‘ইমারজেন্সী ঘোষণার ষড়যন্ত্রে ছিলেন চুপ্পু’!
আজকাল রিপোর্ট
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০২:০০ এএম, ১ আগস্ট ২০২৬ শনিবার
সদ্য পদত্যাগি প্রেসিডেন্ট মো: সাহাবুদ্দিন চুপ্পু গোলযোগ ও দাঙ্গা হাঙ্গামার মতো উদ্ভুত পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে দেশে ‘জরুরী অবস্থা’ জারি করার পরিকল্পনায় সচেষ্ট ছিলেন এমন আশংকার তথ্য একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে সরকারের নজরে গেলে দ্রুত তাঁর পদত্যাগের বিষয়টি সামনে আসে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে। সংবিধানের ১৪১(ক) অনুচ্ছেদ মতে ‘অভ্যন্তরিণ গোলযোগ, দাঙ্গা হাঙ্গামার মতো ঘটনা ঘটলে প্রধানমন্ত্রীর মতামত নিয়ে প্রেসিডেন্ট জরুরী অবস্থা জারি করার ক্ষমতা রাখেন’। পরিকল্পকদের ধারণা ছিল, ‘দাঙ্গার মতো চরম পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তখন সম্মতি দেবেন।’ জানা যায়, এমন কিছু তথ্য গোয়েন্দা সংস্থার হাতে আসার পর জাতীয় স্বার্থে নড়েচড়ে বসেন সকলে। এদিকে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু তার একান্ত মত তুলে ধরে বড় আকারের একটি সাক্ষাৎকার গত ১৯ জুলাই, ২০২৬ ‘দৈনিক ইনকিলাব’-এর অনলাইনে দ্রুত প্রকাশ করার জন্য পাঠিয়েছিলেন। যার হেডিং ছিল ‘আমি হঠাৎ কেন কোনো বিতর্কের সম্মুক্ষিণ হবো?’ নিজ দপ্তরের কাউকে না জানিয়ে প্রেসিডেন্ট তার সাক্ষাৎকারটি ‘ইনকিলাবে’ তাঁর ঘনিষ্ঠ একজন রিপোর্টারের হোয়ার্টসঅ্যাপ-এ সরাসরি পাঠান। দেশবাসিকে তিনি এর মাধ্যমে কিছু বার্তা দিতে চেয়েছিলেন। তারা দ্রুত সাক্ষাৎকারটি পত্রিকার সাইটে আপলোড করে দেন। তারপরই ঘটে মূল ঘটনা। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ধারণা, ‘জরুরী অবস্থা’ জারির পরিকল্পনার সাথে সরকারের ভেতরে থাকা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে ‘একটি নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলা হয়ে থাকতে পারে। এদিকে সরকার নিজেকে নিরাপদ রাখতে সন্দেহের তালিকায় থাকাদের চাকরি থেকে বিদায়ের উদ্যোগ নিয়েছে বলে প্রকাশ।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সাহাবু্িদ্দন চ্প্পুুর ওই সাক্ষাৎকারটি বর্তমান সরকারের জন্য ছিল অত্যন্ত ‘সেনসেটিভ’। সাক্ষাৎকারটি প্রকাশের দুই ঘন্টার মধ্যে শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থার একদল সদস্য মতিঝিল আর কে মিশন রোডের ইনকিলাব ভবনের বার্তা বিভাগে গিয়ে অবস্থান নেন। তারা বার্তা সম্পাদককে দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করেন। যেই রিপোর্টারের হোয়ার্টসঅ্যাপ-এ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু নিজে সাক্ষাৎকারটি পাঠিয়েছিলেন তার পরিচয় নিশ্চিত হয়ে ফোনে তার সঙ্গে কথা বলেন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর ওই রিপোর্টারের কাছে জানতে চাওয়া হয়। এর আগে তারা পত্রিকা অফিসে ঢূকেই সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর সাক্ষাৎকারটি অনলাইন থেকে দ্রুত নামিয়ে ফেলতে নির্দেশনা দেন। সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর সাক্ষাৎকারটি যতটা দ্রত আপলোড করা হয়েছিল তারচেয়েও দ্রুত সময়ে তা নামিয়ে ফেলা হয়েছে। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে ‘ইনকিলাবে’র সংশ্লিষ্ট রিপোর্টারের যোগাযোগ হলে তিনি জানান, ‘সাহাবুদ্দিন চুপ্পু তখনো ক্ষমতায় থাকায় তাঁর সাক্ষাৎকারটির গুরুত্ব ছিল অনেক। তথ্য উপাত্ত দেখে আমার মনে হয়েছে সরকারের সঙ্গে কোন সাংঘর্ষিক কিছু তাতে ছিল না। যা এখন অপ্রকাশিত থেকে গেলো। মাত্র দুই ঘন্টায় কিছু পাঠক এটি পড়তে পেরেছিলেন। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এটি তাঁর সর্বশেষ সাক্ষাৎকার।