জামায়াত থেকে বহিষ্কারের পর গাজী নজরুল ইসলামের এমপি পদ কি থাকবে?
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০১:৫৪ এএম, ২৩ জুলাই ২০২৬ বৃহস্পতিবার
জামায়াতে ইসলামী সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ‘নৈতিক স্খলন’-এর অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কার করলেও তার সংসদ সদস্য পদ তাৎক্ষণিকভাবে শূন্য হবে কি না, তা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংবিধানে দলত্যাগ ও সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে আসন শূন্য হওয়ার বিধান স্পষ্ট থাকলেও, নির্বাচিত হওয়ার পর দলীয় বহিষ্কারের পরিণতি নিয়ে সরাসরি ব্যাখ্যা নেই।
বুধবার বিকেলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দলটির ভাষ্য, তাকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর বিষয়ে সাংগঠনিক তদন্তে ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ায় গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এ সিদ্ধান্তের পরই প্রশ্ন উঠেছে, দল থেকে বহিষ্কৃত হলে তার সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে কি না। বিষয়টি সরল নয়; কারণ সংবিধানের একাধিক ধারা এখানে প্রাসঙ্গিক, আর সেগুলোর ব্যাখ্যা নিয়েই আইনজ্ঞ ও নির্বাচন–সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা যাচ্ছে।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য যদি সেই দল থেকে পদত্যাগ করেন বা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে তার আসন শূন্য হবে। অন্যদিকে ৬৬ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্য হওয়ার এবং সদস্য পদে থাকার অযোগ্যতার যে কারণগুলো বলা আছে, তার মধ্যে ‘নৈতিক স্খলনজনিত’ ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ড পাওয়ার বিষয়টি রয়েছে। মুক্তির পর পাঁচ বছর না পেরোলে সেই অযোগ্যতা বহাল থাকে।
এই অবস্থায় শুধু দলীয় বহিষ্কার বা নৈতিকতার অভিযোগ নিজে থেকেই সংসদ সদস্য পদ হারানোর কারণ কি না, সেটিই এখন মূল বিতর্ক। কারণ সংবিধানে দল থেকে ‘পদত্যাগ’ এবং ‘বিপক্ষে ভোট’ নিয়ে স্পষ্ট ভাষা আছে, কিন্তু দল যদি কোনো সদস্যকে বহিষ্কার করে, সে ক্ষেত্রে কী হবে—সেটি সরাসরি উল্লেখ নেই।
নির্বাচনী আইন অনুসারে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে হলে প্রার্থীকে হয় কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনীত হতে হয়, নয়তো স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হয়। দলীয় মনোনীত প্রার্থী নির্বাচিত হলে তিনি সংসদে দলীয় সদস্য হিসেবেই বিবেচিত হন। এ জায়গা থেকেই এক পক্ষ বলছে, দল থেকে বহিষ্কারের পর তার সদস্য পদও প্রশ্নের মুখে পড়ে। অন্য পক্ষের মত, সংবিধানে যেহেতু বহিষ্কারের বিষয়ে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নেই, তাই শুধু দলীয় সিদ্ধান্তে আসন শূন্য হবে না।
সংসদবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদের মতে, জামায়াত গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কার করলেও এতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার সংসদ সদস্য পদ যাবে না। তার ব্যাখ্যায়, ‘নৈতিক স্খলন’–সংক্রান্ত কোনো বিষয় সংসদীয় অনুসন্ধান বা প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হলে তখন পদ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে সে ক্ষেত্রেও তদন্ত প্রয়োজন হবে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিকের অবস্থানও তাৎক্ষণিক পদ শূন্য হওয়ার পক্ষে নয়। তার মতে, কোনো সংসদ সদস্য দল থেকে বহিষ্কৃত হলেই পদ খোয়াবেন—এমন স্পষ্ট বিধান নেই। তিনি মনে করেন, সদস্য পদ হারানোর প্রশ্ন মূলত তখনই ওঠে, যখন কেউ দল থেকে পদত্যাগ করেন, সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেন, অথবা নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে দুই বছরের বেশি কারাদণ্ড পান।
