বৃহস্পতিবার   ০৬ আগস্ট ২০২৬   শ্রাবণ ২১ ১৪৩৩   ২১ সফর ১৪৪৮

মিয়ানমারের সঙ্গে ভূখণ্ড বিনিময়ের কথা ভাবছে ভারত

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০২:২১ এএম, ৬ আগস্ট ২০২৬ বৃহস্পতিবার

ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সীমান্ত নির্ধারণের অংশ হিসেবে দুই দেশ সম্ভাব্য ভূখণ্ড বিনিময় নিয়ে আলোচনা করছে বলে জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে সীমান্তের যেসব অংশ এখনও চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায়নি, সেগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে বলে নিশ্চিত করেছে নয়াদিল্লি।

মঙ্গলবার রাজধানী নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, “সীমান্তের কিছু অংশ এখনও চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। এসব এলাকা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে।”

মণিপুর সীমান্তে মিয়ানমারের সঙ্গে ভূমি বিনিময়ের সম্ভাবনা নিয়ে গণমাধ্যমের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। তবে তিনি সরাসরি ভূখণ্ড বিনিময়ের খবর নিশ্চিত বা অস্বীকার করেননি।

কী বলেছে ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’?
মার্কিন সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাট গত ১৭ জুলাই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করে, ভারত সরকার মণিপুর সীমান্তে প্রায় ১ দশমিক ৪ বর্গমাইল (প্রায় ৩ দশমিক ৬ বর্গকিলোমিটার) এলাকা বিনিময়ের একটি প্রস্তাব বিবেচনা করছে।

প্রতিবেদনটি একটি সরকারি নথির বরাত দিয়ে জানায়, সীমান্তের ৬৫ থেকে ৬৮ নম্বর সীমান্তস্তম্ভের মধ্যবর্তী প্রায় ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ অমীমাংসিত অংশের সীমানা নির্ধারণের জন্য এই প্রস্তাব নিয়ে কাজ চলছে।

নথিটি ২০২৬ সালের ২৬ মে তারিখের বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, তিন মাসের মধ্যে সীমান্ত চিহ্নিতকরণের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।

প্রস্তাবিত এলাকা ভারতের মণিপুর রাজ্যের চান্দেল জেলা এবং মিয়ানমারের সাগাইং অঞ্চলের কাবাও উপত্যকার সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত।

কেন এই প্রস্তাব?
বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তের অমীমাংসিত অংশ দ্রুত নির্ধারণ করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।

সীমানা চূড়ান্ত হলে ভারত পুরো ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবে। এর মাধ্যমে অবৈধ অনুপ্রবেশ, বিদ্রোহী গোষ্ঠীর চলাচল এবং সীমান্তপারের বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হবে বলে মনে করছে নয়াদিল্লি।

২০২৪ সালে ভারত সরকার ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত-মিয়ানমার আন্তর্জাতিক সীমান্তজুড়ে বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করে।

একই সঙ্গে ২০১৮ সাল থেকে চালু থাকা ফ্রি মুভমেন্ট রেজিম বাতিলের সিদ্ধান্তও নেয় ভারত। ওই ব্যবস্থার আওতায় সীমান্তবর্তী উপজাতীয় জনগোষ্ঠী বিশেষ সীমান্ত পাস ব্যবহার করে ভিসা ছাড়াই একে অপরের ভূখণ্ডে সর্বোচ্চ ১৬ কিলোমিটার পর্যন্ত যাতায়াত করতে পারত।

এখনও অমীমাংসিত ১৭১ কিলোমিটার সীমান্ত
ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে, যা অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর ও মিজোরাম অতিক্রম করে মিয়ানমারের সাগাইং অঞ্চল ও চিন রাজ্যে প্রবেশ করেছে।

ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৪৭২ কিলোমিটার সীমান্তে সীমান্তস্তম্ভ স্থাপন করে সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে এখনও প্রায় ১৭১ কিলোমিটার সীমান্ত অমীমাংসিত রয়েছে। এর বেশিরভাগ অংশ অরুণাচল প্রদেশের লোহিত সেক্টর এবং মণিপুরের কাবাও উপত্যকা এলাকায়।

