কানাডায় বন্দুক সহিংসতা
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০২:৫১ এএম, ২৩ জুলাই ২০২৬ বৃহস্পতিবার
কানাডা বিশ্বের নিরাপদ দেশগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভ্যন্তরীণ সহিংসতা জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। দুই বৃহত্তম মহানগর টরন্টো ও মন্ট্রিয়ল সহ দেশটির নানা স্থানে বন্দুক সহিংসতার ঘটনা আতঙ্ক বাড়িয়েই চলেছে।এসব ঘটনায় পুলিশ ও সরকার অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র এবং সংঘবদ্ধ অপরাধকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করতে বাধ্য হয়েছে। স্ট্যাটিসটিকস কানাডা এখনও গেলবছরের (২০২৫) পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি। সর্বশেষ ২০২৪ পূর্ণ বছরের হিসেবে কানাডায় ৭৮৮টি হত্যাকাণ্ড নথিভুক্ত হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, কানাডার সাম্প্রতিক বন্দুক-সহিংসতার বড় অংশই সংগঠিত অপরাধচক্র, বাইকার গ্যাং, মাদক পাচার, অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালান এবং নিজেদের মধ্যকার গ্যাং-সংঘর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিছু ক্ষেত্রে মানবপাচার ও অর্থপাচারের মতো আন্তঃসংযুক্ত অপরাধও এই সহিংসতার পেছনে ভূমিকা রাখে।
কানাডার সবচেয়ে জনবহুল শহর টরন্টোতে বন্দুক-সংক্রান্ত সহিংসতার হার ঐতিহাসিকভাবে মন্ট্রিয়লের তুলনায় বেশি। বিশেষ করে গ্যাং-সংঘর্ষ, লক্ষ্যভিত্তিক হামলা এবং অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার টরন্টো পুলিশের জন্য দীর্ঘদিনের ভাবনার বিষয়। গত ১১ জুলাই শনিবার সন্ধ্যা-রাতে টরন্টোর St. Clair Avenue West ও Arlington Avenue এলাকায় দুই ব্যক্তির মধ্যে গোলাগুলিতে দুইজন নিহত ও কয়েকজন আহত হওয়ার ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে যে জনসমাগমপূর্ণ এলাকাও ঝুঁকিমুক্ত নয়। Salsa on St. Clair নামে লাতিন সাংস্কৃতিক উৎসবে এই ঘটনা ঘটে।
এদিকে, মন্ট্রিয়লের কোট-দে-নিজ এলাকায় সাম্প্রতিক গোলাগুলিতে এক পুলিশ কর্মকর্তা, এক সাধারণ নাগরিক এবং বন্দুকধারীর মৃত্যু কানাডাজুড়ে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কানাডা সরকার অস্ত্র নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠোর করার নীতি অনুসরণ করার পরও একের পর এক এসব ঘটনা ঘটে চলেছে! প্রায়ই গোলাগুলির শব্দে নানা শহর, নানা প্রান্তর আতংকময় হয়ে উঠছে।
এটি সত্যি, কানাডা প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কম বন্দুক-সহিংসতার দেশ হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় শহরগুলোতে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, গ্যাং-সংঘাত এবং লক্ষ্যভিত্তিক হামলার সংখ্যা বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চরমপন্থী মতাদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত বিচ্ছিন্ন হামলার আশঙ্কাও। অব্যাহতভাবে অনেকটা বেপরোয়া গাড়ি চুরির ঘটনাও নাগরিকদের ভাবিয়ে তুলছে।
অস্ত্রের বৈধ মালিকানা থাকলেও জননিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে বলে যদিও ফেডারেল সরকারের অবস্থান স্পষ্ট। আর এ লক্ষ্যেই সরকার গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপও নিয়েছে। যেমন, সামরিক ধাঁচের (assault-style) ১,৫০০-এরও বেশি মডেলের আগ্নেয়াস্ত্র নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এসব অস্ত্র জনসাধারণের কাছ থেকে সরিয়ে নিতে ক্ষতিপূরণভিত্তিক কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। হ্যান্ডগানের বাজার আরও সীমিত করা হয়েছে। সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র পাচার ঠেকাতে এবং গ্যাং দমনে অতিরিক্ত বিনিয়োগ করা হয়েছে। কমিউনিটি-ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অর্থায়ন বাড়ানো হয়েছে।
