টিকটকার সুলতানা ও রুবেল দোষী সাব্যস্ত
আজকাল রিপোর্ট
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০২:৫০ এএম, ১১ জুলাই ২০২৬ শনিবার
টিকটকে চলা তীব্র দ্বন্দ্বের জেরে এক ব্যক্তিকে অপহরণ, মারধর ও অপমানের ঘটনায় কুইন্সের বাসিন্দা সুলতানা রাজিয়াকে (৪০) দোষী সাব্যস্ত করেছে ব্রুকলিন ফেডারেল আদালতের একটি জুরি। ফেডারেল প্রসিকিউটরদের অভিযোগ অনুযায়ী, সুলতানা রাজিয়া তার বাংলাদেশি কমিউনিটির এক ব্যক্তির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চলা টিকটক বিরোধের জেরে ওই ব্যক্তির অপহরণ ও নির্যাতনে অংশ নেন। একই মামলায় সহ-আসামি সৈয়দ রুবেল আহমেদও অপহরণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।
মামলার ভুক্তভোগী মোবারক দেওয়ানকে ২০২৩ সালের ২৭ মার্চ কুইন্সের জ্যামাইকা এলাকায় খাবার কিনে বাড়ি ফেরার সময় অপহরণ করা হয় বলে ফেডারেল প্রসিকিউটররা আদালতে জানান। অভিযোগ অনুযায়ী, কুইন্সের সুপারমার্কেট ব্যবসায়ী আবু চৌধুরী তাকে একটি গাড়িতে জোর করে তুলে নেন এবং কয়েক ঘণ্টা ধরে কুইন্সের বিভিন্ন এলাকায় ঘোরানো হয়। প্রসিকিউটরদের দাবি, দেওয়ানকে মারধর করা হয়, মাদক মেশানো পানি পান করানো হয়, কাপড় খুলে ফেলা হয় এবং একটি আবাসিক এলাকার রাস্তায় নগ্ন অবস্থায় দাঁড় করিয়ে ভিডিও ধারণ করা হয়।
ফেডারেল প্রসিকিউটর জন ভ্যাজেলাটোস আদালতে বলেন, এটি শুধু অপহরণ ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ছিল না; বরং ভুক্তভোগীকে প্রকাশ্যে অপমান করার একটি প্রচেষ্টাও ছিল। তিনি জুরিকে বলেন, সুলতানা রাজিয়ার জন্য শুধু অপহরণ, কাপড় খুলে দেওয়া এবং মারধর করাই যথেষ্ট ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন পুরো পৃথিবী যেন তা দেখে।
প্রসিকিউটররা আদালতে একটি ফোনকলের কথাও উল্লেখ করেন। তাদের দাবি, অপহরণের তিন দিন পর এক কথোপকথনে রাজিয়া বলেন, আমরা তাকে পিটিয়েছি এবং আমরা আমাদের প্রতিশোধ নিয়েছি। আদালতে বলা হয়, রাজিয়া ও দেওয়ানের বিরোধ শুরু হয়েছিল অর্থ সংক্রান্ত অভিযোগকে কেন্দ্র করে। প্রসিকিউটরদের মতে, দেওয়ান রাজিয়া ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে ৩০ হাজার ডলারের বেশি অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করেছিলেন। রাজিয়া পাল্টা দেওয়ানকে মিথ্যাবাদী ও প্রতারক বলে অভিযুক্ত করেন। দেওয়ান পরে আবু চৌধুরীর বিরুদ্ধেও টিকটকে বিভিন্ন ভিডিও প্রকাশ করেন। প্রসিকিউটরদের মতে, তিনি চৌধুরীকে চ্যালেঞ্জ করেন এবং বলেন যে চৌধুরী কুইন্সের রাস্তাগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন না।
মামলায় এক লাখের বেশি অনুসারী থাকা টিকটক ইনফ্লুয়েন্সার ‘বাবা কিং’ সাক্ষ্য দেন। তিনি জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজিয়া ও দেওয়ানের অনলাইন বিরোধ দেখেছেন। তার মতে, দুই পক্ষ লাইভ ভিডিওতে একে অপরকে আক্রমণ করতেন এবং অশালীন ভাষা ব্যবহার করতেন। তবে সুলতানা রাজিয়ার আইনজীবী সারা স্যাকস আদালতে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, দেওয়ান দীর্ঘদিন ধরে রাজিয়াকে অনলাইনে হয়রানি করছিলেন, তার বাড়ির ছবি প্রকাশ করেছিলেন, তাকে অপমানজনক ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন এবং অর্থ চুরির অভিযোগ তুলেছিলেন।
বিবাদী পক্ষের যুক্তি ছিল, রাজিয়া জানতেন না যে দেওয়ানকে অপহরণ করা হয়েছে। তিনি ভেবেছিলেন, দেওয়ানকে শুধু মারধর করা হয়েছে এবং তিনি সেখানে গিয়েছিলেন নিজের বিরুদ্ধে চলা দীর্ঘদিনের অনলাইন আক্রমণের মুখোমুখি হতে। আইনজীবী সারা স্যাকস বলেন, যদি কেউ দীর্ঘদিন ধরে একজন নারী, তার স্বামী ও পরিবারের বিরুদ্ধে হুমকি দেয়, তাহলে ওই ব্যক্তি আহত হয়েছে শুনে তার প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে। তবে তিনি দাবি করেন, রাজিয়ার উদ্দেশ্য অপহরণে সহায়তা করা ছিল না।
প্রসিকিউটররা এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ঘটনাস্থলে যাওয়ার সময় রাজিয়া জানতেন দেওয়ানকে ধরে আনা হয়েছে এবং তিনি সেখানে মুক্ত অবস্থায় ছিলেন না। তাদের মতে, রাজিয়া সেখানে শান্তিপূর্ণ আলোচনা করতে যাননি; বরং প্রতিশোধ নিতে গিয়েছিলেন। জুরি শেষ পর্যন্ত প্রসিকিউশনের যুক্তি গ্রহণ করে এবং সুলতানা রাজিয়া ও সৈয়দ রুবেল আহমেদকে অপহরণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে।
এ মামলাটি কুইন্সের বাংলাদেশি কমিউনিটিকে ঘিরে কথিত প্রতিশোধমূলক অপহরণ চক্রের দ্বিতীয় ফেডারেল বিচার। এর আগে আবু চৌধুরীর স্ত্রী ইফফাত লুবনা পৃথক মামলায় জুরির রায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। আবু চৌধুরীর বিচার পরবর্তী সময়ে হওয়ার কথা রয়েছে।
রায়ের পর প্রসিকিউটররা সুলতানা রাজিয়া ও সৈয়দ রুবেল আহমেদের জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করেন। তবে আদালত পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত তাদের বন্ডে মুক্ত থাকার অনুমতি দেয়। এই মামলা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ব্যক্তিগত বিরোধ, অনলাইন অপমান এবং প্রতিশোধের সংস্কৃতি কতটা ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে, সেই প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। টিকটকের একটি ভিডিও বা একটি মন্তব্য মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়লেও, তার আইনি ও সামাজিক প্রভাব বহু বছর ধরে চলতে পারে।