বর্তমান ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত ১৯৬৭ সালের দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হলেও কয়েকটি অংশে এখনও সীমানা চূড়ান্ত হয়নি।

ভারত সরকারের ভাষ্য, দুই দেশের মধ্যে কোনও বৃহত্তর সীমান্ত বিরোধ নেই; কেবল নয়টি সীমান্তস্তম্ভের অবস্থান এখনও চূড়ান্ত করা বাকি রয়েছে এবং সেগুলো দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমেই নির্ধারণ করা হচ্ছে।

সংবেদনশীল কয়েকটি সীমান্ত এলাকা
মণিপুরের সবচেয়ে সংবেদনশীল সীমান্ত অংশগুলোর মধ্যে রয়েছে-
•    মলচাম সেক্টর (সীমান্তস্তম্ভ ৬৪-৬৮)
•    মোরেহ সেক্টর (সীমান্তস্তম্ভ ৭৫-৭৯)
•    চোরো খুনৌ সেক্টর (সীমান্তস্তম্ভ ৮৮-৯৫)
দ্য ডিপ্লোম্যাটের দাবি, গত মাসে মিয়ানমারের সামরিক নেতা মিন অং হ্লাইংয়ের ভারত সফরের সময়ও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই দেশ মলচাম এলাকায় নতুন ও সহায়ক সীমান্তস্তম্ভ স্থাপনের সম্ভাবনা এবং ২০১৭ সালে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সীমান্ত পুনর্নির্ধারণের একটি প্রস্তাবও পর্যালোচনা করেছে।

বাংলাদেশ-ভারত চুক্তির নজির
প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ভূখণ্ড বিনিময়ের নজির ভারতের জন্য নতুন নয়। 

২০১৫ সালে ভারত ও বাংলাদেশ স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন করে। ওই চুক্তির আওতায় ভারত তার ভূখণ্ডে থাকা ১১১টি বাংলাদেশি ছিটমহল বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করে। বিনিময়ে বাংলাদেশ থেকে ৫১টি ভারতীয় ছিটমহল গ্রহণ করে ভারত।

এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৪১ বছর ধরে চলা সীমান্তসংক্রান্ত জটিলতার অবসান ঘটে।

মণিপুরে তীব্র বিরোধিতা
সম্ভাব্য ভূখণ্ড বিনিময়ের খবর প্রকাশের পর থেকেই মণিপুরে এর বিরোধিতা শুরু হয়েছে।

মণিপুরের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত কো-অর্ডিনেটিং কমিটি অন মণিপুর ইন্টেগ্রিটি কেন্দ্রীয় সরকারকে এ ধরনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছে।

সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, মণিপুরের ভূখণ্ডের সামান্য অংশও যদি মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করা হয়, তাহলে তারা ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে তুলবে।

গত ২৭ জুলাই সংগঠনটি এক বিবৃতিতে জানায়, “যদি প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য সত্য হয় এবং সেই প্রস্তাব বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে কো-অর্ডিনেটিং কমিটি অন মণিপুর ইন্টেগ্রিটি কোনওভাবেই নীরব দর্শক হয়ে থাকবে না।”

সংগঠনটির দাবি, মণিপুরের ভৌগোলিক অখণ্ডতা কোনওভাবেই আপসযোগ্য নয়। তাদের ভাষ্য, ১৯৪৯ সালে ভারতের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পর রাজ্যটি ইতোমধ্যেই ঐতিহাসিকভাবে কিছু ভূখণ্ড হারিয়েছে। তাই ভবিষ্যতে রাজ্যের সীমানা আরও ছোট করার যেকোনও উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য হবে না।

এছাড়া মণিপুরের জনগণের মতামত ছাড়া রাজ্যের ভৌগোলিক অখণ্ডতায় প্রভাব ফেলতে পারে- এমন কোনও সিদ্ধান্ত না নেওয়ার জন্যও কেন্দ্রীয় সরকারকে সতর্ক করেছে সংগঠনটি। সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে