হাসিনার ফেরা নিয়ে সরব রাজনীতি
মাসুদ করিম, ঢাকা থেকে
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০২:০৭ এএম, ১৮ জুলাই ২০২৬ শনিবার
শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্সের কাছে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই ঘোষণা দেন। যদিও বাংলাদেশের কোনও সংবাদপত্র কিংবা টেলিভিশনে এই খবর প্রকাশ হয়নি। কারণ শেখ হাসিনা মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত। তার বক্তব্য প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আদালত। রয়টার্সে সাক্ষাৎকারটি টেলিফোন ভয়েসে রেকর্ড করেছেন সংবাদ সংস্থাটির দিল্লি অফিসের একজন সাংবাদিক। শেখ হাসিনার বক্তব্য বাংলাদেশের মূলধারার কোনও গণমাধ্যম প্রকাশ না করলেও তার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া প্রায় সবাই প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি একাট্টা। সবাই শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন।
মূল ধারারগণমাধশেশেখ হাসিনা কি সত্যি সত্যি দেশে ফিরে ফাঁসির দড়ি গলায় পরবেন -- এই প্রশ্ন রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। অনেকেই এটা বিশ্বাস করছেন না। তাদের যুক্তি হলো, তিনি যেভাবে বলেছেন যে তিনি ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। এখন জনমনে প্রশ্ন হলো, তিনি যদি আদালতে আত্মসমর্পণ করেন তবে এত বেশি দেরীতে কেন তা করবেন। এখনই তিনি তা করতে পারেন। ছয় মাস পর শেখ হাসিনার কথা একটুও ঊনিশ কিংবা বিশ হবে না -- এটা ভাবা যায়না।
শেখ হাসিনা তবে কেন এই ঘোষণা দিলেন এমন প্রশ্ন এখন জনমনে ঘুরছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্রদের নেতৃত্বে পরিচালিত এক অভ্যূত্থানের মাধ্যমে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বিশেষ ব্যবস্থায় ভারতে গিয়ে নিজেকে আত্মরক্ষা করেছেন। যিনি জীবন রক্ষা করার জন্যে অন্য দেশে চলে গিয়েছেন; সেই তিনিই একেবারে অকাতরে নিজের জীবন দিতে সম্মত হলেন এটাও বিশ্বাসযোগ্য নয়। শেখ হাসিনা ভারতের প্রকৃত বন্ধু। তাই ভারত তাকে বিপদে ফেলার জন্যে এমনটি করতে পারে সেটিও বিশ্বাস যোগ্য নয়।
বর্তমানে শেখ হাসিনা ভারতে আছেন। তার সকল কিছু এখন ভারত দেখাশোনা করছে। ফলে ভারতের পরামর্শ ছাড়াই তিনি দেশে ফেরার সময়সীমা উল্লেখ করে বক্তব্য দিয়েছেন সেটিও বিশ্বাসযোগ্য নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই ভারতের পরামর্শেই শেখ হাসিনা রয়টার্সে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বলে মনে করাটা যৌক্তিক। এখন প্রশ্ন হলো, ভারতই কেন শেখ হাসিনাকে দিয়ে এই ধরনের বক্তব্য দেওয়াবে। কারও কারও ধারণা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের কাছে ভারতের অনেক কিছুই প্রত্যাশা ছিলো। কিন্তু সেই প্রত্যাশায় হোচট খেয়েছে তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ভারতের আগে চীন সফর করেছেন। এটা ঠিক, ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হবার পর তারেক রহমানের মা বেগম খালেদা জিয়া প্রথম সফরে চীন গিয়েছিলেন। তারপর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়েও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে প্রথমে চীন সফরে যান। কিন্তু সেই সময় এখন অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। বিগত ১৭ বছর শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় থেকে ভারতের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ভারতের প্রায় সকল উদ্বেগ নিরসন করেন। সে কারণে বড় প্রতিবেশি হিসাবে ভারতের প্রত্যাশা ছিলো যে, তারেক রহমান ভারতেই প্রথমে যাবেন।
ঢাকার কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম সফরে চীন যাননি। তার প্রথম সফর ছিলো মালয়েশিয়া। তারপর গ্রীস্মকালীন দাবস সম্মেলনে যোগদানের লক্ষ্যে চীন যান। সেই অর্থে চীন সফর কোনও দ্বিপক্ষীয় সফর নয়। এটা পরবর্তিতে দ্বিপক্ষীয় চরিত্র পেয়েছে।
ভারত এখন আশা করছে যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অন্তত জুলাই মাসে যেন ভারত সফর করেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, সৌদি আরব থেকে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সফরে যাবার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে রেড সী ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি সৌদি কোম্পানী বাংলাদেশে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে বলে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখনই ভারত যাচ্ছেন না। অবশ্যই সৌদি আরবে বহুমুখী স্বার্থ জড়িত থাকায় তিনি সৌদি যাবেন।
অনেকে অনুমান করেন যে, বাংলাদেশে এখনও ভারতবিরোধী জোয়ার থামেনি। এই অবস্থায় ভারত সফরে গিয়ে শূন্য হাতে ফিরে আসাটা প্রধানমন্ত্রীর জন্যে সম্মানজনক হবে না। অন্তত পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে গঙ্গা চুক্তির নবায়ন হলেও একটা কিছু অর্জন থাকে। এ ব্যাপারে ভারতের কাছ থেকে তেমন কোনও সাড়া মিলেছে বলে জানা যায়নি। ফলে ভারতের উপদেশে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার কথা জানিয়ে রয়টার্সকে সাক্ষাৎকার দিয়ে থাকবেন। এভাবে বাংলাদেশে একটি ঢিল ছোড়ে তার প্রতিক্রিয়া দেখতে চাইছে ভারত। সমুদ্রে ঢিল ছোঁড়লে যেমন ঢেউ ওঠে; ঠিক তেমনি। এখন দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে শেখ হাসিনা অনেকটা আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়েছেন।
কেউ কেউ এখন বলছে যে, শেখ হাসিনার পাসপোর্ট সরকার জব্দ করেছে। তাই তার পক্ষে বিমানে বাংলাদেশে ফেরা সম্ভব নয়। শেখ হাসিনা এখন শুধু বেনাপোল দিয়ে দেশে প্রবেশ করার চেষ্টা করতে পারে। সে ক্ষেত্রে, সীমান্তে আসার পর পরই তিনি গ্রেফতার হবেন এটা স্বাভাবিক। এখন মৃত্যুদন্ডে দন্ড পাওয়া শেখ হাসিনা বাংলাদেশে যাতে আপিল করতে না পারেন সেই ব্যবস্থা করার জন্যে আহ্বান জানিয়েছেন এনসিপি’র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তবে বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে আদালতের এখতিয়ার।
এই মূহুর্তে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে আসাটা কঠিন হবে। তাছাড়া, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধির জয়সোয়াল এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের বিষয়টির ফয়সালা হবে আইনের মাধ্যমে। ফলে এটা স্পষ্ট যে, ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা ফিরে আসছেন না। কারণ আইনি জটিলতা নিরসন করা কঠিন বিষয়। এই জটিলতা নিরসনে কত সময় লাগবে সেটা কোনও সময়সীমা নেই।
