হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক উত্তপ্ত
মাসুদ করিম, ঢাকা থেকে
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০১:৩৮ এএম, ৮ আগস্ট ২০২৬ শনিবার
বাংলাদেশ সরকারের আহ্বানকে তোয়াক্কা না করে দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলন করার অনুমতি দেয় ভারত। তাতেই ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। গণঅভ্যূত্থানের বার্ষিকীতে বাংলাদেশ যখন আবেগে ভাসছে ঠিক তখন শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে যেভাবে চিত্রিত করেছেন তাতে বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে ক্ষোভের শেষ নেই। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, ভারতের জন্যে আরেক পাকিস্তান হয়ে গেছে বাংলাদেশ। বিএনপি নেতারা বলছেন, এই ধরনের বক্তব্য উস্কানিমূলক। নিষেধাজ্ঞা থাকায় বাংলাদেশের কোনও মূলধারার গণমাধ্যম শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার করেনি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লন্ডনে ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনকালেও আদালত একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলো। তবে অজ্ঞাত কারণে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার মুখ দেখানো হয়নি। শুধুমাত্র অডিও প্রচার করা হয়েছে। অনেকের ধারণা, ভারত সরকারের অনুমতি না পাওয়ায় শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে তার চেহারা দেখাননি।
নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক খারাপ হয়ে আছে। বিএনপি বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় যাবার পর সম্পর্ক উন্নয়নের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিলো। এখন সেই সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন। দিল্লিতে গত ৫ই আগস্ট বাংলাদেশে গণঅভ্যূত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে শেখ হাসিনা ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। এই সংবাদ সম্মেলনের খবর চাউর হবার পর পরই বর্তমান সরকারের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীকে তার দফতরে আমন্ত্রণ জানিয়ে এমন সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের অনুমতি না দেবার জন্যে অনুরোধ করেন। পরের দিন ভারতের পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র রনধির জয়সোয়াল বলেছেন, শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের সঙ্গে ভারতের সরকারের কোনও যোগসূত্র নেই। শেখ হাসিনার কোনও বক্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকার একমত পোষণ করেনা।
শেখ হাসিনাকে ভারত সংবাদ সম্মেলন করতে নিষেধ করেনি। বাংলাদেশের মূলধারার মিডিয়ায় প্রচার নিষিদ্ধ থাকলেও দিল্লিতে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম এবং সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে সরাসরি এই সংবাদ সম্মেলন প্রচার করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের মানুষও শেখ হাসিনার বক্তব্য শুনতে পেরেছে। শেখ হাসিনা গণঅভ্যূত্থানকালে মানুষ হত্যার জন্যে অনুশোচনা প্রকাশ করেননি। তিনি বরং গণঅভ্যূত্থান পরবর্তিকালকে ভয়াবহভাবে চিত্রিত করেছেন। এই সঙ্গে তিনি এই ঘোষণারও পুনরুল্লেখ করেন যে, আগামী ডিসেম্বরে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসবেন। যদিও তিনি কোনও সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ উল্লেখ করেননি।
শেখ হাসিনার বক্তব্য শেষ হওয়ার পর পরই বিষয়টি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতির মাধ্যমে ক্ষোভের কথা জানিয়েছে। এতে বলা হয়, শেখ হাসিনার সরকার ছিলো একটি মাফিয়া সরকার। যে কোনও অজুহাতে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার করা গ্রহনযোগ্য নয়। ফলে বাংলাদেশের মিডিয়ায় বক্তব্য প্রচার না হলেও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার বদৌলতে সবাই শুনেছেন। এমন একটি সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের বিরদ্ধে ভারতে বসে একটি কর্মসূচি পালন করার অনুমতিপ্রাপ্ত হয়েছেন। তারেক রহমানের সরকার এতে ক্ষুব্ধ হওয়াটা স্বাভাবিক। এবারকার গণঅভ্যূত্থানে বিশেষ দিক হলো, শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিলেও সেখানে থেকে তিনি রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করছেন।
ভারতের সরকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আমন্ত্রণের চিঠি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছালে দ্রুতই তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়। এখন প্রধানমন্ত্রী নিজেই সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেবেন কিনা। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা আগে থেকেই শুরু হয়েছে। ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা, পরাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বাংলাদেশ সফর করেন এবং বাংলাদেশ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ভারত সফর করেন। বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আগামী ১৩-১৪ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকসের আউটরিচ সম্মেলনে যোগদানের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য হতে চেয়েছে। এই ক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়া ঘোষণা করেছে যে, তারা বাংলাদেশকে ব্রিকসের সদস্য পদ পেতে সমর্থন করবে।
শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে বাংলাদেশে আসবেন বলে যে ঘোষণা দিয়েছেন তা কতটা বাস্তব এই প্রশ্ন উঠেছে। জুলাই অভ্যূত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনা মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত আসামী। শেখ হাসিনার কাছে কোনও আলাদীনের প্রদীপ নেই। তার কাছে পাসপোর্ট নেই। ফলে বিমানযোগে ইমিগ্রেশন পেরিয়ে তার বাংলাদেশে আসা সম্ভব নয়। তিনি তবে বেনাপোল ¯’ল বন্দর বিধায় সেই পথে আসতে পারেন। তবে বাংলাদেশের সীমানায় প্রবেশ করা মাত্রই তাকে গ্রেফতার করা হতে পারে। ফলে এই ধরনের রিস্ক নিয়ে তিনি কি দেশে ফিরে আসবেন -- এই প্রশ্নের জবাব নেই কারো কাছে।
অনেকে মনে করেন, শেখ হাসিনা সারেন্ডার করার জন্য দেশে আসতে চাইলে কালই আসতে পারেন। তিনি ডিসেম্বরের মতো দূরবর্তি টার্গেট দিলেন কেন। এ থেকে স্পষ্ট ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষনা একটি কৌশলমাত্র।