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সাক্ষাৎকারটির প্রকাশনা বন্ধ করার পরই সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে ২৩ জুলাই বৃহস্পতিবার বিকেলে পদত্যাগ করাবার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। দিল্লীতে ফোনালাপ আর সাক্ষাৎকারের বিষয়ে যোগসূত্র ছিল বলে মনে করছেন তারা। কিন্তু স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ তখন দেশের বাইরে থাইল্যান্ডে ছিলেন। উদ্যোগিরা ডেপুটি স্পিকারের কাছে পদত্যাগ করার কথা প্রস্তাব করার পর সিনিয়ররা দুইদিনের জন্য বিষয়টি ‘ঘোলাটে’ করতে চান না জানিয়ে স্পিকারের জন্য অপেক্ষা করার নির্দেশনা দেন। এদিকে বঙ্গভবনের দিকে নজরদারি বাড়ানো হয়। সরকারের পক্ষ থেকে স্পিকারকে দ্রুত দেশে আসতে ফোন করা হয়। ২৩ জুলাই বৃহস্পতিবার, বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা পর্যন্ত সাহাবুদ্দিন চ্প্পুুকে পদত্যাগ করতে বলা হয়নি বলে তিনি ঘনিষ্ঠ একজনকে ওইদিন রাতে ফোনে নিশ্চিত করেছিলেন। শুক্রবার সকাল ১১টায় ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ গুজবে কান দেবেন না।’ কিন্তু শুক্রবার বেলা ১১টার পর থেকে দ্রুত পদত্যাগ করাবার বিষয়টি সামনে আসতে থাকে। স্পিকার বেলা সোয়া তিনটার দিকে থাইল্যান্ড থেকে দেশে ফিরছেন এমনটা নিশ্চিত হবার পর দ্রুত শুক্রবার বিকেল ৫টায় পদত্যাগের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হয়। এতটা দ্রুততম সময়ে পদত্যাগের ঘটনা সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ধারণা করেননি।
সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ মতে, অসুস্থতা জনিত কারণে দায়িত্ব পালনে অপারগ হলে প্রেসিডেন্ট স্পিকার বরাবর স্বাক্ষর দিয়ে তা জানিয়ে পদত্যাগ করার বিধান। পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর স্পিকার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের মাধ্যমে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করার বিধান রয়েছে।
জানা গেছে, তৎকালিন প্রেসিডেন্ট মো: সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বিজি ২০১ ফ্লাইটে গত ৯ মে ২০২৬ ঢাকা থেকে লন্ডন যাত্রা করেছিলেন চিকিৎসার জন্য। ফিরে আসেন ১৮মে ২০২৬। এ সময় তার পরিবারের সদস্যরাও সঙ্গে যান। বিমানবন্দরে তাঁকে বিদায় জানান, আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান এবং ঢাকাস্থ যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত সারাহ কুক। জানা যায়, সাহাবুদ্দিন চুপ্পু লন্ডনে থাকা অবস্থায় দিল্লীতে অবস্থানরত বাংলাদেশের পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলার বিষয়টি চাউর হয়। তাদের দীর্ঘ ফোনালাপ বৃটিশ গোয়েন্দাদের নজরে আসার পর রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ আলাপের সামারি তারা ঢাকার সঙ্গে শেয়ার করার পর দ্রুত পাল্টে যায় পরিবেশ। সাহাবুদ্দিন চুপ্পু টেলিফোনে দিল্লীতে যা আলাপ করেছিলেন তা নিয়ে সরকারের মধ্যে নানা শংকা তৈরি হবার পরই ভেতরে ভেতরে পদত্যাগ করাবার প্রস্তুতি চলতে থাকে বলে জানা গেছে। তবে পদত্যাগের আগেই সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বেশ কয়েকবার ফোনালাপের বিষয় অস্বীকার করেন এবং তাঁর ভাষায় ‘মিথ্যা তথ্য’ পরিবেশনের জন্য দেশের দুটি দৈনিক পত্রিকাকে দায়ি করেন। কৌশলের অংশ হিসেবে সরকারের সিদ্ধান্তটি সাহাবুদ্দিন ”ুপ্পুকে জানানো হয় সর্বশেষ মুহূর্তে এবং খুব সংক্ষিপ্ত সময়ে।
এদিকে মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত শেখ হাসিনা একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তিনি আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে আসবেন। তখন দেশে গোলযোগ, দাঙ্গা হাঙ্গামার বড় আশংকা করা হয়। উদ্ভুত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বিদায়ি প্রেসিডেন্ট জরুরী অবস্থা ঘোষণা করলে অনেক কিছু সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবার মতো ঘটনা ঘটত বলে মনে করা হয়। এছাড়া প্রেসিডেন্ট সংবিধানের ক্ষমতাবলে যে কোন আদালত বা ট্রাইবুনাল কর্তৃক যে কোন দন্ডপ্রাপÍ আসামিকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। এজন্য তাঁর বরাবর একটা আবেদন করলেই সাংবিধানিক ক্ষমতায় তিনি দন্ডপ্রাপ্ত আসামিকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ ২০১৮ সালে দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসি মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি জোসেফকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। এর আগে প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান ২০১০ সালের ৭ সেপ্টেম্বর মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ২০ আসামিকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।
