শনিবার   ০৮ আগস্ট ২০২৬   শ্রাবণ ২৩ ১৪৩৩   ২৩ সফর ১৪৪৮

আনিস আলমগীরের কলাম চেহারা দেখানো ছাড়াই হাসিনার সংবাদ সম্মেলন

আজকাল রিপোর্ট

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০২:০৫ এএম, ৮ আগস্ট ২০২৬ শনিবার


অনলাইনে আজ দিল্লিতে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে দেওয়া শেখ হাসিনার পুরো বক্তৃতাটা আমি শুনলাম। চেহারা দেখানো ছাড়াই এই প্রথম তিনি লাইভ অনুষ্ঠানে অংশ নিলেন। বাংলাদেশি-আমেরিকান সাংবাদিক সুলতানা রহমানের প্রশ্ন দিয়ে শুরু করে কয়েকটি প্রশ্নের সরাসরি জবাব দিয়েছেন, যেটি গত দুই বছরের মধ্যে মিডিয়ার সঙ্গে তার ইন্টারঅ্যাকশনের মধ্যে অন্যতম সেরা উপাদান।
শেখ হাসিনা দিনক্ষণ না বললেও ডিসেম্বরে আসবেন দৃঢ়তার সঙ্গে বারবার বলেছেন এবং ডিসেম্বর তাদের বিজয়ের মাস, সেটা উল্লেখ করেছেন। একাত্তর যেভাবে এখন আক্রান্ত, সেটাকে রক্ষা করতেও তিনি আসবেন বলেছেন।
দ্য হিন্দুর সুহাসিনীর বহুল প্রতীক্ষিত ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন সজীব ওয়াজেদ জয়। একপক্ষ হত্যার দায়ে ক্ষমা না চাইলে (শেখ হাসিনার ভাষায় ইনডেমনিটি পাইলে) আরেকপক্ষ কেন ক্ষমা চাইবে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
যথারীতি তার বক্তৃতায় ২৪-এর জুলাই-আগস্টে তার কর্মকাণ্ডের সাফাই ছিল। ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের ঘটনাকে একটি সুপরিকল্পিত বা "মেটিকুলাসলি ডিজাইনড" বলেছেন- সেই উদাহরণ দিয়ে শেখ হাসিনা প্রশ্ন রেখেছেন যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছিল অরাজকতার বিপরীতে সরকারি যন্ত্র তা প্রতিহত করা ছাড়া আর কী করার ছিল। কিন্তু তিনি যে এই সমস্যা সমাধানে সময় অপচয় করেছেন, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এত কঠোর হয়েছেন এবং বিপুলসংখ্যক প্রাণহানির ঘটনা ঘটিয়েছেন- সেই বিষয় এড়িয়ে গেছেন। যথারীতি আন্দোলনকারীদের দোষারোপ করেছেন।
বাংলাদেশি প্রধান প্রধান মিডিয়াগুলো মনে হচ্ছে সরকারের নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে আজ। এই নিয়ে কারও রিপোর্ট দেখলাম না। তাহলে শেখ হাসিনার বার্তা কি জনগণের কাছে পৌঁছেছে?
বিষয়টার একটা তাত্ত্বিক দিক থেকে পর্যালোচনা করা যায়।
কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া কিংবা বাধা তৈরি করা মূলত জনগণকে সত্য ও মিথ্যা যাচাইয়ের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। জার্মান দার্শনিক ইয়ুর্গেন হাবারমাসের 'পাবলিক স্ফিয়ার বা জনপরিসর তত্ত্ব' (চঁনষরপ ঝঢ়যবৎব ঞযবড়ৎু, ১৯৬২) অনুসারে, একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নাগরিকদের অবাধে মতবিনিময় এবং তথ্য যাচাই করে রাজনৈতিক মতামত গঠনের সুযোগ থাকা বাধ্যতামূলক।
অতীতে রাষ্ট্রীয়ভাবে তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞার ঘটনা এবং বর্তমানে শেখ হাসিনার বক্তব্যের ক্ষেত্রে দেখা যাওয়া সেন্সরশিপ মূলত একই ধরনের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ধারাবাহিকতা।
তবে এই দুই ঘটনার ক্ষেত্রে একটি লক্ষণীয় তাত্ত্বিক পার্থক্য রয়েছে। শেখ হাসিনার আজকের বক্তব্যের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষের বিরোধিতা ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের প্রচারের কারণে মনস্তাত্ত্বিক কৌতূহল বহুগুণ বেড়েছে, যা মিডিয়া স্টাডিজে 'স্ট্রাইস্যান্ড ইফেক্ট' (ঝঃৎবরংধহফ ঊভভবপঃ - গরশব গধংহরপশ, ২০০৩) নামে পরিচিত। 
কোনো তথ্যকে রাষ্ট্র বা কর্তৃপক্ষ জোরপূর্বক দমন করতে চাইলে ইন্টারনেটের যুগে তা বিপরীত ফল দেয় এবং তথ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়।
যেমন আজকে ফরেন কসপন্ডেন্টস ক্লাবে শেখ হাসিনার অডিও বক্তৃতার ক্ষেত্রে হয়েছে। 
একইসঙ্গে, ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের আগ্রহের কারণে এখানে জনযোগাযোগ তত্ত্বের 'ইনফরমেশন বাইপাস' (ওহভড়ৎসধঃরড়হ ইুঢ়ধংং) বা বিকল্প তথ্যপ্রবাহের সৃষ্টি হয়েছে।
মিডিয়া তাত্ত্বিক ম্যানুয়েল কাস্টেলসের 'নেটওয়ার্ক সোসাইটি' (ঘবঃড়িৎশ ঝড়পরবঃু ঞযবড়ৎু, ১৯৯৬) মডেল অনুযায়ী, ডিজিটাল যুগে কোনো বক্তব্য স্থানীয় মূলধারার প্রচারমাধ্যমে সেন্সর করা হলেও তা সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে জনগণের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে সোশ্যাল মিডিয়া ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার যুগে স্থানীয় গণমাধ্যমে তা প্রকাশিত হলো কি হলো না, তা রাজনৈতিক বক্তব্যের কার্যকারিতা বা পৌঁছানোর পরিধি থামিয়ে দিতে পারে না।
দিল্লি সাউথ এশিয়ার সবচেয়ে বড় মিডিয়া হাব, সব ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া রয়েছে এখানে। শেখ হাসিনার বক্তব্য শুনতে সাংবাদিকদের উপস্থিতিও ছিল যথেষ্ট।
বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের ক্ষমতাসীনরা নিজেরা যখন গদিতে থাকেন, এসব তাত্ত্বিক বক্তব্য কানে নেন না। ক্ষমতার বাইরে গেলে তখন প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। (আনিস আলমগীরের স্ট্যাটাস থেকে সংগৃহিত)