তবে এ বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন। তার মতে, দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্যকে দল বহিষ্কার করলে তার সদস্য পদ বহাল থাকার কথা নয়। কারণ, নির্বাচনের পর তার আর স্বতন্ত্র সদস্যে পরিণত হওয়ার সুযোগ নেই। এই যুক্তি থেকে তিনি মনে করেন, গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রেও আসন শূন্য হওয়ার প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
সংবিধান অনুযায়ী, ৭০ অনুচ্ছেদের আলোকে কোনো সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হবে কি না—এ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে যাবে এবং কমিশনের সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত। জামায়াতে ইসলামী জানিয়েছে, গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কারের বিষয়টি তারা নির্বাচন কমিশনকে জানাবে।
আগে কি এমন নজির ছিল
বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে এ ধরনের কিছু নজিরও রয়েছে। অষ্টম জাতীয় সংসদে বিএনপি থেকে নির্বাচিত আবু হেনাকে দল বহিষ্কার করলেও তিনি সংসদ সদস্য পদে বহাল ছিলেন। সে সময় স্পিকার তার আসন বহাল রাখার সিদ্ধান্ত দেন। তবে সেই ঘটনা ২০০৮ সালের আগের, যখন নির্বাচনী আইন ও রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের কাঠামোয় পরবর্তী পরিবর্তনগুলো আসেনি।
দশম সংসদে আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর ঘটনা নতুন করে একই প্রশ্ন তুলেছিল। ২০১৪ সালে তাকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হলে তার সদস্য পদ থাকবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। আওয়ামী লীগ তখন সদস্য পদ বাতিলের পক্ষে যুক্তি দেয়, আর লতিফ সিদ্দিকী বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সংবিধানে বর্ণিত অযোগ্যতার মধ্যে পড়ে না। পরে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে গেলেও কমিশনকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে হয়নি; কারণ তিনি নিজেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি পদত্যাগপত্র দেন এবং ৩ সেপ্টেম্বর তার আসন শূন্য হওয়ার বিষয়টি সংসদকে জানানো হয়।
গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে বিতর্কের সূত্রপাত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর। সোমবার বিকেল থেকে ভিডিওগুলো ছড়িয়ে পড়লে শুরুতে তার সমর্থকদের কেউ কেউ দাবি করেন, সেগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই–নির্ভরভাবে তৈরি। তবে পরদিন কয়েকটি তথ্যযাচাইকারী প্রতিষ্ঠান জানায়, ভিডিওগুলো এআই–সৃষ্ট নয়।
বিতর্কের মধ্যে গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেন, ভিডিওতে থাকা তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতেই তিনি সম্প্রতি ওই বিয়ে করেছেন। কিন্তু পরে কথিত কাবিননামার বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কাবিননামায় নাম থাকা কাজী বলেছেন, বিয়ে কোথায় হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি জানেন না; একই সঙ্গে তিনি পুরোনো তারিখ বসিয়ে কাবিননামা তৈরির কথাও স্বীকার করেন।
সব মিলিয়ে এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, দলীয় বহিষ্কার একাই গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ শূন্য করার জন্য যথেষ্ট কি না। বিদ্যমান আইন, সাংবিধানিক ব্যাখ্যা এবং আগের নজির—তিন ক্ষেত্রেই একক ও স্পষ্ট অবস্থান নেই। ফলে জামায়াতের বহিষ্কার–সিদ্ধান্তের পর বিষয়টি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন বা সাংবিধানিক ব্যাখ্যার স্তরেই গড়াতে পারে।
গাজী নজরুল ইসলাম ৭৪ বছর বয়সী। সাতক্ষীরা-৪ আসনে তিনি প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ১৯৯১ সালে। বর্তমান মেয়াদে তিনি তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হন। তিনি জামায়াতের সাতক্ষীরা জেলা শাখার আমির ছিলেন এবং দলের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্যও ছিলেন। বহিষ্কারের বিষয়ে তার সর্বশেষ প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি।



