কান নষ্ট ভয়ংকর শব্দে
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০১:১৩ এএম, ২৭ জুলাই ২০২৬ সোমবার
► হাইড্রোলিক হর্ন, মডিফাইড সাইলেন্সার ও হুটারের দৌরাত্ম্য ► কানের সূক্ষ্ম ‘হেয়ার সেল’ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
রাজধানীতে বায়ুদূষণের পাশাপাশি লাগামহীনভাবে বাড়ছে শব্দদূষণ। এর অন্যতম কারণ সড়কে অহেতুক হর্ন বাজানো, যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার, ব্যক্তিগত গাড়িতে হুটার এবং মোটরসাইকেলে মডিফাইড সাইলেন্সার লাগানো। এসব কারণে শব্দদূষণের মাত্রা প্রতিদিন বাড়ছে, যা নগরবাসীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনএপি) ‘ফ্রন্টিয়ার্স ২০২২ : নয়েজ, ব্লেজেস অ্যান্ড মিসম্যাচেস’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে শব্দদূষণে প্রথম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। আবাসিক এলাকায় অনুমোদনযোগ্য শব্দের মাত্রা ৫৫ ডেসিবেল এবং বাণিজ্যিক এলাকার জন্য ৭০ ডেসিবেল। অথচ ঢাকায় শব্দের মাত্রা পৌঁছেছে ১১৯ ডেসিবেলে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, মানুষের জন্য শব্দের সহনীয় মাত্রা ৫৫ থেকে ৬০ ডেসিবেল। অথচ দেশের বিভিন্ন ব্যস্ত সড়কে শব্দের তীব্রতা ৮০ থেকে ১২০ ডেসিবেল পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যা কানের পর্দা ও স্নায়ুর জন্য চরম ক্ষতিকর। স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের ধারণামতে, শব্দের মাত্রা ৮৫ ডেসিবেল বা তার বেশি হলে তা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর রূপ নেয়।
বুধবার সকাল ১০টা। আবদুল্লাহপুর থেকে বাসে উঠে কানে হেডফোন লাগান সজিব মিয়া। বাসে এভাবে হেডফোন লাগিয়ে রাখার কারণ জানতে চাইলে তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘প্রতিদিন এখানে জ্যামে আটকে থাকতে হয়। প্রাইভেট কার ও বাসের হর্ন এবং গাড়ির ইঞ্জিনের তীব্র শব্দে মাথা ভনভন করে। বড় বাসের হাইড্রোলিক হর্ন আরও বেশি ভোগায় আমায়। কিছুদিন আগে ডাক্তার দেখাতে হয়েছে। ডাক্তারই শব্দনিরোধক হেডফোন ব্যবহার করতে বলেছেন।
রাজধানীর বিমানবন্দর, মহাখালী, বাড্ডা, রামপুরা, কাকরাইল, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী, নিউমার্কেট, পুরান ঢাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সিগন্যালে সরেজমিন দেখা যায়, দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইনে যেন হর্ন বাজানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। বিমানবন্দর ও এর আশপাশের নির্দিষ্ট এলাকাকে ‘শব্দহীন এলাকা’ ঘোষণা করা হলেও দূরপাল্লার বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও লোকাল বাসগুলো সেই আইন মানছে না। বিমানবন্দর ছাড়াও উত্তরা ও আবদুল্লাহপুরে রাস্তার কাজ চলায় এবং দূরপাল্লার বাসগুলো রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকায় প্রতিদিনই দীর্ঘ যানজট লেগে থাকে। এ সময় যানজটে আটকে থাকা যানবাহনের চালকরা সামনে যেতে পারবেন না জেনেও ক্রমাগত হর্ন বাজাতে থাকেন। রাত হলে এখানে হর্নের শব্দ আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে ট্রাক ও বাসে হাইড্রোলিক হর্ন থাকায় এই শব্দ হয় আরও তীব্র।
ঢাকায় শব্দদূষণের অন্যতম আরেকটি কারণ হলো মোটরসাইকেলে মডিফাইড করে লাগানো সাইলেন্সার। দিনের বেলায় সড়কে এমন মোটরসাইকেল খুব একটা দেখা না গেলেও রাতের আঁধারে পুরো রাজধানী দাপিয়ে বেড়ায় এগুলো। উত্তরা, বনানী, ধানমন্ডি, বারিধারা, গুলশান, মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের মতো আবাসিক এলাকায় মডিফাইড সাইলেন্সার লাগানো মোটরসাইকেলের উৎপাত অনেক বেশি। মোটরসাইকেলের পাশাপাশি দামি প্রাইভেট কারেও অনেকে মডিফাইড সাইলেন্সার ব্যবহার করছেন।
মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টা। উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন ৫০ বছর বয়সি সলিম উদ্দিন। এ সময় বিকট শব্দ করে দ্রুত গতিতে ছুটে চলে ৪টি দামি মোটরসাইকেল। বিকট শব্দে তিনি কিছুক্ষণ দুই কান চেপে ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন। মোটরসাইকেলগুলো চলে যাওয়ার পর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশ এদের ধরে নিয়ে যায় না কেন? প্রতিদিন এভাবে শব্দ করে গাড়ি চালায়।
শব্দদূষণের ক্ষতি নিয়ে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক-কান-গলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. আবদুল হাফিজ শাফী বলেন, শব্দদূষণের কারণে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় শ্রবণশক্তির। দীর্ঘদিন উচ্চমাত্রার শব্দে থাকলে কানের সূক্ষ্ম ‘হেয়ার সেল’ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে ধীরে ধীরে শ্রবণশক্তি কমে যায়। অনেক রোগী কানে সারাক্ষণ ভোঁ-ভোঁ বা শোঁ-শোঁ শব্দ শোনার অভিযোগ নিয়ে আসেন। এটি শুধু বিরক্তিকরই নয়, বরং ঘুম, মনোযোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এদিকে গত ১৮ জুলাই শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও কঠোর ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেন সরকারপ্রধান। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত এআই ক্যামেরার মতো হর্ন নিয়ন্ত্রণেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করেন তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার শব্দদূষণ রোধে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ বিশেষ অভিযান চালায়। অভিযানে ট্রাফিক পুলিশ অবৈধ হাইড্রোলিক হর্ন, অনুমোদনহীন হুটার, বিকন লাইট, ভিআইপি লাইট এবং শব্দদূষণ সৃষ্টিকারী অন্যান্য সরঞ্জাম অপসারণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট যানবাহনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
