে না।’

কনসাল জেনারেল খোকনের এই বক্তব্যকে ‘ক্ষমতার দম্ভ’ ‘অশোভন’ এবং ‘কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত’ বলে মন্তব্য করেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রবাসী বাঙালি ও বিএনপি নেতারা। তাদের অভিযোগ, জাতীয় তাৎপর্যপূর্ণ একটি অনুষ্ঠানে একজন কূটনীতিকের এ ধরনের ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রসঙ্গ তোলা অনাকাঙ্ক্ষিত।

একাধিক বিএনপি নেতা অভিযোগ করেন, অনুষ্ঠানের শুরুতেই কনস্যাল জেনারেল সঞ্চালককে নির্দেশ দেন, বিএনপি নেতাদের পদ-পদবী উল্লেখ না করে সবাইকে ‘বাংলাদেশি কানাডিয়ান’ সম্মোধন করে বক্তব্যে দেয়ার জন্য। নেতারা আপত্তি জানালে কনসাল জেনারেল বলেন, ‘তিনি যা নির্দেশ দেবেন, তাই চূড়ান্ত’। পরে বক্তব্যে দেওয়ার সময় নেতাদের পদবী আর উল্লেখ করা হয়নি। তার এ নির্দেশকে বিএনপি নেতাদের প্রতি প্রকাশ্য অসম্মান হিসেবে দেখা হচ্ছে।


জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত, কোরআন তেলাওয়াত কিংবা আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে দোয়ার আয়োজন না থাকায়ও প্রশ্ন তুলেছেন প্রবাসীরা। অনুষ্ঠানে কনসাল জেনারেল একাধিকবার বলেন, অনুষ্ঠানের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। তিনি ব্যক্তিগত অর্থে অতিথিদের জন্য চা ও মিষ্টি ব্যবস্থা করেছেন। এনিয়েও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন অতিথিরা।

অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ প্রক্রিয়া নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। আওয়ামী লীগের কয়েকজনকে আমন্ত্রণ জানানোর কারণে বিএনপি নেতারা প্রতিবাদ জানান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিনিয়র এক বিএনপি নেতা বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনে টরন্টোয় সক্রিয় অনেক সংগঠককে আমন্ত্রণ না জানিয়ে আওয়ামী লীগ-সমর্থক হিসেবে পরিচিত কয়েকজনকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তিনি জানান, বিএনপিকে ২০ জন এবং জামায়াত ও এনসিপিকে ১০ জন করে নেতাকর্মী আনতে বলা হলেও শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানে ২৫–৩০ জনের মতো উপস্থিত ছিলেন। এমনকি অনুষ্ঠানে কনসাল জেনারেল কঠোর সুরে বলেন, ‘অনুষ্ঠানে দাওয়াত কাকে দেবো আর কাকে দেবো না— এটা আমার সিদ্ধান্ত’।

জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ‘একজন ক্ষমতাধর ব্যক্তি’র প্রভাবে সিনিয়রদের ডিঙ্গিয়ে কনস্যাল জেনারেল হিসাবে নিয়োগ পান শাহ আলম খোকন।

অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত প্রামাণ্যচিত্র ও কনস্যুলেটের ওয়েবসাইট নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন প্রবাসীরা। তাদের অভিযোগ, ভিডিওতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন দৃশ্য দেখানো হলেও বর্তমান সরকারের কার্যক্রম বা ইতিবাচক উদ্যোগ তুলে ধরা হয়নি। ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, মুক্তিযুদ্ধ, সরকারপ্রধান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা সরকারের কার্যক্রম যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। বরং কনস্যুলেট যে ভবনের একটি অংশ ভাড়া নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে, সেই ভবনের ছবি ওয়েবসাইটের ব্যানারে ব্যবহার করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে কানাডা পশ্চিম বিএনপির সভাপতি খন্দকার আব্দুল আহাদ বলেন, অনেকেই এখন নতুন জুলাই যোদ্ধা সাজছেন—সেজেছেন ভালো কথা, তবে বেশি দূর এগোবেন না।

এবিষয়ে ওন্টারিও স্টেট বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইমন চৌধুরী অভিযোগ করেন, কনসাল জেনারেলের আচরণ ছিল ‘অপেশাদার ও অ-কূটনৈতিক’। পরিকল্পিতভাবে প্রবাসীদের কাছে বিএনপি নেতাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে চেয়েছেন তিনি। অথচন টরন্টোয় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রকাশ্যে রাজনৈতিক তৎপরতা থাকলেও কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।

টরন্টো সিটি বিএনপির সভাপতি মঈন চৌধুরী বলেন, ‘কূটনৈতিক মিশনের প্রধান হিসেবে তার কাছ থেকে দল-মত নির্বিশেষে সবাই সম্মানজনক ও নিরপেক্ষ আচরণ প্রত্যাশা করে। কিন্তু ‘মন্ত্রীর সঙ্গে রুম শেয়ার’ করার বক্তব্য দিয়ে কি বোঝাতে চেয়েছেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। এটি কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। কনস্যুলেটে ঢুকলে বিএনপি সরকারের কোনো অস্তিত্ব বোঝা যায় না।’