শনিবার   ০১ আগস্ট ২০২৬   শ্রাবণ ১৬ ১৪৩৩   ১৬ সফর ১৪৪৮

ট্রাম্পের দূতের ব্যস্ততা ঢাকায়

আজকাল রিপোর্ট

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০২:১৬ এএম, ১ আগস্ট ২০২৬ শনিবার


 
১ বা ২ কলাম

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরের সফর নতুন এক বার্তা নিয়ে এলো। তিনি ঢাকায় নামতেই বাংলাদেশের ওপর জারি থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাভেল এডভাইজারি এক ধাপ নীচে নামানো হল। এটার অর্থ হলো, বাংলাদেশ এখন অনেক বেশি স্থিতিশীল। ফলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার জন্যে নিরাপদ। গোরের এই সফর এটাও মনে করায় যে, নতুন সরকারের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন সানন্দে কাজ করতে আগ্রহী।
শেখ হাসিনার শাসনকালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক মারাত্মক খারাপ হয়েছিল। তখন বাংলাদেশের এলিট ফোর্স ‘র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন’ (র‌্যাব)-এর ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এছাড়াও, পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিলো। যুক্তরাষ্ট্রের এমন সব পদক্ষেপের পরও শেখ হাসিনার সরকার তেমন কোনও সংশোধনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। ফলে পরিস্থিতি খুব নাজুক হয়ে ওঠে।
ছাত্রদের নেতৃত্বে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে গণঅভ্যূত্থানের পর ২০২৬ সালের সাধারন নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের পথও সূচিত হয়। বিশেষ দূত সার্জিও গোরের এই সফর এই পদে থেকে বাংলাদেশে তার প্রথম শহর। প্রথম দিনে পররাষ্ট্র মন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে তার বৈঠক হয়। দ্বিতীয় দিন শুক্রবার পুরো দিন কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে। এবং তার পরের দিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানা দিক রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি পোশাক শিল্প। সেই পোশাক রফতানির অন্যতম প্রধান গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে বাংলাদেশী ডায়াসপোড়া নিতান্ত নগণ্য নয়। রোহিঙ্গা শরনার্থীদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে অন্যতম সো”চার দেশ যুক্তরাষ্ট্র। এক কেন্দ্রীক বিশ্ব ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের নানামুখী গুরুত্ব রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কারণেই নয়। বরং আঞ্চলিক, বৈশ্বিক এবং কৌশলগত কারণেও বাংলাদেশের গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগ স্থানে অবস্থিত। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত সবচেয়ে বড় দেশ। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের দিকটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম সফর মালয়েশিয়া। তারপর তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম এর গ্রীস্মকালীন বৈঠকে যোগদানের লক্ষ্যে চীনের দালিয়ান সফর করেন। সামার দাবস নামের এই সম্মেলনে তারেক রহমানের উপ¯ি’তি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বেশ আলোচিত হয়েছে। এই সফরের সুযোগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দালিয়ান থেকে বেইজিং গিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে কৌশলগত, বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয় যা একটি যৌথ ইশতেহারের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এই প্রেক্ষিতে চীনের প্রতিদ্বন্ধী ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে চীনের ঘনিষ্ঠতার মাত্রা নিবিড় পর্যবেক্ষনে রেখেছে।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাভাবিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে কারও কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু এই সম্পর্ক যদি চীনের বলয়ভুক্ত করে বাংলাদেশকে তবে সেটা অনেক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের জন্যে উদ্বেগের কারণ হতে পারে। এই ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক মাখামাখি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। বাংলাদেশের সমরাস্ত্রের সিংহভাগ আমদানি করা হয় চীন থেকে। বিশেষ করে চীন থেকে দু’টি সাবমেরিন আমদানির পর ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের টনক নড়ে। এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের আগে ভারত না যাওয়ায় বেইজিং যেমন বাকবাকুম করছে। তেমনি ভারত খুবই আশাহত হয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনে যোগদানের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আগামী ১৩-১৪ সেপ্টেম্বর ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ কর্মসূচিতে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানোর পর বিষয়টি বাংলাদেশের বিবেচনাধীন রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আগামী বছর বাংলাদেশ বিমসটেক সম্মেলনের আয়োজন করবে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ ব্রিকসের সম্মেলনে যোগদানের সম্ভাবন বেশি। কারণ বাংলাদেশ নিজেও ব্রিকসের সদস্য পদ পেতে আগ্রহী। সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বৈঠকে যোগদানের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র সফরেও যাবেন। এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি কোনও দিকে ঝুঁকে পড়ছে ! এই প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, না, বাংলাদেশ একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাসি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত ও চীনের সম্পর্ক কোনও জিরো সাম গেম নয়। তাদের একটা দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করার মানে এই নয় যে, আরেকটা দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করবো। মন্ত্রী এও বলেন যে, ‘বাংলাদেশ স্ত্রী ও সতীনের ঝগড়ার কেন্দ্রস্থল হবে না’। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাই সার্জিও গোরের সফর খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।