মন্ট্রিয়লের সাম্প্রতিক হামলার পর এখানের মেয়র সোরায়া মার্টিনেজ ফেরাদা প্রশ্ন তুলেছেন, ২০২৬ সালেও কীভাবে কেউ একটি রাইফেল নিয়ে প্রকাশ্যে গুলি চালাতে পারে? তিনি বিশেষ করে বড় শহরগুলোর জন্য আরও কঠোর অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের দাবি জানান। একই সঙ্গে বন্দুক নিয়ন্ত্রণপন্থী সংগঠনগুলো এসকেএস (SKS) ধরনের রাইফেলের নতুন বিক্রি বন্ধের দাবি পুনরায় তুলেছে। যদিও তদন্তে ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি, ঘটনাটি বিদ্যমান আইনের কিছু ফাঁকফোকর নিয়ে নতুন আলোচনার সৃষ্টি করেছে। পুলিশের মতে, শুধু বৈধ অস্ত্র নয়, অবৈধ অস্ত্রের প্রবাহও বড় উদ্বেগের বিষয়।
বিশেষ করে টরন্টো পুলিশ জানিয়েছে, তারা যে অপরাধে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে তার প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশের উৎস যুক্তরাষ্ট্র। ফলে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা এখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যতম অগ্রাধিকার। মন্ট্রিয়লে হামলার পর পুলিশ সম্ভাব্য ‘কপিক্যাট’ বা অনুকরণমূলক হামলার ঝুঁকির বিষয়েও সতর্কতা জারি করেছিল।
কানাডায় আগ্নেয়াস্ত্র রাখতে হলে লাইসেন্স, নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই এবং কঠোর সংরক্ষণবিধি মানতে হয়। আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে সাধারণভাবে আগ্নেয়াস্ত্র বহনের অনুমতি নেই। তবুও অপরাধে ব্যবহৃত অনেক অস্ত্র অবৈধভাবে পাচার হয়ে আসে অথবা আইনগত ব্যবস্থার দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে অপরাধীদের হাতে পৌঁছে যায়।
সম্প্রতি মন্ট্রিয়লের পুলিশ কর্মকর্তা ও নিরীহ নাগরিকের মৃত্যু শুধু একটি অপরাধের ঘটনা নয়; এটি কানাডার জননিরাপত্তা ব্যবস্থার সামনে নতুন প্রশ্নও তুলে ধরেছে। একদিকে বৈধ অস্ত্রের অধিকার, অন্যদিকে নাগরিক ও পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা — এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
উল্লেখ্য, মন্ট্রিয়লে গত ২২ জুন বন্দুকধারীর হামলায় এক পুলিশ কর্মকর্তা, একজন সাধারণ নাগরিক এবং হামলাকারী নিহত হয়। এ ঘটনায় এক মহিলা পুলিশ কর্মকর্তাও গুরুতর আহত হন। এসময় এক সশস্ত্র ব্যক্তির মারমুখী ঘটনায় সাড়া দিতে গিয়ে পুলিশ এই রক্তক্ষয়ী ঘটনার শিকার হয়। ঐদিন নগরের কোট-ডে-নিজ এলাকার ট্রান্স আইল্যান্ড অ্যাভিনিউ (Trans Island Ave.) ও দ্য কুর্ত্রে অ্যাভিনিউ (de Courtrai Ave.) সংলগ্ন এলাকায় তিন ঘন্টা ব্যাপী এই লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে। এতে নগরবাসী সারাদিন ভয়ার্ত সময় কাটান। বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে ‘Armed Threat’ সতর্কতা জারি করা হয়। বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে অবস্থান করতে, দরজা-জানালা লক করে রাখতে এবং জানালা থেকে দূরে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনে বাইরে বের না হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে সন্দেহভাজন হামলাকারীকে সামরিক ধাঁচের পোশাক ও দীর্ঘ আগ্নেয়াস্ত্রসহ দেখা গেছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, হামলাকারী আলবার্টা থেকে আগত। সরকারের পক্ষ থেকে এই ঘটনাকে সন্ত্রাসী হামলা নয় বলে বলা হয়েছে। শোকের নিদর্শন হিসেবে সমগ্র কুইবেকে তখন প্রাদেশিক পতাকা অর্ধনমিত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়।
এদিকে এই বন্দুকধারী কেন আলবার্টা থেকে এই এলাকা বাছাই করেছিল, একটি নামী হোটেল হিলটনে এত ভারী অস্ত্র নিয়ে ঢুকলো কেমন করে, কে/কারা ছিলেন কিংবা কি ছিল তার টার্গেট, সে কি এই উদ্দেশ্যেই বের হয়েছিল, নিজেকে ‘incel’ (involuntary celibate) মতাদর্শের অনুসারী হিসেবে দেখতো বলা হচ্ছে তাহলে এই মানসিকতাই কি এই ঘটনাকে টেনে এনেছিল? পাশেই ছিল একটি জুইস স্কুল ও একটি পাবলিক ইলিমেন্টারি স্কুল, একটি ঘনবসতি আবাসিক জনপদ, একটি বড় সুপার স্টোর সহ অনেকগুলো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান - তদন্তকারীরা এসব অনেকগুলো বিষয় নিয়ে এগুচ্ছেন বলে পুলিশ বিভাগের তথ্যবিবরনীতে জানানো হয়েছে। মন্ট্রিয়ল পুলিশের সাথে কুইবেকের স্বতন্ত্র তদন্তকারী সংস্থা ঘটনার তদন্ত করছে। তদন্ত সহায়তায় আছে আলবার্টার লেথব্রিজ পুলিশ।
