এবার লোহিত সাগর বন্ধে হুথিদের প্রস্তুতির নির্দেশ দিল ইরান
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০১:৪১ এএম, ১৭ জুলাই ২০২৬ শুক্রবার
যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তাহলে লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার জন্য ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি বিদ্রোহীদের প্রস্তুত থাকতে বলেছে তেহরান।
ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা তিনটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। যদি এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর এর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিষয়টি ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে হুথিদের কাছে এ-সংক্রান্ত বার্তাও পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কথা বলা দুই জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা এবং একটি আঞ্চলিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তবে কীভাবে বার্তাটি পাঠানো হয়েছে কিংবা মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দেওয়ার আগে নাকি পরে এটি পাঠানো হয়েছে- সে বিষয়ে তারা বিস্তারিত কিছু জানাননি।
রয়টার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং হুথি মুখপাত্র তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি।
বাব আল-মান্দেবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোতায়েন
হুথিদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, সংগঠনটি লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে জাহাজ চলাচল লক্ষ্য করে হামলার পূর্ণ প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
সূত্রটির দাবি, ইয়েমেনের হোদেইদা অঞ্চল ও এডেন উপসাগর সংলগ্ন পার্বত্য এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোতায়েন করা হয়েছে। এখন শুধু হামলা শুরুর নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে হুথি যোদ্ধারা।
এছাড়া ইয়েমেনে অবস্থানরত ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) প্রতিনিধিরাই কখন বাব আল-মান্দেব প্রণালী কার্যত বন্ধ করা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বলেও দাবি করেছে সূত্রটি।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন সংকটের আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ইতোমধ্যেই হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে যদি বাব আল-মান্দেব প্রণালীও অচল হয়ে পড়ে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি প্রধান তেল রফতানি পথ একই সময়ে বাধাগ্রস্ত হবে।
এর ফলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহ আরও সংকুচিত হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকট নতুন মাত্রা পেতে পারে।
সৌদি আরবের জন্যও বাড়ছে ঝুঁকি
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল সৌদি আরবের পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৭ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হচ্ছে।
গাজা যুদ্ধ চলাকালে হুথিদের হামলার কারণে বহু আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি লোহিত সাগরের পরিবর্তে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথে পণ্য পরিবহন করতে বাধ্য হয়েছিল।
এখন যদি ইয়ানবু বন্দর বা লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচল সরাসরি হামলার মুখে পড়ে, তাহলে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সৌদি-হুথি উত্তেজনা আবারও বেড়েছে
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যকার উত্তেজনাও আবার বৃদ্ধি পেয়েছে।
হুথিরা অভিযোগ করেছে, সোমবার তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বিমানবন্দরে সৌদি আরব বিমান হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে তারা সৌদি আরবের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এতে দুই পক্ষের মধ্যে চার বছর ধরে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতিও ভেঙে যায়।
ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফট-এর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক টরবিয়র্ন সলভেদত বলেন, এই সংঘাত এমন সময়ে নতুন করে শুরু হয়েছে, যখন অঞ্চলটি ইতোমধ্যেই চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তার মতে, যদি সংঘাত আরও তীব্র হয়ে লোহিত সাগরের জ্বালানি অবকাঠামো ও জাহাজ চলাচলে ছড়িয়ে পড়ে, তবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রফতানির বিকল্প প্রধান পথটিও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
রিয়াদের উদ্বেগ
রিয়াদের ঘনিষ্ঠ দুটি আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরব ইরান ও হুথিদের এই হুমকিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
তাদের দাবি, সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট হয়েছে যে, লোহিত সাগরসংক্রান্ত কৌশলগত সিদ্ধান্তে হুথিরা এখন আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় ইরানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয় করছে।
সংঘাতের পটভূমি
চলমান সংঘাতের সূত্রপাত হয় চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। এর জবাবে তেহরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়।
পরবর্তীতে জুন মাসে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে হওয়া নাজুক যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়লে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা আবারও বেড়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব- এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ একসঙ্গে অচল হয়ে পড়ে, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং নৌপরিবহন ব্যবস্থায় নজিরবিহীন সংকট সৃষ্টি হতে পারে। সূত্র: রয়টার্স