প্রকাশিত তথ্যে জানানো হয়, সন্দেহভাজন হামলাকারী হলো সেথ স্কট হ্যাটফিল্ড ( Seth Scott Hatfield ), বয়স ২৫। হ্যাটফিল্ড আলবার্টার লেথব্রিজ শহরের বাসিন্দা, বিশ্ববিদ্যালয়-গ্র্যাজুয়েট। অন্য দু’জন হলেন মন্ট্রিয়ল পুলিশ কর্মকর্তা মোহামেদ লামিন বেনরেদুয়ান (Mohamed Lamine Benredouane), বয়স ৩৪ এবং পথচারী মাইকেল মোশে মিজরাহি ( Michel Moshe Mizrahi ), বয়স ৬৮, যিনি গোলাগুলির মধ্যে পড়ে নিহত হন।
মাইকেল মোশে মিজরাহি একজন ইহুদি সম্প্রদায়ের সদস্য এবং পেশায় স্যুট বিক্রেতা ছিলেন। তিনি মন্ট্রিয়লের ইহুদি সম্প্রদায়ের একজন পরিচিত সদস্য এবং স্থানীয় সিনাগগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মিজরাহি লেবাননে জন্মগ্রহণ করেন, পরে ইসরায়েলে এবং এরপর মন্ট্রিয়লে বসবাস শুরু করেন বলে জানা গেছে। তিনি তার ত্রিশোর্ধ্ব এক ছেলে এবং ইসরায়েলে বসবাসরত দুই মেয়েকে রেখে গেছেন।
পুলিশ কর্মকর্তা মোহামেদ লামিন বেনরেদুয়ান ২০২১ সালে SPVM-এ যোগ দিয়েছিলেন। আলজেরীয় বংশোদ্ভূত বেনরেদুয়ান ৩ বছর বয়সী এক সন্তানের জনক ছিলেন এবং তাঁর দ্বিতীয় সন্তান পৃথিবীতে আসার অপেক্ষায় ছিল। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নগরের সমস্ত পুলিশ স্টেশনের পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়।
এছাড়া, কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত পুলিশ কর্মকর্তা মোহামেদ লামিন বেনরেদুয়ান (Mohamed Lamine Benredouane )কে গত ৭ জুলাই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। শহরের কেন্দ্রস্থলে আয়োজিত শোকযাত্রায় প্রায় পাঁচ হাজার পুলিশ সদস্য, দমকলকর্মী ও প্যারামেডিক অংশ নেন। ব্যাগপাইপের করুণ সুরের মধ্যে শ্বেতপুষ্পে সাজানো শোকমিছিল মন্ট্রিয়ল পুলিশ সদরদপ্তর থেকে বেল সেন্টারের দিকে অগ্রসর হয়। পথে হাজারো মানুষ দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানান। বেনরেদুয়ানের পরিবারের ইচ্ছা অনুযায়ী অনুষ্ঠানের সূচনা হয় পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত তেলাওয়াতের মাধ্যমে। পরিবারের একজন সদস্য আয়াতটি পাঠ করেন: “যে ব্যক্তি একজন মানুষের জীবন রক্ষা করে, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।” কিছুক্ষণের জন্যে একসাথে হাজারো সেলফোনের ফ্লাশলাইট জ্বালিয়ে স্মরণ করা হয় নিহত এই দায়িত্বশীল, নির্ভীক পুলিশ সদস্যকে।
নিহত পুলিশ কর্মকর্তা মোহামেদ লামিন বেনরেদুয়ানক গত ২৪ জুন সমাহিত করা হয়। সেদিন সকালে Islamic Centre of Quebec-এ তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তাঁকে Muslim Cemetery of Laval-এ দাফন করা হয়। জানাজায় বিপুল সংখ্যক শোকার্ত মানুষের উপস্থিতি ছিল। প্রচুর প্রবাসী বাংলাদেশিও এতে যোগ দেন। ২০০২ সালের পর এই প্রথম দায়িত্ব পালনকালে মন্ট্রিয়ল পুলিশের কোনো সদস্য প্রাণ হারান।
স্ট্যাটিসটিকস কানাডার সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪ সালে পুলিশের নথিভুক্ত সহিংস অপরাধের ২.৬ শতাংশে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে। এটি ২০২৩ সালের তুলনায় সামান্য কম হলেও এক দশক আগের তুলনায় বেশি। একই সঙ্গে সীমান্তে অবৈধ অস্ত্র জব্দের সংখ্যা এবং থ্রিডি-প্রিন্টেড অবৈধ অস্ত্র নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার কঠোর আইন, অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ এবং সীমান্ত নজরদারি জোরদারের পথে এগোলেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়। অবৈধ অস্ত্রের প্রবাহ রোধ, চরমপন্থা প্রতিরোধ এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সহিংসতা কমানোর সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে কানাডাকে আরও নিরাপদ রাখার সবচেয়ে কার্যকর পথ।
- মন্ট্রিয়ল
